বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একনায়কতন্ত্র কিংবা স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের অনেক উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু ৫ আগস্টের মতো এত বড় অভ্যুত্থানের নজির সারা পৃথিবীতেই খুব কম। অথচ মাত্র আট মাসের মধ্যেই জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা কি পূরণ হচ্ছে? অভ্যুত্থান থেকে আসলে কী ‘শিক্ষা’ হলো, এমন প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ। কারও মতে, সবকিছুই আগের মতো চলছে। আবার কেউ বলছেন, এত বড় ঘটনা থেকেও শিক্ষা না হলে ভবিষ্যতে আরও বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর থাইল্যান্ডের প্রভাবশালী দৈনিক ‘ব্যাংকক পোস্ট’ লিখেছে, শেখ হাসিনার এমন করুণ পরিণতিতে বিশ্বের শিক্ষা হচ্ছে, শত উন্নয়ন করেও জনগণের স্বাধীনতা হরণ করলে তার পতন নিশ্চিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সময়কালের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, ‘ইতিহাস থেকে যারা শিক্ষা নেয় না, নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনার মধ্য দিয়ে তারা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটায়।’
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি দেশের মানুষের মধ্যে কোনো পরিবর্তন বা আত্মোপলব্ধি হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে কার্ল মার্কসের বহুল আলোচিত সেই উক্তি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি বলেছিলেন, ‘এটাও ইতিহাসের শিক্ষা যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।’
Manual3 Ad Code
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘পরিবর্তন অবশ্যই হয়েছে। পুরোনোরা বিদায় নিয়েছেন। নতুন মানুষ সামনে এসেছেন। কিন্তু সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আনা কঠিন।’
বাংলা একাডেমির সভাপতি ও সমাজচিন্তক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মতে, ‘আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান থেকে কেউ শিক্ষা নিয়েছে বলে মনে হয় না। প্রত্যেকেই নিজের সুবিধামতো কাজ করছেন।’
Manual6 Ad Code
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, ‘কিছু মানুষের শিক্ষা হলেও এক শ্রেণির মানুষের শিক্ষা হয়নি। তবে আগস্ট থেকে শিক্ষা না হলে পরিণতি হাসিনার মতোই হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, যে-কারণে শেখ হাসিনার পতন ঘটল, তা থেকে আত্মোপলব্ধি হতে হবে। কিন্তু কারও আচার-ব্যবহারে পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রণিধানযোগ্য পরিবর্তন চোখে পড়ছে না।’
Manual1 Ad Code
বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে যে দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান, তা হলো সংবিধান পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং ফ্যাসিবাদী সরকারের বিচারের দাবি। বিচার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। বিরোধ তৈরি হয়েছে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাবসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে। সংস্কার আগে, না কি নির্বাচন আগে। এই প্রশ্নে বাহাস ও মতবিরোধ স্পষ্ট হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
শুক্রবার (২ মে) এই বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে এনসিপির এক সমাবেশ থেকে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের বিচার ও সংস্কারের আগে এ দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। এসব ঘটনায় গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট প্রত্যাশায় এক ধরনের চিড় ধরেছে। সংস্কার প্রশ্নেও বিএনপি-জামায়াত ও এনসিপির মধ্যকার বিভক্তি জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়াচ্ছে। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, তারা ভোটের রাজনীতির কবর রচনা করেছে। রাজনীতি ও সমাজে বিভক্তি ছড়িয়েছে।
লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ এ বিষয়ে এক নিবন্ধে লিখেছেন, সংস্কারের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার ও ঐক্য দরকার। কিন্তু মানুষের চাওয়ার মতো করে রাজনৈতিক দলগুলো প্রস্তুত না হলে বিষয়টি দুরূহ হয়ে উঠতে পারে।
দুনিয়া কাঁপানো গণ-অভ্যুত্থানের পরেও অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য ভুল স্বীকার করে আওয়ামী লীগের ক্ষমা না চাওয়ার বিষয়টি নিয়ে দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধীদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষীরাও মনে করেন, অতীতের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা বা ভুল স্বীকার না করলে দলটির জন্য রাজনীতিতে ফেরা কঠিন হবে।
স্প্যানিশ-আমেরিকান দার্শনিক জর্জ সান্টায়ানার বিখ্যাত একটি কথা হলো, যারা অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না, তারা সেই অতীতে পুনর্যাপন করার দুর্ভাগ্য বহন করে।
সান্টায়ানার এই কথার সূত্র ধরে অধ্যাপক রেহমান সোবহান ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলকেই ইতিহাসের শিক্ষা সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। ওই বছরের মে মাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে লেখা এক নিবন্ধে অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) এই চেয়ারম্যান বলেছিলেন, আমাদের শেখার ব্যর্থতার ফলে বছরের পর বছর ধরে সংকটের পর সংকট ঘনীভূত হয়ে অবধারিতভাবে সমাজে আরও বিপজ্জনক চিড় ধরেছে। ‘ইতিহাস থেকে শেখা না শেখা’ শিরোনামে লেখা ওই নিবন্ধে আওয়ামী লীগের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগেরও বিএনপির ১৯৯৫-৯৬ এবং ২০০৬-০৭-এর অভিজ্ঞতা থেকে শেখা উচিত। বৈধ পন্থায় ক্ষমতায় ফিরে আসার বাসনা আওয়ামী লীগের থেকে থাকলে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে অংশগ্রহণমূলক মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে পরাস্ত করার মাধ্যমেই তাদের সেই আশা পূরণের বাসনা রাখা উচিত। নির্বাচনের অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার পথ পরিহার করলে তাদেরও বর্তমানের গণতান্ত্রিক বৈধতা খুইয়ে ১৯৯৬ ও ২০০৮-এর বিএনপির পরিণতি বরণ করতে হবে।
রেহমান সোবহানের ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়ে অনেক বড় পরিণতি হয়েছে আওয়ামী লীগের। দলটির পতন হয়েছে চরমভাবে। কারণ দলটি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি।
আওয়ামী লীগের এই পরিণতি থেকে বিএনপিরও শিক্ষা নেওয়ার বিষয় রয়েছে বলে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি বলেছেন, ‘ক্ষমতায় আসতে চাওয়া বিএনপির দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকলেও কতটা তারা সফল হবে, তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। কারণ কিছু কিছু কর্মকাণ্ডে ইতোমধ্যে তারা বিতর্কের আবর্তে ঢুকে গেছে।’
আয়-রোজগারের জন্য বিএনপির তৃণমূলের একাংশের ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘটনা আগস্টের পরে দলটিকে প্রথম বিতর্কে জড়িয়েছে। যদিও দলটির হাইকমান্ড লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করছে। তবে ক্ষমতায় যাওয়ার পরে দুর্নীতিমুক্ত করার পাশাপাশি কতটা সুশাসন তারা দিতে পারবে সে পরীক্ষা রয়েছে দলটির সামনে। আলোচনা উঠেছে, ক্ষমতায় আসার আগেই বিএনপির অনেক নেতার ‘বডি-ল্যাঙ্গুয়েজ’ বদলে গেছে। তারা ক্ষমতায় এসে গেছেন এমন মনোভাব ফুটে উঠছে তাদের আচরণে। এনসিপির কিছু নেতার নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও মানুষকে হতাশ করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিভিন্ন ইস্যুতে এনসিপির সঙ্গে বিএনপিসহ মিত্র দলগুলোর বিভেদ ক্রমশ বাড়ছে। উপদেষ্টাদের সততার ভাবমূর্তি থাকলেও, ক্রসফায়ারে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে কিন্তু ‘মব ভায়োলেন্স’ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ‘অন্তর্বর্তী সরকারকে অনেকে পাঁচ বছর চায়’ এমন বক্তব্যেও নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ছড়িয়েছে। এসব ঘটনা রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিলে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। তা