ঝটিকা মিছিলের সঙ্গে ফিরছে অগ্নিসন্ত্রাস, বড় নাশকতার ছক
ঝটিকা মিছিলের সঙ্গে ফিরছে অগ্নিসন্ত্রাস, বড় নাশকতার ছক
editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ
Manual2 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
ককটেলের বিকট শব্দ। রাতের আঁধারে পার্ক করে রাখা বাসে আগুন। মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকেও আগুন। কোথাও দুই মিনিট পরপর বিস্ফোরণ, কোথাও আবার চালক-হেলপারবিহীন যানবাহন লক্ষ্য করে আগুন। গত তিন দিনে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে এ ধরনের আগুনসন্ত্রাসের তাণ্ডব শুরু হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, বিচ্ছিন্ন এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি ও নেপথ্যের ইন্ধনদাতাদের ব্যাপারে অনুসন্ধান চলছে।
গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, পলাতক মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত থেকে দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীরা সারা দেশে নাশকতা চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে। এ কারণে কয়েক বছর ধরে দেশে আগুনসন্ত্রাসের ঘটনা না থাকলেও হঠাৎ করে এ ধরনের ঘটনার পৃনরাবৃত্তি ঘটছে। এতে জনমনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের মতো বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ডের আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে এ-সংক্রান্ত তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছে গোয়েন্দারা। তবে গতকাল রবিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতেই ‘পতিত ফ্যাসিবাদ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ তথাকথিত কর্মসূচি দিয়ে ককটেল ছুড়ছে ও আগুনবাজি করছে।’
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছোট ছোট হামলার মাধ্যমে জনমনে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করছে। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, ককটেল বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ ও ঝটিকা মিছিলের মতো বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ডের আড়ালে এদের বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতিও থাকতে পারে। গত তিন দিনে ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজবাড়ী, সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত ২০টি স্পটে ককটেল বিস্ফোরণ এবং ১০টিরও বেশি যানবাহনে আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পর রাজধানীর প্রবেশপথ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ পয়েন্ট পর্যন্ত ২০০টির বেশি স্থানে বিশেষ চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়েও বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। সন্দেহভাজন মোটরসাইকেল ও যানবাহনে তল্লাশির পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে নাম্বারপ্লেটের ছবিও সংরক্ষণ করছে পুলিশ। ডিবি, সিটিটিসি, এপিবিএনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ টিমও মাঠে নামানো হয়েছে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি।
গত শুক্রবার থেকে গতকাল রবিবার পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুর, কাফরুল, বাড্ডা, পল্লবী, রামপুরা, মাতুয়াইল ও কলেজগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুলিশ বলছে, কয়েকটি বাস চালক-হেলপারবিহীন অবস্থায় রাস্তার পাশে পার্ক করা ছিল। রাতের অন্ধকারে এসব যানবাহনকে লক্ষ্য করেই আগুন দেওয়া হয়। পাশাপাশি যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, মৌচাক, সচিবালয়, শিল্পকলা একাডেমি, মহাখালী ও কমলাপুর রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ঢাকার বাইরে গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন স্থানেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। ডিএমপির হিসাবে, তিন দিনে ঢাকাসহ সারা দেশে ১০টি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে। নাশকতার এসব ঘটনায় একাধিক থানায় মামলা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত অন্তত পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ডিবি। এদিকে গতকাল রবিবার আজিমপুরে একটি বাসে আগুন দেওয়ার পর জনতার হাতে এক ব্যক্তি আটক হন। পরে তাকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়। রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে একটি ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। রবিবার রাতে স্টেশনের ২ নম্বর প্লাটফর্মে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো রাতেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঢাকার আগারগাঁও থেকেও দুটি পেট্রোল বোমা উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। পুলিশ এসব ঘটনাকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নামে পরিচালিত কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে রবিবার ভোর ৪টা ২৬ মিনিটে সাবেক উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আবু