ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য। বরাদ্দের বাকি অর্থ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ইসি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যয় করার পরিকল্পনা করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এবারের বাজেটে নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দের যে প্রস্তাব করা হচ্ছে তা যুক্তিসংগত। কারণ জাতীয় ও স্থানীয় উভয় নির্বাচনের ব্যয় মেটানোর জন্য এই পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ে সূত্র বলেছে, নির্বাচন আয়োজনের জন্য ইসির চাহিদা অনুযায়ী অর্থ ছাড় করা হবে। কাজেই নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে অর্থের কোনো সমস্যা হবে না।
চলতি (২০২৪-২৫) অর্থবছরের মূল বাজেটে নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিভিন্ন নির্বাচনের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইসির বাজেট ছিল ২ হাজার ৪০৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। তবে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বাজেটে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৪ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা করা হয়।
Manual2 Ad Code
২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে নির্বাচন কমিশনের মোট বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া নির্বাচন উপলক্ষে ভোটার তালিকা প্রস্তুত কার্যক্রম, জাতীয় পরিচয়পত্র মুদ্রণ ও বিতরণ খাতে আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৭০ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়েছে সংস্থাটি। ইসি সূত্রে জানা গেছে, এবারের সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা খাতে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার প্রয়োজন পড়বে। ভোট ব্যবস্থাপনায় ইসির ব্যয়ের খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোটার সংখ্যার অনুপাতে ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা। এ ছাড়া মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, নির্বাচনি মালামাল সরবরাহ, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও ভাতা প্রদান এবং রিটার্নিং অফিসারসহ অন্য কর্মীদের জন্য বরাদ্দ।
Manual5 Ad Code
বিগত কয়েকটি সংসদ নির্বাচনে ইসির ব্যয় খাত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ছাড়া নির্বাচনকেন্দ্রিক সিংহভাগ ব্যয় হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা খাতে। বিগত ৮টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে আনুপাতিক বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা খাতে সবচেয়ে বেশি ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয় হয় পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে; যা ছিল মোট ব্যয়ের ৭০ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে নির্বাচনগুলোতেও এ খাতে ব্যয় ছিল গড়ে ৬০-৭০ শতাংশ।
সবশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ইসির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২ হাজার ২৭৬ কোটি ২২ লাখ টাকা; যা একাদশ নির্বাচনের চেয়ে বেশি। নির্বাচন পরিচালনা খাতে ৪২ হাজারের বেশি ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৫০ কোটি ৬০ লাখ টাকা। বাজেটে নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ১ হাজার ২২৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয় হয়। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা খাতে ব্যয় হয় ১ হাজার ১৩৭ কোটির বেশি; যা মোট ব্যয়ের ৫৯ শতাংশ।
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা ও নির্বাচন পরিচালনার জন্য মোট ৭০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। পরে তা আরও বেড়ে যায়। ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে ইসির ব্যয় হয় ১৬৫ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে ইসির ভোটের ব্যয় ছিল প্রায় ২৬৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে নির্বাচন পরিচালনায় ৮১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয় ১৮৩ কোটি টাকা। এ নির্বাচনে ১৪৭ আসনে ভোট হয়, ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন প্রার্থীরা। সে সময় অর্ধেক আসনে ভোটের আয়োজন করা হয়। সে কারণে ব্যয় কম হয়। তবে ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ৮ কোটি ১০ লাখের বেশি ভোটারের জন্য ইসির নির্বাচনি ব্যয় ছিল ১৬৫ কোটি টাকা।
বিগত বেশ কিছু নির্বাচনে বাজেটের অর্থ অনেক অপচয় হয়েছে মন্তব্য করে নির্বাচনি ব্যয়ের খাতগুলোতে অপচয় রোধ করে তা স্বচ্ছ ও যৌক্তিক রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচনি বাজেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ নির্বাচনি বরাদ্দ ইসির চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই করে সরকার। তবে বিগত দিনে নির্বাচনি বাজেটে বিশেষ করে প্রশিক্ষণ খাতে আমরা অপচয় লক্ষ করেছি। কাজেই অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের ব্যয়কে যুক্তিসংগত পর্যায়ে রাখা উচিত।’ কাজেই এ ধরনের ঘটনা যাতে আগামীতে ঘটতে না পারে, সে ব্যাপারে ইসিকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
নির্বাচনব্যবস্থা বিশ্লেষক ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বলেছেন, ‘বিগত দিনে আমরা দেখেছি, ইসির নির্বাচনি বাজেট বরাদ্দে তেমন হেরফের হয় না। নির্বাচনি বাজেট বেশ বিছু ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভরশীল। তার মধ্যে ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা খাত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এরপর নির্বাচন পরিচালনায় কী পরিমাণ জনবল (পোলিং এজেন্ট ও আইনশৃঙ্খলা কর্মী) মাঠে থাকবে এবং কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় ব্যয় হবে তা গুরুত্বপূর্ণ। সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ ইসির পক্ষ থেকে এবার যে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে তা এ পর্যায়ে যুক্তিসংগতই মনে হচ্ছে। তবে প্রেক্ষাপট, নির্বাচনি সরঞ্জামের বাজারমূল্য বিবেচনায় সেটা কমবেশি হতেই পারে।’
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের খরচ যা হবে, তা সরকারকে দিতে হবে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আমরা সরকারের কাছে পর্যাপ্ত বরাদ্দ চেয়েছি। এই অর্থ পাওয়া গেলে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনের ব্যয় সুষ্ঠুভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে। আসলে সবকিছুই নির্ভর করবে ভোট কবে হবে এবং ভোটের সময়কার পরিস্থিতির ওপর। কারণ বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা চাওয়া হলেও আসনপ্রতি ৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হিসাব করা হয়। জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।’
Manual3 Ad Code
গত জুলাইয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দায়িত্ব গ্রহণ করে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ঘোষণা করে। এদিকে বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের কাছ থেকে নির্বাচনের রোডম্যাপসহ সুনির্দিষ্ট তারিখ জানতে চাইলেও সরকার সে বিষয়টি এখনো স্পষ্ট করেনি। এ কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।