দেশের জনস্বাস্থ্য বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব এবং টিকাসংকট বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে সারা দেশে হাম ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত হচ্ছে শত শত শিশু, বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি শুধু একটি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নয়, বরং দেশের দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতার প্রকাশ। টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, ইমিউনিটি গ্যাপ এবং অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) কাঠামোর ভাঙন–সব মিলিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন এক অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৬১০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ৯৭৬ জনের শরীরে সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। আইসিইউ সুবিধার অভাবে শিশুদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে। মাঠপর্যায়ের তথ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ১১৩-এর বেশি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
চলতি এপ্রিল মাসের শুরুতেই দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ফলে ডেঙ্গু এবং অন্যান্য ‘ভেক্টর-বর্ন’ রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।
এদিকে সারা দেশে সরকারি হাসপাতাল ও মাঠপর্যায়ে সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন (এআরভি) ও র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন (আরআইজি) সরবরাহ বন্ধ আছে। কুকুর, বিড়ালসহ বেশ কিছু হিংস্র প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে যে প্রাণঘাতী রোগ হয়, তা প্রতিরোধে এআরভি কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত।
ঝুঁকিপূর্ণ এ পরিস্থিতির জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়ী করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। গতকাল রবিবার ঢাকার কেরানীগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় টিকাদান কার্যক্রম ‘কন্টিনিউ’ করা হয়নি। যার কারণে এবার হাম ‘বজ্রপাতের মতো’ হানা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি স্বাভাবিক মৌসুমি সংক্রমণ নয়, বরং ‘কাভারেজ ব্রেকডাউন’-এর ফলাফল। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা। আক্রান্তদের ৬৯ শতাংশই এই বয়সসীমার মধ্যে, যার মধ্যে ৩৪ শতাংশ মাত্র ৯ মাসের কম বয়সী।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণ বলছে, গত দুই বছরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ২০১৯ সালে পূর্ণ টিকাদান হার ছিল ৮৩ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে নেমে আসে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশে। সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য হলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ‘ক্রিটিক্যাল থ্রেশহোল্ড’-এর নিচে নেমে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ পরিবর্তন। এই ঘাটতির ফলে তৈরি হয়েছে একটি বড় ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’, যা এখন হামের বিস্ফোরণে রূপ নিয়েছে।
Manual1 Ad Code
দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটেছে। বিশেষ করে ইপিআই কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী–টিকা সরবরাহে ঘাটতি, অনিয়মিত ক্যাম্পেইন, মাঠপর্যায়ে জনবলসংকট, নজরদারিতে দুর্বলতা; ফলে অনেক শিশু সময়মতো টিকার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ একাধিক হাসপাতালে শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে। রাজশাহীতে এই অবস্থা শোচনীয়। রোগীদের করিডর ও বারান্দায় চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ঢাকাসহ সারা দেশের চিকিৎসকরা অভিযোগ করে বলছেন, রোগীর চাপ বাড়লেও অবকাঠামো ও জনবল একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে। ভেন্টিলেটর, ওষুধ এবং জরুরি সরঞ্জামের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও সংকটাপন্ন করেছে।
Manual1 Ad Code
১৯৯৮ সাল থেকে চালু থাকা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) কাঠামোর মাধ্যমে দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টি কর্মসূচি পরিচালিত হতো। কিন্তু বিকল্প কাঠামো ছাড়া এই পরিকল্পনা বাতিল হওয়ায় কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যন্ত সমন্বয় ভেঙে গেছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার ‘সিস্টেমিক ব্রেকডাউন’-এর একটি অংশ।
Manual7 Ad Code
স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের জনবল ঘাটতি এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অভিজ্ঞ জনবলের অভাব দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে নীতিগত সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘সঠিক মানুষ সঠিক জায়গায় না থাকলে পুরো স্বাস্থ্যকাঠামো অকার্যকর হয়ে পড়ে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে–টিকাদানে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতার অভাব ইত্যাদি কারণে হামের বর্তমান বিস্তার ভবিষ্যতে অন্য প্রতিরোধযোগ্য রোগের পুনরাবির্ভাবের ইঙ্গিত দিতে পারে।
Manual7 Ad Code
সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিল করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি চিকিৎসাসেবা চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবতা ভিন্ন–জনবলসংকট ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে এই উদ্যোগ পুরোপুরি কার্যকর হচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, দ্রুত কার্যকর টিকাদান কর্মসূচি না বাড়ালে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। নতুন এলাকাও ঝুঁকির মধ্যে আসতে পারে। অবশ্য গতকাল থেকে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। এটি চলমান থাকবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হামের এই বিস্ফোরণ শুধু একটি রোগের গল্প নয়; এটি একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। টিকাদান ঘাটতি থেকে শুরু করে নীতিগত শূন্যতা–সব মিলিয়ে এটি এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে দেরি মানেই আরও বড় মানবিক বিপর্যয়।
একজন সাবেক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। ঠিক জায়গায় ঠিক মানুষ না থাকলে এই ধরনের সংকট বারবার দেখা দেবে।’ তার মতে, কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ধারাবাহিক টিকাদান কার্যক্রম ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, পাঁচ বছর মেয়াদি ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণেই সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে সাফল্য এসেছে। দুই বছরের প্রকল্প দিয়ে এই অর্জন ধরে রাখা সম্ভব নয়। এতে রোগ বাড়বে, সেবা কমবে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
সব মিলিয়ে হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল চিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে। টিকাদানব্যবস্থার ফাঁক, হাসপাতালের চাপ এবং জনবলসংকট–সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ এর সদস্যসচিব ডা. শামীম তালুকদার বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বাতিল করেছে। গত দুই বছরে যারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চালিয়েছেন তারা স্বাস্থ্য বোঝেন না। যার ফলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।