প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৬ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২২শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৩শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

সংসদে এবার কমতে পারে ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব

editor
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫, ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ
সংসদে এবার কমতে পারে ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব

Manual5 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

 

সরকার সম্প্রতি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করায় কোনো নিবন্ধিত দল জোটে গেলেও তাকে নিজের দলের প্রতীকেই ভোটে অংশ নিতে হবে। এ সিদ্ধান্ত জোটের রাজনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিএনপির সঙ্গে জোটে থেকেও ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেক ছোট দলের নেতা নিজেদের দল বিলুপ্ত করছেন বা দল থেকে পদত্যাগ করে সরাসরি বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে কয়েকটি ছোট দলের শীর্ষ নেতা দল ভেঙে বিএনপিতে যোগ দিয়ে প্রার্থিতা নিশ্চিত করেছেন। আরও কয়েকজন নেতা একই পথে হাঁটতে পারেন বলে জানা গেছে। ফলে আসন্ন জাতীয় সংসদে ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর সংসদে বিভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় উঠে এলেও আরপিও সংশোধনীর কারণে এর উল্টোটা হয়েছে। ছোট দলগুলোর নেতারা এখন আর নির্বাচনে নিজ দলের প্রতীকে ভোট করার ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তাই দল ছেড়ে জোটের বড় বড় দলে যোগ দিতে দেখা যাচ্ছে।

 

সমমনা ১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা জোটের মুখপাত্র ও জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের পরামর্শে ২২ ডিসেম্বর জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন সৈয়দ এহসানুল হুদা। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঢাকা-১৩ আসনে প্রার্থী হবেন। তিনি দুয়েক দিনের মধ্যেই বিএনপিতে যোগ দেবেন বলে জানা গেছে। নড়াইল-২ আসনে প্রার্থী হবেন ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। এনপিপি নিবন্ধিত না হওয়ায় তিনি দল বিলুপ্ত করে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন।

এ ছাড়া লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) থেকে বেরিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন দলটির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমদ। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে কুমিল্লা-৭ আসন থেকে নির্বাচন করবেন। এর আগে গত ৮ ডিসেম্বর ১২ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও বিএলডিপি চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম নিজের দল বিলুপ্ত ঘোষণা করে বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর তাকে লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করে বিএনপি। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি এলডিপির হয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন।

গণঅধিকার পরিষদ ছেড়ে গত ১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া।

অন্যদিকে শনিবার গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন রাশেদ খান। ঝিনাইদহ-৪ (কালীগঞ্জ ও সদরের আংশিক) আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন তিনি। জোট করতে আগ্রহী দলগুলোর চিন্তা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে না পারলে তাদের জিতে আসা কঠিন হতে পারে। আর বিএনপি মনে করছে, জোটের এমন প্রার্থী হেরে গেলে তাদের আসন কমার ঝুঁকি তৈরি হবে। ফলে জোটভুক্ত ছোট দলগুলোর প্রার্থীদের বিএনপিতে যোগ দিতে উৎসাহিত করছে দলটি।

বিএনপির সূত্র বলছে, আরও কয়েকটি ছোট দলের নেতারা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে বিএনপিতে আসতে চাইছেন। সোমবারের মধ্যেই তারা সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন। ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারের দল নিবন্ধিত নয়। তিনি পিরোজপুর-১ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। তিনিও বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করবেন বলে জানা গেছে। তার দলও বিলুপ্ত করা হতে পারে।

Manual5 Ad Code

বিশ্লেষকরা বলছেন, আরপিও সংশোধনীর কারণে ছোট দলগুলো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং জোট করার ক্ষেত্রে আগ্রহ কমে যাবে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় কোনো একটি দলের প্রতীক নিলে তাতে দলগুলোর ভোটের প্রকৃত চিত্র লিপিবদ্ধ করা যায় না। এ ক্ষেত্রে নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করলে দলগুলোর ভোটের সংখ্যা যথাযথভাবে উঠে আসে।

সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একাধিক নিবন্ধিত দল জোট করলেও জোট মনোনীত প্রার্থী বড় দলের বা অন্য দলের প্রতীকে ভোট করতে পারবে না, নিজ দলের প্রতীকে ভোট করতে হবে। এর আগে গত ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আরপিও সংশোধন অধ্যাদেশের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়ার পর এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল বিএনপি। দলটি নির্বাচন কমিশন ও আইন মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে তাদের আপত্তির কথা তুলে ধরে। এরপর সরকার বিষয়টি বাদ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তখন জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এ সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিলে শেষ পর্যন্ত ওই বিধান রেখেই অধ্যাদেশ জারি করা হয়।

 

বিশ্লেষকরা বলছেন, জোটে ভোট করলেও নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় ভোটের হিসাব-নিকাশে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএনপি দলীয় জোট। অন্যদিকে কিছুটা লাভবান হবে জামায়াতসহ তার মিত্র দলগুলো। কারণ ছোট দলগুলো বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হলেও ‘ধানের শীষ’ প্রতীক না পেলে ছোট দলের অনেক প্রার্থীর জয় পাওয়া অনেকটা কঠিন হবে। অন্যদিকে জোটের প্রার্থী হিসেবে বিএনপি আসন ছাড় দিলেও দলের কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলে জোটের শরিক দলের প্রার্থীর ভোটে জেতা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণেই মূলত বিএনপি জোটের ছোট দলগুলোর নেতারা বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষে ভোট করতে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে এতে আগামী সংসদে ছোট দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব কমবে।

Manual2 Ad Code

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আব্দুল আলিম বলেন, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদনে নিজ দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিধান করার সুপারিশ করেছিল। কারণ ছোট দলগুলোকে নিয়ে একতরফা নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা কিংবা বড় দলগুলোকে ব্যবহার করে ছোট দলের সুবিধা নেওয়ার যে চর্চা, গত কয়েকটি নির্বাচনে দেখা গেছে আরপিও সংশোধনীর পর নতুন ব্যবস্থায় তার অবসান ঘটাতে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, একটা দলের নিজস্ব আদর্শ, গঠনতন্ত্র, প্রতীক নিয়ে জনগণের কাছ যাবে বলেই তারা কমিশনের কাছ থেকে নিবন্ধন ও প্রতীক নেয়। কিন্তু জোটের বড় দলের প্রতীকে করলে সেটা হয় না। জোটের বড় দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা অনৈতিক।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো যাদের প্রতীক আছে তাদের নিজস্ব মার্কায় নির্বাচন করা উচিত। কারণ যখন আলাদাভাবে আমি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নিচ্ছি, আমার নামের পক্ষে একটা প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তখন আমার রাজনৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে নিজের মার্কা নিয়ে নিজেকে নির্বাচন করা। সুতরাং সেটা করা উচিত। কিন্তু আমি একই সঙ্গে এটা মনে করি, এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে সময় দেওয়া দরকার। এবারের নির্বাচনে নিজ প্রতীকের বাইরে কেউ যদি অন্য কোনো প্রতীকে নির্বাচন করতে চান সেই সুযোগটাও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য রাখা দরকার ছিল।

রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. শামীম রেজা বলেন, যেভাবে দল বিলুপ্তির হিড়িক শুরু হয়েছে, তাতে ভবিষ্যৎ রাজনীতি কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তবে দল বিলুপ্ত করে জোটের বড় দলের প্রতীক পেলেই বিজয় নিশ্চিত হবে; এটা কিন্তু বলা যাবে না। কারণ মূল দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী বা অন্যান্য দলের প্রার্থীরা সব আসনেই রয়ে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি, আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) পাঁচটি, জাসদ (সিরাজ) একটি, ইসলামী ঐক্যজোট একটি, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি, সিপিবি পাঁচটি, ওয়ার্কার্স পার্টি একটি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) একটি, গণতন্ত্রী পার্টি একটি ও ন্যাপ (মোজাফফর) একটি আসন পায়।

Manual3 Ad Code

১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি, বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি, জামায়াতে ইসলামী তিনটি, ইসলামী ঐক্যজোট একটি ও জাসদ একটি আসন পায়।

Manual3 Ad Code

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি, আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি, জাতীয় পার্টি (না-ফি) চারটি, জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) একটি, ইসলামিক ঐক্যজোট দুটি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ একটি আসন পায়।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি, বিএনপি ৩০টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি, জাসদ তিনটি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি দুটি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) একটি, জামায়াতে ইসলামী দুটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) একটি আসন পায়।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code