সোলাইমান সরকার সাজার বাড়ির সামনে প্রথম ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। দুই মিনিট পর ৪টা ২৮ মিনিটে গোপালচরণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ঘটে দ্বিতীয় বিস্ফোরণ। এরও দুই মিনিট পর ৪টা ৩০ মিনিটে বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশের সড়কে তৃতীয় বিস্ফোরণের ঘটে। পরপর তিনটি বিকট শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। স্থানীয়দের দাবি, বিস্ফোরণের সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শোনা গেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ককটেলের খোসা উদ্ধার করেছে। তবে কাউকে আটক করা যায়নি। সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের কারণ ও জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত চলছে।
Manual7 Ad Code
ময়মনসিংহ নগরীর মাসকান্দা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ‘সৌখিন পরিবহন’ নামের বাসে গত শনিবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে আগুন লাগে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও আগুনের ধরন নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত অগ্নিসংযোগ কি না, তা খতিয়ে দেখছে। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া বাস টার্মিনালে শনিবার রাত ১টার দিকে পার্ক করে রাখা ‘নিউ ক্লাসিক্যাল’ নামে একটি লোকাল বাসে আগুন লাগে। বাসটি রাজবাড়ী মালিক সমিতির এবং দৌলতদিয়া-কুষ্টিয়া রুটে চলাচল করে। আগুনের কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে যমুনা সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের ঝাঐল ওভারব্রিজ এলাকায় শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকে আগুন লাগে। স্থানীয়রা খবর পেয়ে আগুন নেভান। কীভাবে আগুন লাগল, তা জানতে সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
বিদেশ থেকে নির্দেশনা ও অর্থায়নের অভিযোগ
নাশকতার তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার এক স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যÑ এমন দাবি করেছে ডিবি। ডিবির ভাষ্য, রায়হান উদ্দিন নামে ওই ব্যক্তি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ছয় নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে চারটি ককটেল ও একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে বিদেশ থেকে নির্দেশনা ও অর্থ সহায়তার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি গোয়েন্দাদের। ডিবি কর্মকর্তা মোল্লা মো. শাহীন বলেছেন, বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেশে থাকা নেতাকর্মীদের যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবারসহ বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেপ্তার চারজনকে আদালতে পাঠানো হলে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। আগামী মঙ্গলবার রিমান্ড শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
চিহ্নিত আরও কয়েকজন
শনিবার রাতের বাসে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ডিবি। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ করে নাশকতার পরিকল্পনা, অর্থের উৎস ও নেপথ্যের ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
২০০ পয়েন্টে চেকপোস্ট
Manual3 Ad Code
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে ডিএমপি। নগরীর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ২০০টির বেশি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। সন্দেহভাজন যানবাহন ও মোটরসাইকেল থামিয়ে তল্লাশি চলছে। প্রয়োজনে নাম্বারপ্লেটের ছবি সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে পরে এসব যানবাহনের গতিবিধি শনাক্ত করা যায়। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদও বিভিন্ন প্রবেশপথের চেকপোস্ট পরিদর্শন করে কঠোর তল্লাশির নির্দেশ দিয়েছেন। আবাসিক হোটেল ও ডরমিটরিতেও চলছে ব্লক রেইড। সংগ্রহ করা হচ্ছে অতিথিদের তালিকা। গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকায় বাড়ানো হয়েছে ফুট প্যাট্রল ও মোটরসাইকেল টহল।
ডিবি-সিটিটিসি-এপিবিএন মাঠে
Manual7 Ad Code
নাশকতা ঠেকাতে ডিবি, সিটিটিসি ও এপিবিএনের সদস্যদেরও মাঠে রাখা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিবির সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহকারী কমিশনার সাইফ। তিনি বলছেন, বাসে অগ্নিসংযোগের বেশ কয়েকটি ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশেষ করে রাতে পরিত্যক্ত বা চালক-হেলপারবিহীন বাসে কারা আগুন দিয়েছে, তা শনাক্তে ফুটেজ বিশ্লেষণ চলছে।
Manual3 Ad Code
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। ঘটনাগুলোতে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো কাজ করছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও প্রবেশপথে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী এবং কোনো ধরনের অর্থায়ন বা নির্দেশনা ছিল কি নাÑ তদন্তের মাধ্যমে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।