প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

৩রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২০শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

বহুল কাঙ্ক্ষিত সংসদের অধিবেশন বসছে ৫৮৩ দিন পর

editor
প্রকাশিত মার্চ ১০, ২০২৬, ০৯:১৪ পূর্বাহ্ণ
বহুল কাঙ্ক্ষিত সংসদের অধিবেশন বসছে ৫৮৩ দিন পর

Manual2 Ad Code

 

Manual2 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এরপর ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যা প্রায় ১৯ মাস ধরে সংসদবিহীন শাসন চালিয়ে যায়। এ দেশের রাজনীতির দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কাটিয়ে আগামী ১২ মার্চ বসতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন। সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের মূল কক্ষে ওই দিন বেলা ১১টায় অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা।

২০২৪ সালের ৬ আগস্ট দ্বাদশ সংসদ বিলুপ্ত হওয়ার ৫৮৩ দিন পর শুরু হতে যাওয়া এই অধিবেশন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, প্রশাসনসহ সর্বমহলে রয়েছে ব্যাপক আলোচনা। সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনিক ও কারিগরি সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও সংসদকেন্দ্রিক প্রস্তুতি চলছে। তবে অধিবেশনের প্রথম দিনে সভাপতিত্ব করবেন কে, এটি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি।

প্রথম অধিবেশনের আনুষ্ঠানিকতা

সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। প্রথম দিনেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে। পাশাপাশি পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনয়ন, শোক প্রস্তাব উত্থাপন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো সংসদে উপস্থাপন করা হবে। প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণও গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর পরে সংসদে ধন্যবাদ প্রস্তাব আনা হয় এবং তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলে, যেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা অংশ নেন।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই স্পিকার নির্বাচন করা হবে। কোনো সংসদ সদস্য অন্য একজন সদস্যকে স্পিকার হিসেবে প্রস্তাব করতে পারেন এবং আরেকজন সদস্য সেই প্রস্তাব সমর্থন করেন। ভোটের মাধ্যমে স্পিকার নির্বাচিত হন। সাধারণত সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল তাদের প্রার্থীকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করতে সক্ষম হয়। একই পদ্ধতিতে ডেপুটি স্পিকারও নির্বাচিত হন।

কতদিন পর নতুন আইনসভা?

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করা হয় ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট। এরপর প্রায় ১৯ মাস দেশের আইনসভা কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। সময়ের হিসাবে এটি মোট ৫৮৩ দিন, অর্থাৎ প্রায় ১ বছর ৭ মাস ৬ দিন পর আবার সচল হচ্ছে জাতীয় সংসদ সচিবালয়। এই দীর্ঘ বিরতির সময়ে দেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব পালন করে এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি সিদ্ধান্ত নেয়।

Manual2 Ad Code

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ২০৯টি আসনে জয় পেয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকার। এই সংসদে ৬৮টি আসনে জয় পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আর জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৬টি আসন এবং অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পেয়েছেন ১৫টি আসন। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

সভাপতিত্ব করবেন কে?

নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন হলো– অধিবেশনের প্রথম দিন সভাপতিত্ব করবেন কে? সাধারণত বিদায়ী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকায় দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। ফলে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মনোনীত কোনো ব্যক্তি অথবা সংসদের জ্যেষ্ঠ সদস্যকে দিয়ে প্রথম বৈঠক পরিচালনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। অতীতে ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদ অধিবেশনে জ্যেষ্ঠ সদস্যকে দিয়ে বৈঠক পরিচালনার নজির রয়েছে। এবারের সরকার গঠনকারী দল বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি চূড়ান্ত হবে আগামীকাল বুধবার দলটির এক সভায়। ব্যতিক্রম পরিস্থিতিতে নতুন এই সংসদের সভাপতিত্ব করতে পারেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অথবা স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

