আগামী বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়াতে যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে শিল্প খাতের প্রতিটি স্তরে খরচ বাড়বে। এই খাতে বেশি ব্যবহৃত শতাধিক কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতি প্রত্যাহার করা হবে। ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, মোবাইল ফোন ও ব্যাটারির উৎপাদন পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাড়ানো হচ্ছে। মৎস্য, ডেইরি ও পোলট্রি খাতে করছাড়ের সুবিধা রাখা হচ্ছে না। কম্পিউটার প্রিন্টার, রাউটার, মডেমসহ প্রযুক্তি খাতে প্রায় সব ধরনের পণ্যে অগ্রিম কর বসানো হচ্ছে। বিমান ইঞ্জিন, বাসসহ পরিবহন খাতের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানিতেও বসছে নতুন কর। শিল্প যন্ত্রপাতি আমদানিতেও বসছে অগ্রিম কর। টেক্সটাইল খাতের কর রেয়াত হচ্ছে না।
Manual6 Ad Code
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে শুল্ক, কর ও ভ্যাটের মারপ্যাঁচে আগামী অর্থবছরের বাজেটে শিল্প খাতের খরচ বাড়িয়ে ফেলা হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব জানা যায়। এসব প্রস্তাবের মধ্যে ভ্যাট ও শুল্ক খাতের প্রস্তাব বাজেট ঘোষণার পরই কার্যকর হবে। এ হিসাবে বাজেট ঘোষণার পরই শিল্প খাতের বেশির ভাগ খরচ বেড়ে যাবে।
Manual6 Ad Code
শিল্প খাতে নতুন করে রাজস্ব (কর, ভ্যাট ও শুল্ক) অব্যাহতি সুবিধা দেওয়া হবে না। অনেক খাতেই নতুন করে রাজস্ব আরোপ হচ্ছে। এখন বহাল আছে, এমন অনেক খাতেই রাজস্ব বাড়ানো হচ্ছে।
Manual6 Ad Code
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান মাল্টিমোড গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বছর তিনেক ধরে ডলারের দাম বাড়ায় সংকটে আছে শিল্প খাত। এর মধ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাড়তি ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আরোপ করে খরচ আরও বাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী বাজেটে আবারও রাজস্ব বাড়ানো হলে শিল্প খাতে সংকট আরও বাড়বে।
একই মত জানিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আইএমএফের সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এরই মধ্যে এনবিআর বাড়তি রাজস্ব যোগ করে শিল্পের অনেক খাতে খরচ বাড়িয়ে ফেলেছে। আগামী বাজেটেও এ ধারা থাকলে গোটা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এনবিআরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় মাস আগে ফ্রিজ ও এয়ার কন্ডিশনার প্রস্তুতকারকদের ওপর করপোরেট কর দ্বিগুণ করা হয়। বর্তমানে ফ্রিজ ও এয়ার কন্ডিশনারের উৎপাদন পর্যায়ে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট রয়েছে। আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করেছে এনবিআর। মোবাইল ফোন তৈরিতে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের ওপর নির্ভর করে ৫ ও সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট রয়েছে। আসছে বাজেটে তা সাড়ে ৭ শতাংশ ও ১০ শতাংশ করারও প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যাটারি উৎপাদনে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট বাড়িয়ে দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, আগামী বাজেটে টার্নওভার কর দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিগত সরকারের রাঘববোয়াল, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা মৎস্য, ডেইরি ও পোলট্রি খাতে বিনিয়োগ দেখিয়ে করছাড়ের সুবিধা নিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। আগামী অর্থবছরে এ সুযোগ বাতিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এসব খাত থেকে আয় করলে তার ওপর ৩ থেকে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ হারে আয়কর দিতে হবে। তবে আগামী বাজেটে এসব খাতের আয়ের ওপর নিয়মিত হারে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত করের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এসব খাত থেকে বার্ষিক আয় হলে প্রথম ১০ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ, পরবর্তী ১০ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর দিতে হয়।
আগামী অর্থবছরে এ করের আওতায় আরও আনা হচ্ছে হাঁস-মুরগি ও চিংড়ি হ্যাচারির আয়, পোলট্রির পেলেটেড ফিড উৎপাদন কারখানা, গবাদিপশু, চিংড়ি ও মাছের পেলেটেড ফিড উৎপাদন কারখানা, বীজ উৎপাদন ও বিপণন ব্যবসা, গবাদিপশুর খামার, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যের খামার, ব্যাঙ উৎপাদন খামার, হর্টিকালচার, তুঁত চাষ, মৌমাছি চাষ প্রকল্প, রেশম গুটিপোকার খামার, মাশরুম খামার এবং ফ্লোরিকালচার।
এনবিআর সূত্রমতে, শিশুখাদ্য, মসলা, ফল, পোশাক, যানবাহন, খেলনা, সিরামিক পণ্য, বাথরুম ও বৈদ্যুতিক ফিটিংস, সুইচ, চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন আমদানি পণ্যে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হতে পারে। একই সঙ্গে আগামী অর্থবছর থেকে স্থানীয় সরবরাহে বর্তমানে আরোপিত সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া, শিল্প উপকরণের ওপর আরোপিত ৩ শতাংশ অগ্রিম কর কমিয়ে ২ শতাংশ করা হতে পারে।
এনবিআর সূত্রমতে, আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে টেক্সটাইল খাতের ১৫ শতাংশ কর রেয়াত তুলে দিলে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির জন্য করহার হবে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ; যা বাড়ার হার প্রায় ৮৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, টেক্সটাইল খাতের করহার ১৫ শতাংশ বলা হলেও কার্যকর হার অনেক বেশি। মুনাফা মাত্র ৩ শতাংশ হলেও ১ শতাংশ উৎসে কর দিতে হয়, যা হিসাব করে হয় ৩৩ শতাংশ।
Manual7 Ad Code
সূত্র জানায়, আগামী জুনে টেক্সটাইল খাতের কর রেয়াত মেয়াদ শেষ হলে তা আর নবায়ন করা হবে না। আইএমএফ থেকে অনেক দিন ধরেই এ রেয়াত তুলে নেওয়ার চাপ দিয়ে আসছে।