বিশ্ববিখ্যাত মোবাইল ব্র্যান্ড নোকিয়া এক সময় দুনিয়া কাঁপিয়েছে। কিন্তু স্মার্টফোন যুগ এলে তারা পুরনো সফটওয়্যার ধরে রেখে বলেছিল আমাদের সিস্টেমই সঠিক। বাজার কিন্তু মানেনি। ব্যবহারকারীরা তাদের ছেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত নোকিয়া পুরো সিস্টেম পাল্টাতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবার ক্ষেত্রেও সঠিক সিদ্ধান্তটাই জরুরি। সেটাই নিতে পারছেন না নীতিনির্ধারকরা। কারণ, এনআইডি সেবা দিতে গিয়ে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সেই বিশৃঙ্খলা থেকে বের হয়ে আসার কোনো রোডম্যাপ তাদের নেই। এখনো প্রতি মাসে দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ নতুন করে তাদের এনআইডি সংশোধন করতে নির্বাচন কমিশন অফিসগুলোতে দৌড়ান। আগের ক্রমপুঞ্জীভূত সংখ্যার সঙ্গে নতুন সংখ্যাটি যোগ হয়ে মোট সংখ্যাটিকে বড় করে। এ অবস্থায় যদি তিন মাসের বেশি সময় এনআইডি সেবা বন্ধ থাকে, তাহলে সেবাপ্রত্যাশীদের ওপর এক বিশাল বোঝা চেপে বসবে।
গত সোমবার বিকেল ৪টার পর থেকে জাতীয় এনআইডি সংশোধন কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। নির্বাচন পর্যন্ত এনআইডি সংশোধন বন্ধ থাকবে। ওইদিন নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এএএম হুমায়ুন কবীর জানান, ভোটার তালিকার কাজ চলমান থাকায় এনআইডির তথ্য ও ভোটার তালিকার তথ্যে অমিল তৈরি হতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভোট দেওয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এখনো নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করেনি। আগামী মাসে তা ঘোষণা করার কথা রয়েছে। ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। প্রথমার্ধে নির্বাচন হলেও গেজেট জারিসহ আনুষঙ্গিক কাজে পুরো ফেব্রুয়ারিই ব্যস্ত থাকবে কমিশন। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচনের ১৫ দিন পরেও এনআইডি সংশোধন কার্যক্রম শুরু হয় না। তা ধরলে তিন মাসের বেশি সময় সংশোধন কাজ বন্ধ থাকবে।
গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার মোক্তারপুর গ্রামের ফারুক হোসেন জানান, যেকোনো নির্বাচনের পরই এনআইডি সেবা বন্ধ রাখে নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় অফিস। সবশেষ উপজেলা নির্বাচনের ১৫ দিন পরও এনআইডি সংশোধন কাজ শুরু করেনি কালীগঞ্জের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। তিনি ঢাকা থেকে শুধু সংশোধিত কার্ডটি সংগ্রহ করতে কালীগঞ্জ গিয়েছিলেন। তাকে দেওয়া হয়নি। অথচ সংশোধনের কাজ আগেই করা হয়েছিল। শুধু সরবরাহের কাজটি স্থানীয় অফিস করেনি। নির্বাচনের দোহাই দেওয়া হয়। এই কার্ডটির জন্য তিনি পাসপোর্ট করাতে পারেননি।
এনআইডি সংশোধন নিয়ে সাধারণ মানুষের হয়রানির শেষ নেই। প্রতিদিন শত শত মানুষ এনআইডি সংশোধন করতে নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় অফিসগুলোতে ভিড় করেন। বর্তমানে এনআইডি ছাড়া কাজ করা খুবই কঠিন। জমি বিক্রি করে পরিবারের অসুস্থ সদস্যকে চিকিৎসা দেবেন সেখানেও সঠিক এনআইডি লাগবে। বেকার জীবনের অবসান ঘটানোর জন্য বিদেশ যাত্রায়ও এনআইডি বাধ্যতামূলক। এমন অসংখ্য কাজে এনআইডি লাগে।
