সিলেটে পুলিশের ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা, যে অভিযানে মিলছে স্বস্তি
সিলেটে পুলিশের ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা, যে অভিযানে মিলছে স্বস্তি
editor
প্রকাশিত জুন ২৯, ২০২৬, ০৫:১৯ পূর্বাহ্ণ
Manual3 Ad Code
নিউজ ডেস্ক:
সিলেট মহানগরীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ। অপরাধীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এসএমপি। আর এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে জুন মাস জুড়ে ব্যাপক ধর-পাকড় চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিয়মিত টহল ও ধারাবাহিক বিশেষ অভিযানের পাশাপাশিও বেশ কয়েকটি চিরুণী অভিযানে অসংখ্য অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযানের সময় গ্রেফতারের সাথে সাথে বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অনেককে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডও প্রদান করা হয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, সিলেটে সম্প্রতি চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, লুটপাট, মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবীদের ব্যাপক উৎপাত বেড়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে নগরীতে অপরাধ জগতের আলো ফুটে উঠে। নগরীর পাড়া-মহল্লা, অলি-গলিতে বিভিন্ন অপরাধীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। আর সেটা চলে মধ্যরাত থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। অনেক সময় অপরাধীরা প্রকাশ্যে, আবার কখনও লোকচক্ষুর আড়ালে সংঘবদ্ধভাবে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করে দ্রুত পালিয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধ দমনে থেমে নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। তারাও নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, প্রবেশপথ, আবাসিক এলাকা ও অপরাধপ্রবণ স্থানগুলোতে ব্যাপক তোড়জোড় অভিযান চালায়। এসব অভিযানে মোটামুটি সাফল্য কুড়ায় সিলেট মহানগর পুলিশ ও মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, শনিবার (৬ জুন) থেকে রবিবার (২৮ জুন) পর্যন্ত মোট ২২ দিনে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ মোট ৯ দিন বিশেষ চিরুণী অভিযান পরিচালনা করে। আর এই ৯ দিনের চিরুণী অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে মোট ৯৫৯ জনকে গ্রেফতার করা হয় এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত কর্তৃক সাজা প্রদান করা হয়েছে। অন্যদিকে, চিরুণী অভিযান ছাড়াও ধারাবাহিক অভিযান ও বিশেষ অভিযানেও প্রতিনিয়ত আসামি গ্রেফতার করা হচ্ছে।
সর্বশেষ শনিবার (২৭ জুন) সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত মোট ৫ ঘন্টায় সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে একটি বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসময় ৯৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এসএমপির ৬টি থানাভিত্তিক গ্রেফতার ও সাজা প্রদানকৃত আসামিদের মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় ৩২ জন, এয়ারপোর্ট থানায় ১০ জন, জালালাবাদ থানা ১৪ জন, দক্ষিণ সুরমা থানা ১৯ জন, মোগলাবাজার থানা ১৩ জন, শাহপরাণ (রহ.) থানা ৬ জন রয়েছেন।
Manual2 Ad Code
গত আগে বুধবার (২৪ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সিলেট মহানগরীতে চিরুণী অভিযান চালিয়ে ৫৯ জনকে গ্রেফতার করেছে মহানগর পুলিশ। এসময় কোতোয়ালী মডেল থানাপুলিশ ১৫, এয়ারপোর্ট ৬, জালালাবাদ থানাপুলিশ ৯, দক্ষিণ সুরমা থানাপুলিশ ১৮, মোগলাবাজার থানাপুলিশ ৫ ও শাহপরাণ থানাপুলিশ ৬ জনকে গ্রেফতার করে।
গত বুধবার (১০ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মহানগরীতে চিরুণী অভিযান চালায় পুলিশ। এসময় বিভিন্ন অপরাধে ১৫৪ জনকে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে দণ্ড দেওয়া হয়। এর মধ্যে কোতোয়ালী থানায় ৩৪ জন, জালালাবাদে ২১ জন, এয়ারপোর্টে ২৬ জন, দক্ষিণ সুরমায় ২৭ জন, মোগলাবাজারে ১৯ জন ও শাহপরাণ থানা এলাকা থেকে ২৭ জনকে আটক করে দণ্ড দেওয়া হয়।
