দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বৈরিতার কারণে ২০১৪ সালের পর সার্কের (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) কোনো শীর্ষ সম্মেলন হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশ সংস্থাটির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছে এবং সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্রিয় উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে সৃষ্ট উত্তেজনার ফলে আবারও বড় ধাক্কা খেল এ আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো।
Manual6 Ad Code
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী এ দুই রাষ্ট্রের দ্বন্দ্বের কারণে পুরোপুরি সচল হয়ে উঠতে পারছে না সার্ক। তবে শীর্ষ সম্মেলন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক না হলেও অন্যান্য কার্যক্রম সীমিত পরিসরে চলমান রয়েছে।
Manual3 Ad Code
সার্কের সবশেষ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে নেপালের কাঠমান্ডুতে। এরপর ২০১৬ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক হয় দেশটির পোখরা শহরে।
তবে সার্কের কাঠামো অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরের কার্যক্রম এখনও সচল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ২৮ থেকে ৩০ এপ্রিল নেপালে সার্কের প্রোগ্রামিং কমিটির (যুগ্ম সচিব/অতিরিক্ত সচিব/মহাপরিচালক) বৈঠক হয়েছে। শীর্ষ সম্মেলন বন্ধ থাকলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের বার্ষিক চাঁদা নিয়মিত পরিশোধ করছে এবং নেপালে অবস্থিত সার্ক সচিবালয়ও কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
Manual2 Ad Code
বর্তমানে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং ভারতে সার্কের আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। তবে ভারতের আপত্তির কারণে স্থবির হয়ে আছে ইসলামাবাদে অবস্থিত সার্ক এনার্জি সেন্টার।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, সার্ক যদি সক্রিয় থাকত, তা হলে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো একযোগে শক্তিশালী হতে পারত এবং তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নও দ্রুততর হতো। বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতিতে আঞ্চলিক সংহতির প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। কিন্তু ভারত-পাকিস্তানের বৈরিতা পুরো অঞ্চলের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
Manual1 Ad Code
২০২৩ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. গোলাম সারওয়ার সার্কের ১৫তম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর আগে বাংলাদেশের আরও দুজন কূটনীতিক সার্ক মহাসচিব ছিলেন। সার্ক সচিবালয়ের নেতৃত্ব পাওয়ার বিষয়টি আগে থেকেই বাংলাদেশের জানা ছিল এবং ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘সার্ক অনুবিভাগ’-এ নিয়ে নীরবে কাজ করে আসছে। ভারতের ওপর নির্ভরশীল নীতির কারণে গত সরকারের আমলে সার্ক পুনরুজ্জীবনের কোনো প্রকাশ্য উদ্যোগ দেখা যায়নি। তবে গত ৫ আগস্ট বাংলাদেশের পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে সার্ক অনুবিভাগের প্রচেষ্টা আরও সক্রিয়তা পায়। বাংলাদেশ এ মুহূর্তে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৮-৩০ এপ্রিলের প্রোগ্রামিং কমিটির বৈঠকের পর বাংলাদেশ সার্কের স্ট্যান্ডিং কমিটি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল। তবে সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনায় সেই পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে।
ঢাকার একজন কূটনীতিক জানান, ভারতের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের আলোচনা ইতিবাচক হলেও শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক নিয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার সার্ক পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। গত বছরের ২ ডিসেম্বর তিনি মন্তব্য করেন, ‘সার্ক এখন একটি বিস্মৃত শব্দ। এটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারলে গোটা অঞ্চলের মানুষের কল্যাণ বয়ে আনবে।’
গত ২০ এপ্রিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে নেপালের রাষ্ট্রদূত ঘনশ্যাম ভান্ডারি বলেন, ‘২০১৪ সালের কাঠমান্ডু সম্মেলনের পর আর কোনো সামিট হয়নি। সার্ক সম্মিলিত সিদ্ধান্তেই চলে, তাই সব সদস্য রাষ্ট্র একমত না হলে কোনো শীর্ষ সম্মেলন বা বৈঠক সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘নেপাল ও বাংলাদেশ সার্ক পুনরুজ্জীবনে একই মনোভাব পোষণ করে। কারণ সার্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। তাই আমরা এ নিয়ে কাজ করতে প্রতিশ্রুত।’
সার্ক সচিবালয় জানায়, সার্কের মহাসচিব গোলাম সারওয়ার ২০২৪ সালের ২১ মে ইসলামাবাদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রী সার্ককে শক্তিশালী করতে পাকিস্তানের পূর্ণ সমর্থন ও ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন দ্রুত আয়োজনের আকাক্সক্ষা পুনর্ব্যক্ত করেন। এর আগে মহাসচিব ১১-১৪ মে ভারত সফর করেন। তিনি তখন ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রাজকুমার রঞ্জন সিং, পররাষ্ট্র সচিব রাষ্ট্রদূত বিনয় মোহন কোয়াত্রা ও সচিব (পূর্ব) রাষ্ট্রদূত জয়দীপ মজুমদারসহ ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ-সংক্রান্ত আলোচনা করেন। ভারতীয় প্রতিনিধিরাও সার্ক প্রক্রিয়ার প্রতি পূর্ণ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত শহীদুল হক বলেন, ‘সার্ক নিষ্ক্রিয়তার জন্য পুরোপুরি দায়ী ভারত। বিজেপি সরকার বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে আগ্রহী নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সার্ক সচল থাকলে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া যেত। অথচ এ মুহূর্তে ইসরাইল ছাড়া অন্য কোনো রাষ্ট্র ভারতের পক্ষে নেই। প্রতিবেশী দেশগুলোও ভারতের পক্ষে নেই। সার্ক পুনরুজ্জীবিত হলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সংযুক্ত হবে এবং এ অঞ্চলের ম্যুরাল অথরিটি থাকবে। কিন্তু চলমান পরিস্থিতিতে শিগগিরই সেটি হওয়ার সুযোগ দেখছি না। তবে এ জন্য উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।’
তুরস্কের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘সার্ক এখন কার্যত কোমায় থাকলেও এটি এ অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থা। এর পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নিলে এর কার্যক্রম সচল করা সম্ভব। বাংলাদেশ যে প্রক্রিয়ায় সার্ককে সক্রিয় করতে চাচ্ছে, তা কিছুটা পরিবর্তিত হলেও ইতিবাচক ফল দিতে পারে। আর বর্তমানে আঞ্চলিক রাজনীতির যে অবস্থা তাতে সার্কের ভূমিকা খুবই জরুরি।’