বিএনপির প্রস্তুতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিএনপি। কারণ এই সংসদে বিএনপির পাওয়া ২০৯ আসনের মধ্যে ১৪৮টি আসনের এমপি প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে যাচ্ছেন। বিএনপির সূত্র জানিয়েছে, নবীন এমপিদের অধিবেশন সম্পর্কে তাদের ধারণা দিতে দুই দিনব্যাপী (গত ৬ ও ৭ মার্চ) প্রশিক্ষণ কর্মশালা করেছে বিএনপি। এতে অভিজ্ঞ এমপিরা নিজেদের অভিজ্ঞতা নতুন এমপিদের সামনে তুলে ধরেন। এই কর্মশালায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ ও এমপিদের সংসদের বিধি-বিধান, কার্যপ্রণালি, আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া, সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ব্যবস্থাসহ সংসদীয় কার্যক্রমের সার্বিক বিভিন্ন দিক সম্পর্কে তাদের ধারণা দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বেলা ১১টায় বৈঠক ডেকেছে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর এটি হবে তার দলের আনুষ্ঠানিক পূর্ণাঙ্গ দলীয় বৈঠক। জানা গেছে, কার সভাপতিত্বে সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হবে সেটি ওই বৈঠকে নির্ধারণ করা হবে। এ ছাড়া বৈঠক থেকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সংসদ সদস্যদের আচরণ ও অধিবেশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে।

Manual4 Ad Code

সংসদ সচিবালয়ের প্রস্তুতি

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে সংসদ সচিবালয় নানা ধরনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ ফাতেমা জানিয়েছেন, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। তিনি বলেছেন, ‘প্রথম অধিবেশন ঘিরে আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে। সংসদ সদস্যদের আসনবিন্যাস, নথিপত্র প্রস্তুত, সংসদ ভবনের কারিগরি ব্যবস্থা–সব বিষয় সমন্বয় করা হয়েছে।’ তিনি জানান, সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি নিবন্ধন, শপথ, বসার ব্যবস্থা এবং অধিবেশনের প্রথম দিনের আনুষ্ঠানিকতা যাতে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয় সে বিষয়েও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

বিতর্কিত অধ্যাদেশ নিয়ে পরিকল্পনা

নতুন সংসদের সামনে সবচেয়ে বড় আইনগত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এসব অধ্যাদেশকে বিল আকারে পাস করে আইনে রূপান্তর করতে হবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, ‘সংসদ বসার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি কোনো অধ্যাদেশ পাস না হয়, তাহলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।’ সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই কমিটি প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ বাছাই করে সংসদে উপস্থাপনের সুপারিশ করবে।

ঝুঁকিতে অধিকাংশ অধ্যাদেশ

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এত কম সময়ে সব অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করা বাস্তবসম্মত নয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জয়নুল আবেদিন বলেন, সংসদে টিকে থাকতে হলে অধ্যাদেশগুলোর রাজনৈতিক ও আইনগত গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। তার মতে, ‘অনেক অধ্যাদেশই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সাময়িকভাবে জারি করা হয়েছিল। সেগুলোর অনেকগুলো হয়তো সংসদে আইনে রূপান্তর হবে না।’

উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে বিতর্ক

Manual4 Ad Code

এদিকে সাম্প্রতিক গণভোট ও সাংবিধানিক সংস্কারের আলোচনার প্রেক্ষাপটে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টিও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় রয়েছে। কিছু রাজনৈতিক দল দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব সমর্থন করলেও অন্যরা মনে করছে–প্রথমে বিদ্যমান সংসদ কাঠামোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

 

নারী আসন কার কতটি?

সংবিধান অনুযায়ী সংসদে সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসন রয়েছে। সাধারণত নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অনুপাতে রাজনৈতিক দলগুলো এই আসন পেয়ে থাকে। নির্বাচনে আসন বণ্টনের ভিত্তিতে সরকার গঠনকারী দল বিএনপি সবচেয়ে বেশি নারী আসন পাবে। বিরোধী দলসহ অন্য দলগুলোরও নির্দিষ্ট অনুপাতে নারী প্রতিনিধিত্ব থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকায় এবারের সংসদ কার্যক্রম তুলনামূলক বেশি প্রাণবন্ত হতে পারে।

 

সংসদ অচল থাকার ইতিবৃত্ত

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন বা শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় অচল বা স্থগিত থেকেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সংসদীয় ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে। পরে ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদীয় কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। ১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ওই সময়ে সামরিক শাসনের অধীনে সংসদের কার্যক্রম কার্যত বন্ধ ছিল। ১৯৮৬ সালে নির্বাচন হলে সংসদ পুনরায় চালু হয়। এরপর ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির সময় প্রায় দুই বছর সংসদ কার্যক্রম বন্ধ ছিল। পরে ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে নবম জাতীয় সংসদ গঠিত হয়।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code