এর সোমবার (৮ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে শুরু হয়ে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মোট ৪ ঘন্টা এবং মঙ্গলবার (৯ জুন) মোগলাবাজার থানার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সাড়ে ১২ঘন্টার অভিযানে ১১০ জনকে আটক করা হয়। অভিযানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আটক ব্যক্তিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে কোতোয়ালি মডেল থানায় ২৪ জন, জালালাবাদ থানায় ১৪ জন, এয়ারপোর্ট থানায় ২৩ জন, দক্ষিণ সুরমা থানায় ২১ জন, মোগলাবাজার থানায় ৬ জন এবং শাহপরাণ (রহঃ) থানায় ২২ জন রয়েছেন বলে জানায় পুলিশ।
গত শনিবার (৬ জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে মাত্র ৪ ঘন্টার অভিযানে মাদকসেবী ও কারবারীসহ ১৩৯ জনকে আটক করে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। পুলিশের এই ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশনের পর থেকে মাদকজগতে অস্থিরতা শুরু হয়েছে বলেও জানা গেছে।
Manual7 Ad Code
মহানগরীর সচেতন নাগরিকরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানের কারণে অপরাধীদের তৎপরতা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় পুলিশের টহল বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসছে। তবে এই অভিযান যেন শুধু বিশেষ সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সারা বছর অব্যাহত থাকে, সেই প্রত্যাশাও জানান তারা।
Manual6 Ad Code
আব্দুস সাত্তার নামের এক ব্যবসায়ী জানান, ‘সন্ধ্যার পর আগে অনেক এলাকায় চলাফেরা করতে ভয় লাগতো। ছিনতাই ও মাদকসেবীদের উৎপাত ছিল চোখে পড়ার মতো। এখন পুলিশ নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আমরা চাই, এই কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকুক। অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নিলে নগরবাসী আরও নিরাপদ পরিবেশে চলাফেরা করতে পারবে।’
এদিকে সিলেট নগরীকে মাদক ও অপরাধমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন এসএমপি কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী। এই ঘোষণা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গেল কয়েক দিন ধরে নগরীতে চারদিনের চিরুণী অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে পুলিশ এই অভিযান চালাচ্ছে। প্রমাণসহ হাতেনাতে কোন মাদকসেবী, কারবারি, ছিনতাইকারী কিংবা জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী আটক হলেই ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অর্থ কিংবা কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।
Manual2 Ad Code
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত মে মাসে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৬৬৫ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। চলতি বছরের আগের মাসগুলোতেও গ্রেফতারের সংখ্যা ছিল প্রায় সমান। পুলিশের এতো অভিযানের পরও অপরাধ দমন না হওয়ায় এবার মাদক নির্মূলের মাধ্যমে অপরাধমুক্ত নগর গড়ার বিশেষ অ্যাকশন প্ল্যান নিয়েছে এসএমপি। গ্রেফতারকৃত অপরাধীদের জেলে আটকে রাখতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। এর অংশ হিসেবে গত শনিবার (৬ জুন) রাত থেকে শুরু হয়েছে চিরুণী অভিযান নামে সরাসরি অ্যাকশন। জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এ অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। মাদকসেবী ও কারবারিসহ বিভিন্ন অপরাধীদের ধরেই ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে সাজা দিয়ে তাদেরকে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে জেলে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম বলেন, ‘সিলেট মহানগরীতে কোনো ধরনের অপরাধী বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া হবে না। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং, সন্ত্রাসী কার্যক্রম কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়-এমন যেকোনো অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছে এসএমপি।
তিনি আরও বলেন, ‘নগরবাসীর জানমাল রক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। এজন্য প্রতিদিন নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ ও চিরুণী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অপরাধী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মাদক, ছিনতাই, চুরি ও অন্যান্য অপরাধ দমনে আমাদের অভিযান ভবিষ্যতেও আরও জোরদার থাকবে।’