জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে ব্যাপক হত্যাকা-সহ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য পুনর্গঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু ১৬ মাসের মাথায় অনিয়ম, দুর্নীতি, ট্রাইব্যুনাল থেকে তথ্য পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ নিয়ে এখন অস্থিরতা, হতাশা বিরাজ করছে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে। একই সঙ্গে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, বিবৃতি, একে অন্যের প্রতি অবিশ্বাস, সন্দেহ এবং বিভক্তিও বাড়ছে।
রাজনৈতিক মতাদর্শের জায়গা থেকেও কেউ কেউ প্রকাশ্যে, কিংবা অপ্রকাশ্যে একে অন্যের প্রতি বিষোদগার করছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে একাধিক প্রসিকিউটর পদত্যাগ করতে পারেন বলেও গুঞ্জন রয়েছে। প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থা পুনর্গঠন হতে পারে এমন গুঞ্জনও রয়েছে ট্রাইব্যুনাল অঙ্গনে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, দুদিন হলো তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ তার কাছে না গেলেও তিনি সার্বিক বিষয় অবগত আছেন। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রসিকিউশনকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করতে আইনগতভাবে সব সিদ্ধান্তই নেবেন বলে জানান তিনি।
বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামসহ ১৬ জন প্রসিকিউটর কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে প্রসিকিউটর মো. আব্দুস সোবহান তরফদার ও মো. মিজানুল ইসলাম অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদায়, প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম, বিএম সুলতান মাহমুদ, মো. সহিদুল ইসলাম সরদার ও ফারুক আহাম্মদ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন নয়জন প্রসিকিউটর।
গত মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের পদে তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে সরকার। একই দিন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলামকে এ পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। তাজুল ইসলামের বিদায়ের দিনে তিনি এবং প্রসিকিউটর (প্রশাসন) গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ করেন প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদ। ইতিমধ্যে তাজুল ইসলাম ও মোনাওয়ার হুসাইন তামীম আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে বলেছেন, এসব অভিযোগ বিদ্বেষপ্রসূত ও মিথ্যাচার। ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম দেশে ও বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। বিচারকাজ বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হচ্ছে।
অন্যদিকে প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে অন্যপক্ষের করা অভিযোগ সামনে আসে গত মঙ্গলবার। প্রসিকিউশন টিম থেকে সুলতান মাহমুদকে অপসারণ করতে গত ১১ জানুয়ারি আইন ও বিচার উপদেষ্টা বরাবর একটি চিঠি দেন তাজুল ইসলাম। এতে সুলতানের বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে ট্রাইব্যুনালের গোপন তথ্য বাইরে সরবরাহ, বিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি ভঙ্গ করা, সুপ্রিম কোর্টে নিরাপত্তা প্রহরীকে মারধর ও গুলি করে হত্যার হুমকি, গানম্যানকে দিয়ে তুচ্ছ কারণে যত্রতত্র যাকে-তাকে গুলি করার নির্দেশ, স্ত্রীকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করার অভিযোগ আনা হয়। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সুলতান মাহমুদের মন্তব্য জানতে মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করলেও সাড়া মেলেনি।
Manual2 Ad Code
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গতকাল বুধবার ট্রাইব্যুনালের অন্তত পাঁচজন প্রসিকিউটরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছে। তবে পেশাগত নিরাপত্তার স্বার্থে তারা তাদের নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানান। ইতিমধ্যে তাজুল ইসলাম ও গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমকে কয়েকজন প্রসিকিউটর এবং সুলতান মাহমুদের পক্ষে আরও কয়েকজন প্রসিকিউটর অপকাশ্যে সমর্থন দিচ্ছেন।
Manual5 Ad Code
এদিকে প্রসিকিউশনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক মতাদর্শের জেরে বিবাদে জড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে। একজন প্রসিকিউটর বলেন, প্রসিকিউশন পুনর্গঠনের সময় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে বিএনপি ও অন্যান্য দলের কয়েকজন আইনজীবীকে প্রসিকিউটর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এমনকি বিচারে নিরপেক্ষতা আনতে প্রয়োজনে আওয়ামীপন্থি দুয়েকজন আইনজীবীকেও অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তখন আলোচনায় আসে। তবে বিএনপিপন্থি শীর্ষ আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালে কোনো আইনজীবী প্রসিকিউশনে নিয়োগ দিতে অনাগ্রহ দেখান। আরও জানা গেছে, প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ বিএনপিপন্থি আইনজীবী হিসেবে পরিচিত। তিনি এবং জামায়াতপন্থি অন্য কয়েকজন প্রসিকিউটরদের সঙ্গে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব রয়েছে অনেক আগে থেকেই। যার রেশ এখনো চলছে।
প্রসিকিউটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের পর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ও গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন অন্তত পাঁচজন প্রসিকিউটর। অন্যদিকে সুলতান মাহমুদের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন পাঁচ-ছয়জন প্রসিকিউটর। এর মধ্যে পদ, পদবি ও গাড়ি সুবিধা না পাওয়ার মতো অনুযোগও রয়েছে কয়েকজন প্রসিকিউটরের, যারা সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদার আইন কর্মকর্তা।
অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের সমর্থনকারী একজন প্রসিকিউটর বলেন, ট্রাইব্যুনালের শুরু থেকে বিচারের প্রক্রিয়ায় এ দুজনের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিচারকাজে তারা গতি এনেছেন বলেই শেখ হাসিনাসহ তিনটি মামলার রায় হয়েছে। সুলতান মাহমুদ বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে অভিযোগ এনেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রসিকিউশনে আমার প্রভাব কখনোই ছিল না। এখানে বিএনপিপন্থি, বাম, কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রসিকিউটর অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এর মধ্যে যোগ্য লোক যেমন ছিলেন, অযোগ্য লোকও ছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘এখন যারা আমার বিরোধিতা ও সমালোচনা করছেন, তাদের অনেকের আইনি জ্ঞানও সীমিত। কিন্তু বিচারের স্বার্থে তাদেরও মেনে নিতে হয়েছে।’ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদার কেউ গাড়ি সুবিধা পান না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
Manual2 Ad Code
জানতে চাইলে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্নীতি, অনিয়মের বিষয়গুলো আমি এখনো কিছু বুঝতে পারছি না। কারণ, আনুষ্ঠানিকভাবে আমার কাছে কেউ কিছু বলেনি। এক-দুই সপ্তাহ কাজ করলে বুঝতে পারব যে কী ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। যদি তা থাকে অবশ্যই আমার চোখে পড়বে। দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রসিকিউশনকে গতিশীল ও সুশৃঙ্খল করতে আইনগত যা করার সবই করা হবে।’ কোনো কোনো প্রসিকিউটরের মধ্যে হতাশা এবং প্রসিকিউশন পুনর্গঠন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারব না। ১৫ দিনের প্যাকেজ ওয়ার্ক শেষে সবকিছুর বিষয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’