প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৪শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৭ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা: ১ যুগেও কার্যকর হয়নি রসু খাঁর ফাঁসি, রামিসার ধর্ষক-খুনির কি হবে?

editor
প্রকাশিত মে ২৪, ২০২৬, ০৯:০৯ পূর্বাহ্ণ
১১ নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা: ১ যুগেও কার্যকর হয়নি রসু খাঁর ফাঁসি, রামিসার ধর্ষক-খুনির কি হবে?

Manual1 Ad Code
ডিজিটাল ডেস্ক :
রাজধানীর মিরপুরে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার নির্মম ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে সাধারণ মানুষ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই জঘন্য অপরাধের বিচারের দাবিতে রাজধানীজুড়ে চলছে নানা প্রতিবাদী কর্মসূচি ও বিক্ষোভ। এর মধ্যেই ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে দেখা করে দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সরকারের এই সদিচ্ছার পরও সাধারণ মানুষের মনে কাটছে না শঙ্কা। বিগত দুই দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করে অনেকেই রামিসা হত্যার দ্রুত বিচার প্রাপ্তি নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করছেন। কারণ, দেশে এমন বহু আলোচিত ও স্পর্শকাতর অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে ঝুলে রয়েছে, এমনকি চূড়ান্ত সাজা কার্যকর হতেও কেটে যাচ্ছে যুগের পর যুগ।

এমনই একটি বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর নাম চাঁদপুরের ‘সিরিয়াল কিলার’ রসু খাঁ। মিরপুরের সাম্প্রতিক ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে রসু খাঁর অপরাধের খতিয়ান ও বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা আবারও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, রসু খাঁ একাই ১১ জন নারীকে ধর্ষণের পর পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করেছিলেন। আজ থেকে প্রায় ১১ বছর আগে, ২০১৫ সালে একটি মামলায় নিম্ন আদালতে তার মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। এরপর দীর্ঘ ৯ বছর পেরিয়ে ২০২৪ সালে উচ্চ আদালতেও তার সেই ফাঁসির আদেশ বহাল রাখা হয়।

প্রকাশ্যে এলো রামিসা হত্যাকাণ্ডের আসামি সোহেলের যত অপকর্ম

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীরা এই পরিস্থিতির জন্য বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপের জটিলতাকেই দায়ী করছেন। তাদের মতে, বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকার কারণে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ ও মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা সামগ্রিক বিচার প্রাপ্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। রসু খাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় নিম্ন আদালত কিংবা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণা হলেও উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় কনডেম সেলে দিন কাটছে এই আসামির।

রামিসা ধর্ষণ-হত্যা: ফরেনসিক রিপোর্টে যেসব তথ্য জা...

তবে এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন, আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে আপিল বিভাগে রসু খাঁর মামলার শুনানি শেষ করে রায় বাস্তবায়নের পথে এগোনো সম্ভব হবে।

Manual4 Ad Code

সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের যৌথ গবেষণায় দেশের নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের সংবেদনশীল অপরাধের মামলায় সাজার হার মাত্র তিন শতাংশ। এর বিপরীতে তথ্য ও প্রমাণের অভাবে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলার আসামিরা শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়ে যাচ্ছে। যদিও আইনে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে এই ধরনের মামলা নিষ্পত্তির সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে নিম্ন আদালতেই একটি মামলার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষ হতে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন বছরের বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।

যেভাবে রসু খাঁ সিরিয়াল কিলার

রসু খাঁর অপরাধ জগতের খতিয়ান ঘাঁটলে দেখা যায়, আজ থেকে প্রায় দেড় দশক আগে ২০০৯ সালে একটি সাধারণ চুরির মামলায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন চাঁদপুর সদরের এই বাসিন্দা। সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ৭ই অক্টোবর একটি মসজিদের ফ্যান চুরির অপরাধে গাজীপুরের টঙ্গী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের কললিস্ট ধরে স্থানীয় এক কিশোরী হত্যার সূত্র মেলাতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পুলিশের কাছে নিজের ভয়ংকর অপরাধের স্বীকারোক্তি দেন রসু খাঁ।

