মাত্র পাঁচ বছর বয়সে হারিয়ে গিয়েছিলেন দুলাল চৌধুরী। দীর্ঘ ৫৮ বছর পর স্মৃতি, প্রযুক্তি ও মানুষের আন্তরিক সহযোগিতার সূত্র ধরে ফিরে এলেন পৈতৃক ভিটায়। হারিয়ে যাওয়া শিশুর ফিরে আসায় চাঁদপুরের কালিপুরে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
Manual3 Ad Code
মঙ্গলবার (৯ জুন) তিনি চাঁদপুরের মতলব উত্তরে উপজেলার ষাটনল ইউনিয়নের কালিপুর চৌধুরী বাড়ি তার বাবা মৃত শামছুল আলমের বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। খবর পেয়ে তাকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমায় উৎসুক জনতা।
পারিবারিক সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালের দিকে মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন দুলাল। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি নারায়ণগঞ্জ হয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি এলাকায় একটি পালক পরিবারের আশ্রয়ে বড় হন। সেখানে স্নেহ-ভালোবাসার মধ্যেই বেড়ে উঠলেও নিজের প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে অজানাই থেকে যান। বহু বছর পর তার ছেলে ইমাম হোসাইন আকিব পারিবারিক আত্মপরিচয়ের খোঁজ শুরু করেন। সামাজিক বাস্তবতা ও পরিচয় সংকটের প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় সেই অনুসন্ধান।
একপর্যায়ে গেল কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে একটি পারিবারিক আলোচনায় বাবার স্মৃতি থেকে উঠে আসে কিছু অস্পষ্ট সূত্র। এর মধ্যে ছিল নদী, লঞ্চঘাট, কালিপুর বাজার এবং একটি নাম। সেই সূত্র ধরেই শুরু হয় দীর্ঘ অনুসন্ধান।
Manual3 Ad Code
প্রযুক্তির সহায়তায় গুগল ম্যাপ, স্থানীয় ইতিহাস এবং এলাকাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয় মেঘনা নদীর তীরবর্তী চাঁদপুর অঞ্চলের একটি এলাকা। পরে স্থানীয় সাংবাদিক ও গবেষকদের সহায়তায় কালিপুর চৌধুরী বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়।
কালিপুরে পৌঁছানোর পর দুলাল চৌধুরীর শৈশব স্মৃতির সঙ্গে এলাকার পুরোনো নিদর্শনগুলোর মিল পাওয়া যেতে থাকে। বয়োজ্যেষ্ঠরা নিশ্চিত করেন, বাড়ির পুরোনো গেট, খালপথ, আমগাছ এবং ‘লবণ তোলা ঘাট’ নামে পরিচিত একটি স্থান বহু বছর আগে সত্যিই ছিল। একই সঙ্গে জানা যায়, একসময় দুলাল নামের একটি শিশু নিখোঁজ হয়েছিল, যার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর রক্তের সম্পর্কের মিল নিশ্চিত হয়। বিশেষ করে জীবিত ভাই মুকুল চৌধুরীর সঙ্গে দেখা হলে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ ৫৮ বছরের বিচ্ছেদের অবসান ঘটিয়ে কান্না, আবেগ ও আনন্দে ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার।
বর্তমানে দুলাল চৌধুরী তার নিজ পরিবারে ফিরে এসে পুনরায় যুক্ত হয়েছেন। পরিবার ও স্থানীয়রা ঘটনাটিকে একদিকে দীর্ঘ অপেক্ষার সমাপ্তি, অন্যদিকে এক বিস্ময়কর মানবিক পুনর্মিলন হিসেবে দেখছেন।
Manual6 Ad Code
এ বিষয়ে দুলাল চৌধুরীর ছেলে এবং কৃষি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার ইমাম হোসাইন আকিব বলেন, গুগলে লিখে সার্চ করি। ম্যাপ দেখে বুঝতে পারি মেঘনা নদীর এক পাড়ে নারায়ণগঞ্জ এবং অন্য পাড়ে চাঁদপুরের অবস্থান। বাবার মনে থাকা বর্ষাকালে নৌকায় চলাচলের স্মৃতি এবং গুগল ম্যাপের লোকেশন মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে চাঁদপুরের মতলব উত্তর এলাকার একটি স্থান শনাক্ত করি। এ অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় দারুণভাবে এগিয়ে আসেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে পড়ুয়া ইমামের জুনিয়ার খালিদ ইমরোজ। খালিদ তার গবেষণার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে শুরু করেন।
এরপর খালিদ ইমরোজের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয় মতলবের স্থানীয় সংবাদকর্মী নওফেল হাসান মায়াব্বিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আতিক রহমান এবং স্থানীয় সাংবাদিক মাইন উদ্দিন চৌধুরীর সাথে। চট্টগ্রাম থেকে রওনা হয়ে মাইন উদ্দিন চৌধুরীকে ফোন দেই । সাংবাদিক মাইন উদ্দিন চৌধুরী যখন কালিপুর এলাকার বর্ণনা এবং বাবা হারিয়ে যাওয়া বিবরণ শোনেন, তখন তিনি চমকে ওঠেন। কারণ এই সমস্ত বর্ণনার সাথে তার নিজের বাড়ির হুবহু মিল ছিল। তখন তিনি আমাদের আসতে বলেন। কালীপুরে এসে তার সাথে সরাসরি কথা হয়। এক পর্যায়ে কালীপুর চৌধুরী বাড়ির শাহিন চৌধুরীকে ডেকে আনে মাইন উদ্দিন চৌধুরী, তখন তিনি বিস্তারিত শুনে নিশ্চিত করেন যে, বহু বছর আগে কালিপুর চৌধুরী বাড়ি থেকে ‘দুলাল’ নামের পাঁচ-ছয় বছরের একটি শিশু হারিয়ে গিয়েছিল, যার আর কোনো খোঁজ মেলেনি। ইনিই সেই হারিয়ে যাওয়া দুলাল।
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি বলেন, দীর্ঘ ৫৮ বছর পর পরিবারের সঙ্গে দেলোয়ার হোসেন দুলাল চৌধুরীর পুনর্মিলন সত্যিই অত্যন্ত আবেগঘন, বিরল এবং হৃদয়স্পর্শী একটি ঘটনা। এত দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকার পর আবার পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরে আসা শুধু একটি ব্যক্তিগত আনন্দের বিষয় নয়, এটি মানবিক সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং ভালোবাসার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। এই পুনর্মিলনের মুহূর্তে পরিবারের সদস্যদের আবেগ, আনন্দ ও উচ্ছ্বাস আমাদের সবাইকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।