এর মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট, লাইফ ইন্স্যুরেন্স বা বীমা পলিসি, লোন বা ক্রেডিট কার্ড গ্রহণ, আর্থিক লেনদেনে যাচাইকরণ, শেয়ারবাজারে অ্যাকাউন্ট (বিও) খোলা উল্লেখযোগ্য। টেলিকম ও ডিজিটাল খাতে সিম রেজিস্ট্রেশন, ডিজিটাল অ্যাপ সাইনআপ ও ভেরিফিকেশন ইত্যাদি। পাসপোর্ট ও ভ্রমণ সংক্রান্তসেবা পাসপোর্টের জন্য আবেদন, ই-পাসপোর্ট বায়োমেট্রিক যাচাইকরণ, ভিসা প্রসেসিংয়ের সময় পরিচয় মেলানো, ইমিগ্রেশন সিস্টেমে পরিচয় যাচাই উল্লেখযোগ্য। ভূমি ও সম্পত্তি সম্পর্কিত জমির দলিল নিবন্ধন, নামজারি বা মিউটেশন, ভূমি জরিপ বা খতিয়ান সংশোধন, অনলাইনে ভূমি সেবা, রেজিস্ট্রি অফিসে মালিকানা যাচাইকরণ ইত্যাদি। সরকারি সেবা ও ভাতা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি (বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা), সরকারি ফুড কার্ড বা পরিবার কার্ড, টিআইএন নিবন্ধন ও আয়কর রিটার্ন, যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিবন্ধন উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি আবেদন, বিসিএস আবেদন, সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে ভেরিফিকেশন, বিভিন্ন ট্রেনিং বা স্কলারশিপ আবেদন এবং প্রবাসী কর্মসংস্থানের বিএমইটি নিবন্ধন উল্লেখযোগ্য। আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, কোর্টে হলফনামা ও নথিপত্রে পরিচয় যাচাই ও ক্রাইম ইনভেস্টিগেশনে ব্যক্তির পরিচয় মেলানো ইত্যাদি। ব্যবসা ও করপোরেট খাতে ট্রেড লাইসেন্স আবেদন, ব্যবসায়িক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, চুক্তিপত্রে পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং সরবরাহকারী বা কন্ট্রাক্টর রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে এনআইডি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য খাতে টিকা বা সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম, স্বাস্থ্য বীমা নেওয়া এবং সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচিতে রেজিস্ট্রেশন করতে এনআইডির প্রয়োজন হয়। অনলাইন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও এনআইডি গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ফেসবুক বা গুগল বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্ট ভেরিফাই, ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম যাচাইকরণ ও অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়েতে এনআইডির দরকার পড়ে। নির্বাচন ও রাজনৈতিক বিষয়ে এনআইডি দরকার পড়ে ভোটদান, ভোটার এলাকা স্থানান্তর এবং মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় পরিচয় যাচাইয়ের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র প্রয়োজন হয়।
মানুষের এসব প্রয়োজন যেকোনো সময় হতে পারে। বিশেষ করে বছরের শুরুতে স্কুল-কলেজে ভর্তি, পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজে এনআইডি কার্ড লাগবে। এ সময়ে সেবা বন্ধ থাকায় মারাত্মক বিপাকে পড়বে সাধারণ মানুষ। শুধু এ নির্বাচনই নয়, এরপর স্থানীয় সরকার পর্যায়ে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা নির্বাচন সামনে আছে। সেসব নির্বাচনেও এ সেবা বন্ধ থাকলে সাধারণ মানুষের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ স্থবির হয়ে থাকবে।
Manual6 Ad Code
Manual1 Ad Code
