প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৩শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তারা গ্রেফতার আতঙ্কে

editor
প্রকাশিত জুন ২৪, ২০২৫, ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ
নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সাবেক কর্মকর্তারা গ্রেফতার আতঙ্কে

Manual2 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual6 Ad Code

 

রোববার রাত ১২টা। হঠাৎ এক টেলিফোন এলো। যিনি টেলিফোন করেছেন তিনি একজন সাবেক নির্বাচন কমিশনার। বর্তমানে ভাড়া এক বাসায় থাকলেও, রাত থেকে কেন জানি বাসায় থাকতে নিরাপদবোধ করছেন না। অকপটে তার মনের অবস্থার কথা জানালেন। তিনি বাসা ছেড়ে অন্য কোথাও যাবেন কি না তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। কেন এই দ্বিধা-এই প্রশ্নে তিনি আলতো করে নিচুস্বরে শুধু বললেন, ‘জানি না।’

 

Manual1 Ad Code

গত রোববার সন্ধ্যায় সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা উত্তরার বাসা থেকে আটক হওয়ার পর থেকেই সেই কমিশনারের মনের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে। না জানি কখন তিনি গ্রেফতার হন। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধান লঙ্ঘন করে বিতর্কিত দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদ, কেএম নূরুল হুদা ও কাজী হাবিবুল আউয়াল কমিশনের বিরুদ্ধে রোববার সকালে মামলা করে বিএনপি। এতে তিন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ১৯ জন ও আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। আর সকালে মামলা করা হয় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায়। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. সালাউদ্দিন খান এই মামলার বাদী।

 

সকালে মামলা হলো আর গ্রেফতার হলো সন্ধ্যায়-তা অনেকেই ধারণা করেননি। কেন এই মামলা? তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে। যেখানে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে হওয়া ২০১৪, ২০১৮ আর ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে সিইসি, ইসি ও সচিবদের ভূমিকা ছিল। বিতর্কিত এই তিন নির্বাচনকে ঘিরে বারবার অভিযোগ করার পরও তৎকালীন সিইসি ও সংশ্লিষ্টরা কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেননি। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর গত ১৬ জুন ঐকমত্য কমিশনের এক বৈঠক শেষে সরকারপ্রধানের দফতরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হওয়া বিতর্কিত তিন জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনে জড়িত সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সচিবদের ভূমিকা তদন্তে অবিলম্বে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হয়ে যান। সেই সংসদকে বিনা ভোটের সংসদ আখ্যা দিয়ে ভোট বর্জন করে বিএনপি।

 

আবার ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। বেশিরভাগ ভোট আগের রাতে হয়ে যাওয়ার ফলে বিরোধীরা মাত্র সাতটি আসনে জয় পায়। সে নির্বাচনের নাম হয় নিশিরাতের নির্বাচন। এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন কেএম নূরুল হুদা। আর ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনাদের বর্জনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের সঙ্গে দলের বিদ্রোহীদের। এই নির্বাচনের নাম হয়, ‘আমি আর ডামি’।

 

এই তিনটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনে যারা ছিলেন তাদের নিয়ে মামলা হয়েছে। এই মামলার প্রথমেই গ্রেফতার হলেন সে সময়কার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদা। এই গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে সবার মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক আরও বেড়ে গেল।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক কমিশনার রাতে বলেন, আমরা সিইসির কথামতো কাজ করেছি। আর যদি কথামতো কাজ না করে পদত্যাগ করতাম তা হলে আমাদের ওপর অন্য ধরনের খড়গ নেমে আসত। তবে প্রধান কমিশনার ইচ্ছে করলে নিজের শারীরিক অসুস্থতা দেখিয়ে পদত্যাগ করতে পারতেন। সিইসি করলে সব কমিশনাররা পদত্যাগ করার সাহস পেতেন।

 

কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদের কমিশনের এক সাবেক কমিশনার গত রোববার রাত থেকে মোবাইল ফোন বন্ধ রেখেছেন। কিন্তু সোমবার সকালে তাকে হঠাৎ ফোনে পাওয়া গেলে তিনি শুধু বলেন, এখন কি কথা বলার সময়? বলেই ফোন কেটে দেন। সেই থেকে তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