ছাড়া দুর্নীতি বন্ধ হয়েছে, আইনের শাসন পুরোপুরি কায়েম হয়েছে, দেশ এখন নিরাপদ, এমন আলোচনা সমাজে নেই। বরং কোথাও কোনো পরিবর্তন হয়নি জনগণের মধ্যে, এমন আলোচনাই বেশি। এসব কারণেই বলা হচ্ছে, মানুষের মনোজগতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশের উন্নতি-অগ্রগতির জন্য মানুষের মনোজগতের সংস্কার খুবই জরুরি। গত বছরের নভেম্বর মাসে সিপিডির এক সেমিনারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য দাবি করেছিলেন, আওয়ামী লীগের পতনের পরে দেশের মানুষের মনোজগতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন যারা বুঝতে পারবে না, তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই বলেও তিনি সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।
অবশ্য ক্ষমতার মোহ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন গত ১৫ বছরে একাধিক বক্তব্যে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বললেও গুম, খুন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরে নির্যাতন বা নির্বাচনি ব্যবস্থা ধ্বংস করা নিয়ে কথা বলেননি। কারণ, তিনি ক্ষমতার সঙ্গে থাকতে চেয়েছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ এ প্রসঙ্গে এক নিবন্ধে লিখেছেন, অন্যায় একসময় সবকিছু অন্ধকার করে দেয়। এ থেকে বেরোনো কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যদি স্বৈরাচারী আচরণ না করতেন, অতি দলীয়করণে নিজ গণ্ডিতে অচলায়তন গড়ে না তুলতেন, সুশাসনের পথে হাঁটতেন, দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় না দিতেন, নির্বাচনি ব্যবস্থা ভেঙে ফেলে গণতন্ত্র বিপন্ন না করতেন, তাহলে তার এমন করুণ পরিণতি দেখতে হতো না।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া দেশের মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আনা কঠিন। এ কারণেই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান থেকে বিশেষ কোনো শিক্ষা হয়নি। শিক্ষা হয়নি কারণ, সিস্টেম বা ব্যবস্থা একই আছে। ঘুষ ও দুর্নীতি এ কারণেই বন্ধ হয়নি। এগুলো বন্ধ করতে হলে ব্যবস্থা বদলের রাজনীতি দরকার। দেখা যাচ্ছে, সরকার বদলের রাজনীতি দিয়ে কাজ হবে না। ব্যবস্থা বদল না হলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এক সরকার যাবে, আরেক সরকার আসবে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দিয়ে আর কাজ হবে না। উন্নয়নের সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাতে হবে। দেশের মালিকানা এখনো অল্প কিছুলোকের হাতে। মালিকানার সামাজিকীকরণ করা দরকার।
রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যারা থাকেন, তারা একটি বিশেষ শ্রেণির লোক। বুর্জোয়া শ্রেণির। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করে টাকা-পয়সার মালিক হন। ক্ষমতা তাদের হাতেই থাকে। একাত্তর সালের স্বপ্ন, এই রাষ্ট্র হবে সাধারণ মানুষের। সেটি হয়নি বরং একটা শাসকশ্রেণি তৈরি হয়েছে। পেটিবুর্জোয়া থেকে বুর্জোয়া হলেও তারা বুর্জোয়াদের গুণ পাননি। বুর্জোয়ারা বিনিয়োগ করেন। কিন্তু এই শাসকশ্রেণি বিনিয়োগ না করে লুটপাট করেছে। গত ১৫ বছর লুটপাটের পাশাপাশি তারা মানুষের কণ্ঠরোধ করেছে। ক্ষমতায় থাকতে তারা দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করেছে। অথচ নির্বাচন দিলে তারা পরাজিত হতো; দেশত্যাগ করতে হতো না।
তা ছাড়া তারা কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা এবং কয়েক হাজারকে পঙ্গু করেছে। সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। স্বৈরাচার এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলো। কিন্তু সরকারের পতন হলেও ঘুষ-দুর্নীতি রয়ে গেছে। কারণ সিস্টেম বা ব্যবস্থার তো বদল হয়নি। পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থায় ঘুষ-দুর্নীতি চলে। কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আবার বিনিয়োগও হয়। এখানে সেই বিনিয়োগটা হয়নি। ফলে কর্মসংস্থান বাড়েনি। যদিও উন্নতি অনেক দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেখানে অন্তঃসারশূন্যতা ছিল। কারণ কর্মসংস্থান বাড়েনি। সম্পদ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। সমাজব্যবস্থার বদল না হলে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হবে না। এই ব্যবস্থা বদল করার রাজনৈতিক শক্তি এখানে গড়ে ওঠেনি।
সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো, এই ব্যবস্থা বদলের রাজনীতিটা করার কথা বামপন্থিদের। কিন্তু তারা বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত। তাদের দেখাই যাচ্ছে না। তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্যবস্থা বদলের রাজনীতি দাঁড় করাতে পারলে দেশের ভালো হতো। এই ধনিক শ্রেণি নিজেদের স্বার্থ দেখে। টাকা পাচার করে। বিদেশে বাড়িঘর তৈরি করেছে। ছেলেমেয়েরা বিদেশে পড়াশোনা করে। তাদের দেশপ্রেম কমে গেছে। তাই ব্যবস্থা বদলের রাজনীতি দরকার। বিকৃত পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় চলবে না। পুঁজিবাদেরও কতগুলো গুণ আছে। তারা বিনিয়োগ করে, কর্মস্থান বাড়ায়। তাহলে অর্থনীতি কীভাবে চলবে। সমষ্টিগতভাবে উপলব্ধি হতে হবে। সে জন্য রাজনৈতিক সংগঠনের দরকার। যে দলগুলো এখন আছে, তারা সমাজে কোনো পরিবর্তন আনবে না। তারা এই ব্যবস্থাই টিকিয়ে রাখবে।
আবুল কাসেম ফজলুল হক
৫ আগস্ট থেকে কেউ কোনো শিক্ষা নেয়নি। যে যার সুবিধামতো কাজ করছে। অবস্থার চাপে কেউ কেউ ভয়েসটা একটু নিচু করছেন। কারোরই ইতিবাচক চিন্তাভাবনা দেখছি না। ক্ষমতায় যারা আছেন তারা ক্ষমতা রক্ষার জন্য কথা বলেন, কাজ করেন। সর্বজনীন কল্যাণে তারা অল্পই কাজ করছেন। ক্ষমতায় আসতে চাওয়া বিএনপির দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকলেও কতটা তারা সফল হবে, তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। কারণ কিছু কিছু কর্মকাণ্ডে ইতোমধ্যে তারা বিতর্কের আবর্তে ঢুকে গেছে। ছাত্রদের নতুন দলের আত্মোপলব্ধি হয়েছে কি না, বলতে পারব না। তারা কোথা থেকে বুদ্ধি-পরামর্শ পাচ্ছেন সে ব্যাপারে কেউ কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না। তাদের ব্যাপারে কথা বলতে গেলে বিপজ্জনক হতে পারে।
বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান বারবার হবে না। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ ক্রমশ পরাধীনতার দিকে চলে যাবে। আসলে মানুষের মন-মানসিকতা বদলানো কঠিন কাজ। খুব কমসংখ্যক মানুষের মন বা চিন্তার বদল হয়। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সংস্কার না করে শুধু ওপর থেকে চাপিয়ে দিলে কোনো লাভ হবে না।
১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব থেকে শুরু করে বিশ্বে যত বিপ্লব হয়েছে, প্রত্যেকটিতে একটা মহান লক্ষ্য জনগণের সামনে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পরেও রাষ্ট্র সেভাবে পুনর্গঠিত হয়নি। পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কর্মকাণ্ড ছিল শুধু উন্নয়নমূলক। রাজনীতি বন্ধ হয়ে যাক এটি জিয়াউর রহমান চাননি। পরিবর্তন বুঝতে হলে এথিক্স, সাইকোলজি, এসব বুঝতে হবে। মানুষের মনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন আগে করতে হয়। মনের পরিবর্তন আগে করে তার সঙ্গে সিস্টেম এবং সোশ্যাল সিস্টেমগুলোর পরিবর্তন করতে হয়। জাতি ও রাষ্ট্রগঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার মতো নয়। সততা ও উঁচুমানের নৈতিক গুণসম্পন্ন নেতারও অভাব রয়েছে। ফলে সিস্টেম ও রাজনৈতিক মানোন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। দার্শনিক হেগেল বলেছেন, নেতৃত্ব যেমন হয়, জনসাধারণও সে রকম নেতাই পায়। ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নিচ্ছেন না। ১৯৭২ সাল থেকে এ রকম চলছে।
Manual4 Ad Code
ড. বদিউল আলম মজুমদার
