প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৫শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৯ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৪ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

প্রথার বৃত্তে বন্দি জামিনের হিসাব

editor
প্রকাশিত অক্টোবর ২৫, ২০২৬, ১১:১১ পূর্বাহ্ণ
প্রথার বৃত্তে বন্দি জামিনের হিসাব

Manual5 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual5 Ad Code

১৯৯৮ সালের মে মাসে ঢাকার শান্তিনগর এলাকায় সংঘটিত হত্যা মামলায় ২০০০ সালের ৩১ অক্টোবর ফাঁসির রায় হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের শরীফা বেগমের। ২০০৩ সালের ২২ জুলাই হাইকোর্টে তার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) নিষ্পত্তি শেষে ফাঁসির সাজা বহাল থাকে। ২০২৪ সালের ১ আগস্ট আপিল বিভাগ শরীফার মৃত্যুদন্ড কমিয়ে আমৃত্যু কারাদন্ড দেয়। এক বছর পর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর শরীফাকে গাজীপুর কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের কনডেমড সেল থেকে সাধারণ সেলে নেওয়া হয়। তবে, কারাগারে যাওয়ার ২৮ বছর এবং ২৪ বছর ফাঁসির সেলে থাকা ৫৬ বছর বয়সী শরীফা কখনোই উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করেননি।

এ পরিস্থিতি শুধু শরীফার ক্ষেত্রেই নয়, অধস্তন আদালতে ফাঁসির রায়ের পর কনডেমড সেলে থাকা ফাঁসির আসামিদের প্রায় কেউই জামিনের আবেদন করেন না। আবেদন করলেও নিশ্চিতভাবেই তা খারিজ হবে কিংবা হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ শুনতে অপারগতা প্রকাশ করবে এমনটি ধরে নিয়ে কেউ আবেদন করেন না এবং এ বিষয়টি অলিখিত প্রথার মতো বলে জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অধস্তন আদালতে ফাঁসির রায়ের পর কমপক্ষে ৬ বছরের মধ্যে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি শুরু হয় না এবং সর্বোচ্চ ২৪ বছর পর্যন্ত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার নজিরও আছে। আর এ সময় পর্যন্ত ফাঁসির আসামিকে থাকতে হয় ‘কারাগারের ভেতর কারাগার’ বলে পরিচিত কনডেমড সেলে।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশের কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারগুলোর কনডেমড সেলগুলোতে ২ হাজার ৪৮২ ফাঁসির আসামি রয়েছেন। এর মধ্যে নারী আসামি আছেন ৭০ জন। এসব আসামির মধ্যে কমপক্ষে ৫ বছর থেকে ১৫ বছর বা এর বেশি সময় বন্দি আছেন ৬৩৭ ফাঁসির আসামি। কারা অধিদপ্তরের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, কনডেমড সেলে স্পর্শকাতর কিংবা গুরুতর মামলার আসামি যেমন আছেন, তেমনি পরিস্থিতি কিংবা প্রথমবারের মতো গুরুতর অপরাধের সংস্পর্শে আসা আসামিরাও আছেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বেশিরভাগ দরিদ্র। অনেক আসামি বয়স্ক ও অসুস্থ। তাদের অনেকের আচরণ অস্বাভাবিক। অনেকেই কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। তাদের আইনজীবী নিয়োগ দেওয়ার সামর্থ্য নেই। সেসব আসামির পক্ষে জেল আপিল করা হয়। কিন্তু সেই আপিলও বছরের পর বছর পড়ে থাকে। জামিনের প্রসঙ্গ কেউ তোলেন না এবং জামিনের আবেদনের বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারেও পড়ে না।

কেন জামিন হয় না, কী বলছেন আইনজীবীরা :

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ফৌজদারি আইনের ধারা পর্যালোচনাসহ তিনজন ফৌজদারি আইনবিদ এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজলের অভিমত নিয়েছে । তিন জ্যৈষ্ঠ আইনবিদ নিশ্চিত করেছেন নিকট অতীতে দুএকটি ব্যতিক্রম ছাড়া ফাঁসির আসামি জামিনের আবেদন করেছেন বা শুনানি হয়েছে এমন তারা শুনেননি।