 

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক এক সচিব বর্তমানে বিদেশে রয়েছেন। তাকে হোয়াটস অ্যাপে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আমাকে কেন গ্রেফতার করবে? আমি তো প্রধান নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করেছি। আর সরকারের ইচ্ছে ছাড়া কি কোনো নির্বাচন কমিশন কাজ করতে পারে? সে সময় মতের বিরুদ্ধে কাজ করলে হয়তো আমার নামে অন্য কোনো মামলা দিত। নির্বাচন কমিশনকে যতই বলি স্বাধীন। আসলে সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতেই হয়। কারণ বাজেট তো সরকার দেয়।

 

Manual8 Ad Code

গ্রেফতার আতঙ্কের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি অনেক আগেই বিদেশে চলে এসেছি। নির্বাচন কমিশন ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রেও গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে।

 

ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি মনিরুল মওলাকে গত রোববার সোয়া ১২টার দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসা থেকে গ্রেফতারের পর থেকেই সোমবার নতুন করে ব্যাংকপাড়ায় গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এস আলম গ্রুপ বেশ কয়েকটি ব্যাংককে নিজের কব্জায় নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, বিশাল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। এই পাচারের ক্ষেত্রে কোনো কোনো ব্যাংক তাকে সহযোগিতা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর জড়িত বলে শোনা যায়। সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার অভ্যুত্থানের পর গা ঢাকা দেন। এখনও তিনি গ্রেফতার হননি। তিনি গণঅভ্যুত্থানের পর স্থলপথ দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ধরা পড়লেও বেঁচে যান। শোনা যায় বর্তমানে যশোর জেলায় একটি বিশেষ স্থানে আত্মগোপনে রয়েছেন।

 

Manual2 Ad Code

বর্তমান সরকারি আমলাদের মধ্যেও গ্রেফতার আতঙ্ক রয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন আমলাকে গ্রেফতারের দাবি উঠেছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে তাদের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কয়েকজন সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসর দিয়েছেন। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেয়াইয়ের এক ঘনিষ্ঠ সচিব রয়েছেন। বাধ্যতামূলক সচিবদের মধ্যেও গ্রেফতার আতঙ্ক মানসিকভাবে কাজ করছে।

 

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সচিব অকপটে জানিয়েছেন, সরকারের সঙ্গে কাজ করলে তাদের নির্দেশনা মানতেই হবে। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটলে ওএসডি অথবা অন্য কোনো শাস্তির জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।

 

গত সোমবার এক আলোচনা সভায় বিএনপি চেয়ারপারসনের এক উপদেষ্টা দাবি তুলেছেন, বিতর্কিত সব নির্বাচন কমিশনের সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। সুতরাং গ্রেফতার আতঙ্ক কারও পিছু ছাড়ছে না।

 

কিছুদিন আগে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল হয় সচিব আলী হোসেনের। তিনি বলেন, গ্রেফতার আতঙ্ক তাদেরই থাকবে যারা কোনো অপরাধ করেছেন। তবে আমলাদের গ্রেফতার হওয়া দুঃখজনক। কারণ তারা যে সরকারই থাকুক না কেন, বা আসুক না কেন তাদের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হয়। তবে আমলারা সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করতেই পারেন।

 

সাবেক উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. আকবর আলি খানের দৃষ্টান্ত টেনে তিনি বলেন, ড. আকবর আলি খান অনেক সময় সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত ধরিয়ে দিতেন। তা সরকার মানুক বা না-ই বা মানুক। আমাদের দেশে এ ধরনের আমলাতন্ত্র কি গড়ে উঠবে? সামনের দিনগুলোতে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার সময় এসেছে।

 

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের বেশিরভাগ সাবেক কমিশনার ও সাবেক নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিবরা তাদের ফোন বন্ধ রেখেছেন। কেউ কেউ তাদের নম্বর পরিবর্তনও করেছেন।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code