অনুষ্ঠিত হলো দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা।
এই জানাজায় জনসমুদ্র শব্দটিও যেন বিশালতার কাছে হার মেনেছে। কেননা যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই চোখে পড়েছে শুধু মানুষ আর মানুষ। শোনা গেছে লাখো কণ্ঠের কান্নাজড়িত দোয়া।
রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউ ছাপিয়ে জনস্রোত আছড়ে পড়েছে আশপাশের কয়েক কিলোমিটারজুড়ে। দল-মত-নির্বিশেষে শোকার্ত মানুষের এই ঢল প্রমাণ করল, রাজনীতির ‘আপসহীন নেত্রী’ বেগম খালেদা জিয়া মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন। প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সবাই একবাক্যে স্বীকার করছেন, ‘দেশে এমন জানাজা এর আগে আর দেখেনি কেউ।’
Manual3 Ad Code
আজ বুধবার বিকেল ৩টায় যখন জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বেগম জিয়ার জানাজা শুরু হয়, তখন ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউয়ের আশপাশের সড়কগুলো কার্যত স্থবির।
জানাজাস্থল মানিক মিয়া এভিনিউ পূর্ণ হয়ে সেই ভিড় ছড়িয়ে পড়েছিল উত্তরে জাহাঙ্গীর গেট, পশ্চিমে মিরপুর রোড এবং পূর্বে ফার্মগেট পেরিয়ে কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর ও মগবাজার পর্যন্ত। মাইকের আওয়াজ যতদূর পৌঁছায়, মানুষ ততদূরেই রাস্তায় কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। অনেকের চোখের কোণে জল, কেউ বা হাত তুলে নীরবে দোয়া করছেন।
এর আগে শীত উপেক্ষা করে গতকাল মঙ্গলবার রাত থেকেই মানুষ মানিক মিয়া এভিনিউ, দলীয় কার্যালয়, এভারকেয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছিলেন।
আজ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঢল রূপ নেয় এক বিশাল জনসমুদ্রে।
Manual5 Ad Code
জানাজায় অংশ নিতে আসা পুরান ঢাকার সত্তরোর্ধ্ব ব্যবসায়ী হাজী আবদুল লতিফ বলেন, ‘১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজা দেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, বাংলাদেশে আর হয়তো এমন দৃশ্য দেখব না। আজ ৪৪ বছর পর তাঁর স্ত্রীর জানাজায় এসে মনে হচ্ছে, ইতিহাস আবার ফিরে এসেছে। এমন ভালোবাসা জোর করে আদায় করা যায় ন।
এটা আল্লাহপ্রদত্ত বিষয়। তিনি যাকে সম্মান দেন, কেউ তাকে অসম্মান করতে পারে না।’
শুধু দলীয় নেতাকর্মী নন, জানাজায় অংশ নিয়েছেন সাধারণ চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, রিকশাচালক থেকে শুরু করে দেশের সর্বস্তরের মানুষ। ভিড়ের চাপে সংসদ ভবনের আশপাশের গাছ, ফুটপাত, এমনকি নিকটস্থ ভবনগুলোর ছাদও ছিল লোকে লোকারণ্য। জানাজার ঠিক আগমুহূর্তে খালেদা জিয়াকে নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের কান্নাবিজড়িত বক্তৃতার পর যখন তারেক রহমান তাঁর মায়ের জন্য দোয়া চাইলেন, পিনপতন নীরবতায় তখন পুরো এলাকা যেন দেশনেত্রীর বিরহ-বেদনায় ভার হয়ে ওঠে।
বেগম জিয়ার এই শেষ বিদায়ে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, পাকিস্তান, জাপান, সৌদি আরবসহ ঢাকাস্থ ৩২টি দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা জানাজায় অংশ নেন। যার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ভূটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্পিকার উপস্থিত ছিলেন। বিদেশি কূটনীতিকদের জন্য নির্ধারিত স্থানে দাঁড়িয়ে তাঁরা এ সময় প্রত্যক্ষ করেন বাংলাদেশের মানুষের এই আবেগঘন বিদায় মুহূর্ত।
বেগম জিয়ার জানাজায় নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। জানাজাস্থলের মূল অংশে নারীদের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকলেও আশপাশের নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে হাজারো নারী অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানিয়েছেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীকে। তাঁদের অনেকের হাতে ছিল কালো ব্যাজ, মুখে ছিল শোকের ছায়া।
বিশ্লেষকদের মতে, বেগম খালেদা জিয়ার এই জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্যতম বড় ঘটনা।
Manual2 Ad Code
দীর্ঘ রোগভোগ, কারাবাস আর নানা চড়াই-উতরাইয়ের পর তাঁর এই বিদায় প্রমাণ করে, ক্ষমতার বাইরে থেকেও একজন নেতা কীভাবে গণমানুষের মনে বেঁচে থাকতে পারেন।