আইনজীবীরা বলেন, অপরাধের গভীরতা, ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার, কঠোর শাস্তি দিয়ে সমাজে বার্তা দিতে মৃত্যুদ-ের মতো সাজা দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে আসামিদের জামিন হলে তারা মামলা প্রভাবিত করতে পারেন, সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখাতে পারেন, পলাতক হতে পারেন, অপরাধের পুনরাবৃত্তি হতে পারে এসব বিবেচনায় জামিন বিবেচনা করা হয় না। তবে, আসামিদের জামিনের আবেদনের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত বলে সরাসরি মত দিয়েছেন দুজন আইনবিদ।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, ‘যাবজ্জীবন, ১০ বছর বা অন্যান্য মেয়াদের সাজার পরে জামিনের প্রসঙ্গ তখনই আসে, যদি বোঝা যায় আসামির খালাসের সম্ভাবনা আছে। কিন্তু মৃত্যুদন্ডের ক্ষেত্রে এটি বিবেচনায় আনা হয় না। প্রথাগতভাবে আবেদন গ্রহণ করা হয় না। কিন্তু এই চর্চাটা (ফাঁসির আসামির জামিনের আবেদন গ্রহণ না করা) ভাঙতে হবে।’ যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, ‘ফাঁসির মামলায় সব বিচারেই যে ন্যায়বিচার হচ্ছে, সেটি নিশ্চিত করে বলা যায় না। বহু লোক তো খালাস পাচ্ছেন। অধস্তন আদালতের অনেক বিচার সঠিক হয় না এবং বিচারিক ত্রুটিও উঠে আসছে। নুসরাত হত্যা মামলায় তো হাইকোর্টে ১০ জনের খালাস হলো, তারা জামিনও পেতে পারতেন।’

ফৌজদারি আইনবিদ অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান বলেন, ‘আপিল বিভাগে চূড়ান্ত বিচারে আসামি খালাস পেতে পারেন এ বিবেচনায় জামিন পাবেন না কেন, সে প্রশ্ন আছে। কিন্তু আমরা জামিন চাই না, এ কারণে যেহেতু প্রথা বা নিয়ম নেই। কিন্তু আইনে কোথাও বলা নেই যে, ফাঁসির আসামির জামিনের আবেদন করা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘জামিন আসামির অধিকার। কিন্তু রামিসা হত্যার ঘটনার আসামিকে কি জামিন দেওয়া যায়? তাহলে তো ভয়ংকর আসামিরা জামিন চাইবেন এবং জেল থেকে বেরিয়ে আরেকটা খুন করবেন।’ জ্যেষ্ঠ এ আইনজীবী আরও বলেন, ‘হাইকোর্টে দুই বছরের মধ্যে এবং আপিল বিভাগে এক বছরের মধ্যে ফাঁসির মামলা নিষ্পত্তি হলে জামিনের প্রশ্ন আসবে না।’

প্রতিবেদনের শুরতে উল্লিখিত শরীফার পক্ষে হাইকোর্টে শুনানিকারী আইনজীবী মো. হাবিবুর রহমান ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘জামিন হবে না, তাই আবেদন করা হয়নি।’

Manual5 Ad Code

২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আসামিপক্ষে ১১০ টি ডেথ রেফারেন্স মামলায় অন্তত দেড়শ আসামির পক্ষে শুনানি ও আইনি পর্যালোচনা করেছে আইনি সংস্থা ল’ ল্যাব ফাউন্ডেশন। শরীফার পক্ষে আপিল বিভাগে শুনানি করেছিলেন ল’ ল্যাবের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শিশির মনির। তিনি বলেন, বেশিরভাগ মামলাতে আসামিদের হয় খালাস হয়েছে কিংবা মৃত্যুদ- কমে যাবজ্জীবন হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ বছর কনডেমড সেলে থাকা এবং অসুস্থতা বিবেচনায় আকবর নামে একজনের পক্ষে কয়েক বছর আগে জামিনের আবেদন (ইতিমধ্যে খালাস) করা হয়। হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ আবেদনটি নথিভুক্ত করে রাখলেও কখনোই শুনানি হয়নি।

জামিন নিয়ে ৪৯৭ ধারায় কী আছে :

Manual1 Ad Code

‘জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে যখন জামিন মঞ্জুর করা যায়’ শিরোনামে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘জামিন অযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি থানার ওসি কর্তৃক বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার হলে, আটক থাকলে, আদালতে হাজির হলে বা হাজির করা হলে, তাকে জামিনে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আসামি মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডনীয় কোনো অপরাধে অপরাধী হিসেবে বিশ্বাস করার মতো যুক্তিসংগত কারণ থাকলে মুক্তি দেওয়া যাবে না।’ তবে, একই ধারায় শর্ত হিসেবে বলা হয়েছে, ‘১৬ বছরের কম বয়সী ব্যক্তি, স্ত্রী লোক, পীড়িত বা অক্ষম হলে আদালত তাকে জামিন দিতে পারে।’ তবে, জামিন বিবেচনা করা না করা একান্তই আদালতের নিজস্ব এখতিয়ার। ফৌজদারি আইনবিদ অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ‘কোনো মামলার বিচার হওয়ার পর ৪৯৭ ধারার প্রয়োগের বিষয় নেই। এই ধারার প্রয়োগ হয়, বিচার হওয়ার আগে। মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হলে আসামির জামিন হবে না, সে বিষয়ে কোনো আইনে নেই বিধিনিষেধ ।’