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, ৫ আগস্ট থেকে এক ধরনের মানুষের তাদের মতো করে শিক্ষা হয়েছে। তবে আমাদের মতো এক শ্রেণির মানুষের শিক্ষা হলো যে, শেখ হাসিনা যে গাড়িতে উঠে দানবে পরিণত হয়েছিল, সেই গাড়িতে আমরা উঠলে আমাদেরও ওই গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। গাড়িটা কী? গাড়িটা হলো, নিয়ম-নীতি না মানা, দুঃশাসনের পদ্ধতি। সেই পদ্ধতি অনুসরণ করলে একই পরিণতি হবে। আর এক শ্রেণির মানুষের শিক্ষা বা উপলব্ধি হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে উপলব্ধি না হলে হাসিনার ট্রেনের যে গন্তব্য, সেই পরিণতিই হবে। আবারও স্বৈরাচার, দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, ফ্যাসিবাদের উত্থান হবে। ২০০৭ সালেও একটা ধাক্কা লেগেছিল। হয়তো আগস্টের মতো ভয়ানক আকার ধারণ করেনি। কিন্তু সেই ঘটনা থেকে আমরা শিক্ষাগ্রহণ করিনি। তখন অনেকে কারাগারে গিয়েছেন। জেলখানায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি শুধু তেলে-জলে মেশেইনি, একত্রে তারা অঙ্গীকার করেছিলেন যে, ওই পথে আর হাঁটবেন না। তাদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ও হানাহানি; সেসবের সমাধান করবেন। দুর্নীতি বন্ধ করে সুশাসন কায়েম করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই উপলব্ধি তাদের না হওয়ায় গণতন্ত্রের চর্চা পরবর্তীকালে তারা করেননি। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেওয়ার কারণেই তারা দানবে পরিণত হয়েছিলেন। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাস নির্মমভাবে প্রতিশোধ নেয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অভ্যুত্থানের পর অভ্যুত্থান হয়েছে। কিন্তু এ থেকে আমরা কোনো শিক্ষা নিলাম না।
ড. শাহদীন মালিক
কেউ কখনো ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না। এটা একটা ভুল ধারণা। ইতিহাস হলো অতীতকে বোঝার জন্য, শিক্ষা নেওয়ার জন্য নয়। তবে এটি ঠিক যে, আমার সামনে যে ঘটনা ঘটে গেল, সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়ার আছে। যেমন, শেখ হাসিনার পতন হলো; কী কারণে হয়েছিল, সেটি চিন্তা করলেই হয়। দুর্নীতি করব না, গুম-খুন করব না, এসবের জন্য তো ইতিহাস জানার দরকার নেই। নির্বাচনি ব্যবস্থা ধ্বংস করব না। কী কারণে শেখ হাসিনার পতন হয়েছিল, এই উপলব্ধি থাকতে হবে। কিন্তু আচার-ব্যবহারে পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রণিধানযোগ্য পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। দুর্নীতিও কমছে না। যতগুলো নিয়োগ হচ্ছে, কার ইচ্ছায় হচ্ছে, জানি না। তবে নিয়োগগুলো স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না। হাইকোর্টে ২৩ জন বিচারপতিকে নিয়োগ করা হলো। আগেও যেরকম হঠাৎ করে সকালবেলা শুনতাম ওমুক ওমুক বিচারপতি হয়ে গেছেন, সেভাবেই তো হচ্ছে। ভিন্নতা হলো, বিদেশ থেকে এনে কিছু মানুষকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না। জানি না, এই পরিবর্তন কীভাবে হবে। এসব চিন্তা করে হতাশ হয়ে যাই।
কারোরই চরিত্র বদল হয়নি। অবশ্য চরিত্র, মেধা ও কর্মদক্ষতার ৯০ ভাগ নির্ভর করে কে কোন পারিপার্শ্বিকতা এবং অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে বড় হয়েছেন তার ওপর। ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সাফল্য হলো, দেশকে কী করলে ভালো হবে, এই বয়ান তাদের মনোপলি হয়ে গেছে। সবাই এখন রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে লেগে গেছেন। মূল কথা হলো, আমাদের রাষ্ট্র খারাপ হয়েছে, কারণ আমাদের সংবিধানটা খারাপ। মোটামুটি সব রাজনৈতিক দল এই বয়ানের সঙ্গে একমত। তারা হয়তো বলছে ১০টা জায়গায় খারাপ, বিএনপি হয়তো বলছে ৮টা জায়গায় খারাপ। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট, ৭০ অনুচ্ছেদ বদলের কথা বলছে। তাদের মূল কথা হলো, আমাদের রাষ্ট্র খারাপ হয়েছে, কারণ আমাদের সংবিধানটা খারাপ। সব রাজনৈতিক দল এই বয়ানের সঙ্গে একমত। ছাত্রদের মূল বক্তব্য হচ্ছে, রাষ্ট্রের সংস্কার হতে হবে। সংস্কারের মূল জায়গা কোথায়, রাষ্ট্র কীভাবে ভালো হবে, সংবিধানের কাটাছেঁড়া হলে বা নতুন হলে সেটা হবে কী? এই বয়ানের মধ্যে আমরা সবাই ঢুকে গেছি। কিন্তু রাষ্ট্রকে ভালো করতে হলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সহজলভ্য করতে হবে, শিক্ষা সহজলভ্য করতে হবে, এই বয়ান তো শোনা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রের কাছে সংবিধানের তুলনায় খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। অথচ এসব নিয়ে কোনো কথা নেই। আর শ্রমিকের কল্যাণের কথা অনুপস্থিত।