এরপর আদালতের নির্দেশে রিমান্ডে থাকার সময় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে রসু খাঁ একে একে ১১টি লোমহর্ষক খুন ও ধর্ষণের ঘটনা অকপটে স্বীকার করেন। এই স্বীকারোক্তি তখন পুরো দেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল এবং দেশজুড়ে তার ফাঁসির দাবিতে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল। রসু খাঁর নির্মমতার শিকার নারীদের একজন ছিলেন পারভীন আক্তার, যাকে গ্রেপ্তার হওয়ার মাত্র আড়াই মাস আগে তিনি হত্যা করেছিলেন। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ২০শে জুলাই রাতে রসু খাঁ ও তার সহযোগীরা ফরিদগঞ্জের মধ্য হাঁসা গ্রামের একটি নির্জন মাঠে পারভীনকে গণধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন।

পারভীন হত্যা মামলায় ২০১৮ সালে চাঁদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রসু খাঁসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। এর আগে ২০১৫ সালের ২২শে এপ্রিল খুলনার পোশাককর্মী শাহিদা হত্যা মামলায় রসু খাঁর বিরুদ্ধে প্রথম মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছিলেন চাঁদপুরের আদালত। সুপ্রিম কোর্টের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক জানান, রসু খাঁর বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি মামলার রায় নিম্ন আদালতে সম্পন্ন হয়েছে এবং দুটিতেই তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। অর্থাৎ, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়া চলার পরও বাকি ৯টি মামলার বিচার এখনো নিম্ন আদালতেই ঝুলে আছে।

May be an image of one or more people and text that says 'ጥሜይ ২০২৬ সালে ব ছবি'

এদিকে নিম্ন আদালতের রায়ের পর ২০১৮ সালে পারভীন হত্যা মামলাটি উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়। দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০২৪ সালের জুলাই মাসে হাইকোর্ট বিভাগ রসু খাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখলেও, একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তার ভাগনে জহিরুল ইসলাম ও সহযোগী ইউনুছের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। এই রায়ের পর আরও দুই বছর পেরিয়ে গেলেও গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে থাকা রসু খাঁর ফাঁসি কার্যকরের চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া এখনো শেষ করা সম্ভব হয়নি।

Manual3 Ad Code

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, হাইকোর্টে ফাঁসির রায় বহাল থাকার পরও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যেকোনো আসামির সাজা কার্যকর করার আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এই বিষয়ে জানান, হাইকোর্টের রায়ের পর মামলার যাবতীয় নথিপত্র সংবলিত ‘পেপারবুক’ প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত আপিল বিভাগে শুনানি শুরু করা যায় না। এই পেপারবুক তৈরির সম্পূর্ণ দায়িত্ব সরকারের এবং এটি সরকারি প্রিন্টিং প্রেস বা বিজি প্রেস থেকে তৈরি হয়ে আসতে অনেক সময় দীর্ঘ ১০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ফলে পুরো বিষয়টি অনেকাংশেই সরকারি সদিচ্ছা ও গতিশীলতার ওপর নির্ভর করে।

সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ অপহরণ মামলায় খালাস

আপিল বিভাগ যদি কখনো নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে, এরপরও আসামির সামনে শেষ সুযোগ হিসেবে রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করার আইনি পথ খোলা থাকে। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হক জানান, উচ্চ আদালতের ৬৫টি বেঞ্চ থেকে আসা শত শত ডেথ রেফারেন্সের বিপরীতে আপিল বিভাগে শুনানির জন্য মাত্র এক বা দুটি বেঞ্চ কার্যকর থাকায় মামলার জট তৈরি হয় ও সময় ক্ষেপণ হয়। তবে তারা চেষ্টা করছেন যেন অতি দ্রুত রসু খাঁর মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষ করা যায়।

Manual2 Ad Code

মানবাধিকারকর্মী এলিনা খান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, প্রায় দেড় যুগ ধরে একটি আলোচিত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং এমন হাজারো মামলা উচ্চ আদালতে থমকে আছে। যেমনটি গত বছরের মার্চ মাসে মাগুরায় আট বছরের শিশু আসিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেখা গেছে; নিম্ন আদালতে আসামির ফাঁসির রায় হলেও সেটিও এখন আপিলের বেড়াজালে আটকে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোতেই নিম্ন আদালতে দ্রুত রায় আসে, কিন্তু উচ্চ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও পেপারবুক তৈরির ধীরগতির কারণে শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার অধরাই থেকে যায়; যা রামিসা আক্তারের মতো অবুঝ শিশুদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

Manual4 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০
১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭৩০৩১

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code