Manual6 Ad Code

জামিনের আবেদন ও পরিণতি:

বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় সাক্ষী থেকে আসামি হওয়া আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির ফাঁসির রায় হয় ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। তবে, সাত বছরেও হাইকোর্টে তার ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসেনি। ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত চারবার তার পক্ষে হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করা হলেও শুনানিতে আসেনি। ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ মিন্নির জামিনের আবেদন শুনতে অপারগতা প্রকাশ করে। মিন্নির পক্ষে শুনানি করতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) ট্রাস্টি, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না। তিনি বলেন, জামিনের চেষ্টা তিনি এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘যাবজ্জীবন সাজা হলে অনেক ক্ষেত্রে ৫/১০ বছরের মধ্যে জামিন হয়। কিন্তু মৃত্যুদন্ডের বেলায় মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জামিন হয় না।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আইনে যদি বাধা না থাকে তাহলে জামিনের আবেদন গ্রহণ করতে অসুবিধা কোথায়?’ জেড আই খান পান্না আরও বলেন, ‘কনডেমড সেলে থাকা অনেকে গুরুতর অসুস্থ। নারীও আছেন অনেক। কেউ কেউ পরিস্থিতির শিকার হয়ে ফাঁসির আসামি হয়েছেন। আসামিদের জামিনের আবেদন অবশ্যই গ্রহণ করা উচিত।’

দুই বছর আগে হাইকোর্টের অভিমত :

ফাঁসির আসামিদের কনডেমড সেলে রাখার বৈধতা প্রশ্নে তিন আসামির করা রিট আবেদনের ওপর ২০২৪ সালের ১৩ মে আলোচিত একটি রায় দেয় হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ। রায়ে আদালত বলে, ‘ফাঁসির মামলায় সর্বোচ্চ সাজা চূড়ান্ত হওয়ার আগে কাউকে কনডেমড সেলে রাখা দুই বারের সাজার শামিল।’ হাইকোর্ট আরও বলেছিল, ‘মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিরা জামিনের আবেদন করতে পারেন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা অনুযায়ী, হাইকোর্টের এসব জামিনের আবেদন গ্রহণ করা উচিত।’ যদিও দুদিন পর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত হাইকোর্টের এই রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। এ মামলাটি এখন আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

৪২৬ ধারার ভাষ্য হলো- ‘দন্ডিত ব্যক্তির আপিল সাপেক্ষে আপিল আদালত লিখিতভাবে কারণ লিপিবদ্ধ করে আদেশ দিতে পারবে যে, আপিলকৃত দ- বা আদেশ কার্যকরীকরণ স্থগিত থাকবে এবং আসামি আটক থাকলে আরও আদেশ দিতে পারবে যে, তাকে জামিনে বা তার নিজের মুচলেকায় মুক্তি দিতে পারবে।’ এ রিট মামলায় রিটকারীদের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, হাইকোর্টের রায়টি ছিল যুগান্তকারী। আপিল বিভাগের শুনানিতে হাইকোর্টের রায়ের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরা হবে। তবে, শুনানি কবে হবে সেটি নিয়ে নিশ্চিত নন তিনি।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মনে করেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রথারও আইনি ভিত্তি আছে। তবে, ফাঁসির আসামির জামিন শুনানির পক্ষে বা বিপক্ষে কি না, দেশ রূপান্তরের এমন প্রশ্নে কোনো মন্তব্য না করলেও তিনি বলেন, মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামির জামিন নিয়ে উদ্বেগের কারণ মূলত কেইস রেফারেন্সের দীর্ঘসূত্রতার কারণে। তিনি আরও বলেন, ‘ফাঁসির আসামিকে জামিন দিলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে, ন্যায়বিচার ব্যাহত হতে পারে এমন বিবেচনাতেই তাদের জামিনের আবেদন গ্রাহ্য হয় না। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হলে জামিনের প্রসঙ্গ হয়তো উঠবে না।’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 ১২৩৪
৫৭৮৯১০১১
১১৩৪১৫১৬১৮
১৯২০২১২২২৩২৪২৫
২৬২৭২৯৩০৩১  

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code