স্টাফ রিপোর্টার:
হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের বাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। গত বছর যে ধান প্রতি মণ ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৮০০-৯০০ টাকায়। কোনো কোনো এলাকায় জলাবদ্ধতায় কালচে হয়ে যাওয়া ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০০-৬০০ টাকা মণ দরে।
Manual3 Ad Code
কৃষকরা বলছেন, প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। ফলে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না তারা। অনেক কৃষক কম দামেও ক্রেতা পাচ্ছেন না।
এ অবস্থায় গোলায় ধান থাকলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। পুরোনো ঋণ পরিশোধ, সংসারের খরচ ও নতুন মৌসুমের চাষাবাদের প্রস্তুতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা। এরই মধ্যে অনেক স্থানে পানির অভাবে বীজতলা শুকিয়ে যাচ্ছে। আগের মৌসুমের লোকসান এবং নতুন করে চাষাবাদের অর্থ জোগাড়ের অনিশ্চয়তায় অনেক কৃষক বোরো আবাদ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ভাবছেন। এতে আগামী মৌসুমে হাওরাঞ্চলে বোরো আবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জের মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস বোরো ধান। এ ফসলকে ঘিরেই হাওরপারের কৃষকরা সারা বছরের স্বপ্ন বোনেন। বৈশাখে গোলাভরা ধান ওঠার পর সেই ধান বিক্রির টাকায় চলে সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বিয়ে-শাদিসহ নানা খরচ। কিন্তু এবার উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাদের সেই স্বপ্নে ভাটা পড়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৯৩টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়। প্রায় ১৪ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছিল ১২ লাখ ৯৮ হাজার ৪০০ টন। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উৎপাদন কম হয়েছিল ১ লাখ ১ হাজার ৬০০ টন।
Manual7 Ad Code
দিরাই উপজেলার ধল গ্রামের কৃষক ছত্তার মিয়া জানান, গত বছর এ সময়ে প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। অথচ এবার একই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকায়। জলাবদ্ধতায় কিছুটা কালচে হয়ে যাওয়া ধানের দাম আরও কম। এসব ধান ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। কয়েক দিন আগে তার গ্রামের এক কৃষক ১৫০ মণ ধান মাত্র ৯০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। এতে উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
কৃষক আবুল কালাম কালবেলাকে বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। কিন্তু এ দামেও ধান বিক্রি করতে পারছি না। ক্রেতারাও ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। গত বছরের মতো প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে পারলে অন্তত উৎপাদন খরচ মিটিয়ে কিছুটা লাভের মুখ দেখা যেত।’
দিরাই উপজেলার বেগমপুর গ্রামের কৃষক আজিরের ঘরেও একই হতাশা। তিনি বলেন, তার আয়ের বড় অংশ আসে ধান চাষ থেকে। সন্তানদের নিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ধান উৎপাদন করেছেন। এখনো গোলায় ৭০০ থেকে ৮০০ মণ ধান রয়েছে। কিন্তু বিক্রি করতে পারছেন না। গতবারের কৃষিঋণও পরিশোধ হয়নি। এবার কীভাবে চাষাবাদ করবেন, তা বুঝতে পারছেন না। এমনকি জমি বিক্রি করে দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর কথাও ভাবছেন। আর ধান চাষ করবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাওরের জমির মালিকদের একটি বড় অংশ নিজেরা চাষাবাদ না করে বর্গাচাষিদের মাধ্যমে ধান উৎপাদন করান। বর্গাচাষিরা ঋণ ও ধারদেনা করে জমিতে ফসল ফলান। ধান বিক্রির টাকা দিয়ে জমির মালিকের পাওনা, কৃষিঋণ ও শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করেন। কিন্তু এবার ধানের দাম কম থাকায় সেই হিসাব মেলাতে পারছেন না তারা। ফলে বর্গাচাষেও আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেকে।
Manual5 Ad Code
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের অভিযোগ, চাতাল ও মিলমালিকেরা কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনলেও বাজারে চাল বিক্রি করছেন বেশি দামে। ধানের রং কিছুটা কালচে হওয়ার অজুহাতে কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান কেনা হচ্ছে। অথচ ধানের রঙের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চালের দাম কমেনি। তাদের দাবি, সরকারের যথাযথ নজরদারি ও তদারকির অভাবে চাতাল ও মিলমালিকেরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ধানের দাম নির্ধারণ করছেন। এতে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাওরের কৃষকেরা।
সুনামগঞ্জ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) ফেরদৌস জাহান বলেন, ‘ধানের দাম কমার বিষয়টি অবগত রয়েছি। এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হাওরের কিছু ধানের মান কমে গেছে। এ কারণে বাজারে ধানের দাম কমেছে।’
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আহমদ আসিফুর রব জানান, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এবার ধানের দাম তুলনামূলক কম। তবে ধানের দাম কমলেও সেই অনুপাতে চালের দাম কমেনি। বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন।