ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে, ওয়াশ সেকশনের (ট্রেন ধোয়া-মোছার অংশ) পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশেষ ট্রেন। সাধারণ যাত্রীদের জন্য নয়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদধারী রাষ্ট্রপতির ভ্রমণের জন্যই এই ট্রেনটি সংরক্ষিত। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই বিশেষ ট্রেনটি ব্যবহার করেছেন মাত্র একজন রাষ্ট্রপতি। তিনি হলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ইতিহাসে রাষ্ট্রপতির জন্য বিশেষভাবে বরাদ্দ এই ট্রেনটি যেন এক নীরব সাক্ষী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু ট্রেনটি এখনও অপেক্ষায় আছে আবার কোনো রাষ্ট্রপতি যদি ট্রেন ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেন, তবে হয়তো আবারও এটি রেললাইনে গড়িয়ে চলবে।
Manual3 Ad Code
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির ভ্রমণের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও আরাম নিশ্চিত করতে এই ট্রেনটি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সাধারণ ট্রেনের তুলনায় এটি অনেক বেশি যত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। নিরাপত্তা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করে এটি প্রস্তুত রাখা হয়।
তবে বাস্তবে এই ট্রেনের ব্যবহার খুবই সীমিত। দীর্ঘ সময় ধরে এটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে, যেন কোনো সময় রাষ্ট্রপতির ভ্রমণের প্রয়োজন হলে দ্রুত প্রস্তুত করা যায়।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মীরা জানান, রাষ্ট্রপতির জন্য বরাদ্দ এই ট্রেনটি সাধারণ ট্রেনের মতো নিয়মিত চলাচল করে না। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী এটি ব্যবহার করা হয়।
রাষ্ট্রপতির জন্য নির্ধারিত এই ট্রেনটি সর্বশেষ ব্যবহার করা হয় ২০১৬ সালে। সে সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন আবদুল হামিদ।
রাষ্ট্রপতির সেই ট্রেন ভ্রমণকে ঘিরে রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিল বিশেষ প্রস্তুতি। ট্রেনের প্রতিটি বগি, প্রতিটি যন্ত্রাংশ ভালোভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছিল বাড়তি সতর্কতা।
Manual8 Ad Code
রেলওয়ে কর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির ভ্রমণের আগে ট্রেনটি খুব যত্নসহকারে ধোয়া ও পরিষ্কার করা হয়েছিল। যেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির ভ্রমণের জন্য সবকিছু থাকে নিখুঁত।
Manual6 Ad Code
এই বিশেষ প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন রেলকর্মীর স্মৃতিও। তার নাম নূরুল আমিন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ রেলওয়েতে ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কর্মরত।
রোববার (৮ মার্চ) ট্রেনটির পাশে দাঁড়িয়ে নূরুল আমিন জানান, ২০১৬ সালেই তার চাকরি স্থায়ী হয়। এর কিছুদিন পরই রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ট্রেন ভ্রমণের প্রস্তুতি শুরু হয়।
Manual5 Ad Code
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির ভ্রমণ উপলক্ষে ট্রেনটি খুব যত্ন সহকারে ধোয়া হয়েছিল। আমি নিজ হাতে ট্রেনটি ধুয়েছিলাম।
তার ভাষায়, সেই সময়ের প্রস্তুতি ছিল অন্যরকম। সাধারণ ট্রেন পরিষ্কার করার চেয়ে অনেক বেশি যত্ন নেওয়া হয়েছিল। কারণ, এটি ছিল রাষ্ট্রপতির ভ্রমণের ট্রেন।
নূরুল আমিন আরও জানান, তার জানা মতে আবদুল হামিদ ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো রাষ্ট্রপতি এই ট্রেনে ভ্রমণ করেননি।
রাষ্ট্রপতির সেই ভ্রমণের পর ট্রেনটি আবার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ওয়াশ সেকশনের পাশে এনে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। ট্রেনটি নিয়মিত চলাচল না করলেও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এটি যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছে। যেন প্রয়োজন হলে দ্রুত আবার ব্যবহারের উপযোগী করা যায়।
নূরুল আমিন বলেন, রাষ্ট্রপতির ভ্রমণ শেষ হওয়ার পর ট্রেনটি এখানে নিয়ে রাখা হয়েছে। আবার যদি কোনো রাষ্ট্রপতি ট্রেনে ভ্রমণ করেন, তখন এই ট্রেনটি বের করা হবে।
বাংলাদেশের রেলপথে প্রতিদিন হাজারো ট্রেন চলাচল করে, লক্ষ লক্ষ মানুষ যাতায়াত করেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির জন্য নির্ধারিত এই ট্রেনটির গল্প আলাদা।
এটি শুধু একটি যানবাহন নয়, বরং বাংলাদেশের রেলওয়ে ইতিহাসের একটি ছোট কিন্তু বিশেষ অধ্যায়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদধারীর ভ্রমণের স্মৃতি বহন করে এটি আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো নতুন ট্রেন আসবে, প্রযুক্তি বদলাবে, ভ্রমণের ধরনও পাল্টাবে। কিন্তু ২০১৬ সালের সেই বিশেষ ভ্রমণ এবং তার প্রস্তুতির স্মৃতি রয়ে গেছে রেলওয়ে কর্মীদের মনে।
কমলাপুরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটি যেন সেই স্মৃতিরই প্রতীক, অপেক্ষায় আছে আবার কোনো রাষ্ট্রপতির সফরের।
ট্রেনটির পাশে বসে থাকা এক নিরাপত্তা কর্মী বলেন, এটি রাষ্ট্রপতির ট্রেন। এ জন্য এটা এভাবে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি যদি কোনোদিন ট্রেন ভ্রমণ করেন, তখন এটি আবার বাহির করা হবে।
তিনি বলেন, আমার জানা মতে আর কোনো ট্রেন এভাবে সংরক্ষণ করে রাখা হয়নি। এই ট্রেন সবার জন্য না। তাই নিয়মিত চলাচল করে না। এটা শুধু রাষ্ট্রপতির ভ্রমণের জন্য নির্ধারিত। রাষ্ট্রপতি যতদিন ভ্রমণ না করবেন, ততোদিন এটা এভাবেই থাকবে। রাষ্ট্রপতি কোনো দিন ভ্রমণ করলে তখন, ট্রেনটি ধুয়ে মুছে সুন্দর করা হবে।