ডেমরার আমুলিয়া এলাকার বাসিন্দা হাবিবুল ইসলাম জানান, তার ছেলে বিদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ পেয়েছে। সেখানে ভর্তির জন্য পাসপোর্ট করতে হবে। এজন্য গত মাসে এনআইডির আবেদন করেছেন। কিন্তু এখনো এনআইডি কার্ড হয়নি। এটা যদি নির্বাচন পর্যন্ত বন্ধ থাকে, তাহলে তার ছেলের পাসপোর্ট করাতে পারবেন না। তার বিদেশে উচ্চশিক্ষাও হবে না।
উত্তরার বাসিন্দা হামিদুল ইসলাম বলেন, ইসি যদি এ কাজ সারা বছর করতে না পারে, তাহলে তাদের বাদ দিয়ে অন্য চিন্তা করতে হবে। জাতীয় পরিচপত্র মৌসুমি কোনো জিনিস নয় যে, কয়েক মাস চালু রাখবেন আর কয়েক মাস বন্ধ রাখবেন।
জাতীয় পরিচয়পত্রের নামে নেওয়া তথ্যের সুরক্ষা দিতে পারছে না নির্বাচন কমিশন। হারিয়ে গেলে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তা উত্তোলন বা কোনো ভুলভ্রান্তি সংশোধন করতে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়তে হয় অনেককেই। দফায় দফায় পোহাতে হয় ভোগান্তি। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনলাইন ও অফলাইনে সক্রিয় অসংখ্য চক্র। ইসির কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় এসব চক্রের মাধ্যমে নাগরিকদের সুরক্ষিত তথ্য চলে যাচ্ছে অলিগলির দোকানে, পড়ছে বেহাত হওয়ার ঝুঁকিতেও।
এদিকে, শুরু থেকেই প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছে না ইসি। সেবা দেওয়ার বদলে মালিকানা আঁকড়ে থাকাকে সাফল্যের মাপকাঠি বানিয়েছে তারা। দায়িত্ব অনেক ক্ষমতাও দেয়। সেই ক্ষমতা কেউই ছাড়তে চায় না। সেটা করার সক্ষমতা না থাকার পরও তারা দায়িত্ব আঁকড়ে থাকতে চায়। সেই অবস্থান থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু এনআইডির কাজটি তারা পেয়েছে আইনিভাবে। তাই সেই আইন সংশোধন করা ছাড়া তাদের কাছ থেকে কাজটি সরিয়ে নিতে পারে না সরকার। তাই আইন সংশোধন করে সরকার আলাদা একটি কর্তৃপক্ষ করে তাদের হাতে এনআইডির কাজ তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য আইনের খসড়া করা হয়, যা মন্ত্রিসভায় পাসও হয়। কিন্তু এর মধ্যেই সরকার বদল হয়ে যায়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশনের বাধায় তা আর বাস্তবায়ন করা যায়নি।
ভারতেও এক সময় নির্বাচন কমিশন নাগরিক পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত কাজ করত। সেবায় বিশৃঙ্খলা বাড়লে সরকার পুরো দায়িত্ব নতুন কর্তৃপক্ষ ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অব ইনডিয়া বা ইউআইডিএআই গঠন করে তার হাতে দেয়। আজ তাদের আধার কার্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ডিজিটাল আইডেন্টিটি সিস্টেম।
Manual8 Ad Code
অথরিটি বদলানোর নজির বলে শেষ করা যাবে না। ফুকুশিমা বিপর্যয়ের পর জাপান দেখল নিয়ন্ত্রক সংস্থা দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল। তারা পুরনো কর্তৃপক্ষ বদলে নতুন এজেন্সি তৈরি করল।
নির্বাচন কমিশনের আসল কাজ নিয়েই অনেক প্রশ্ন আছে। পরিচয়পত্রের বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে সফলতা পাওয়ার কোনো প্রমাণ তারা গত ১৮ বছরে দিতে পারেনি।
নির্বাচন পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে এনআইডি নির্বাচন কমিশনে থাকা উচিত নয়। নির্বাচন কমিশনের তিন মাসের বেশি সেবা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও একই বার্তা দেয় তারা এ সেবা পরিচালনার সক্ষমতা নিজেরাই স্বীকার করে না।