প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২৫শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১১ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১০ই মহর্‌রম, ১৪৪৮ হিজরি

উপজেলা পরিষদ থাকছে না!

editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২৬, ২০২৬, ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ
উপজেলা পরিষদ থাকছে না!

Manual7 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

স্থানীয় সরকার কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তর উপজেলা পরিষদের বিদ্যমান কাঠামোকে ঘিরে দ্বিধায় রয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বর্তমান কাঠামোর আওতায় উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার বিষয়ে তেমন আগ্রহ নেই। বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা ও মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে এই অবস্থানের ইঙ্গিত মিলেছে।

বিএনপির এমন অবস্থান নতুন নয়; ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার সরকার এরশাদ আমলে চালু হওয়া উপজেলা পরিষদ বাতিল করেছিল। একই বছরের নভেম্বরে অধ্যাদেশ জারি করে তা বিলুপ্ত করা হয়েছিল। এবার প্রতিটি উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে সংসদ সদস্যদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ তৈরির সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সরকার এটিকে প্রশাসনিক সমন্বয় ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরলেও, স্থানীয় সরকার বিশ্লেষকরা এটিকে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় প্রভাব বৃদ্ধির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।

১৯৯১ সালের মার্চে ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার সরকার উপজেলা পরিষদ বাতিল করে। ওই বছরের নভেম্বরে ‘স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন পুনর্গঠন) (রদ) অধ্যাদেশ ১৯৯১’ পাস করে উপজেলা পরিষদ বিলোপ করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৮ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করলেও নির্বাচনের ব্যবস্থা করেনি। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধ্যাদেশ জারি করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আয়োজন করে। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে এই অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করেনি।

Manual1 Ad Code

এতে করে যে অধ্যাদেশবলে উপজেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়েছিলেন, তারা আর সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে উপজেলা পরিষদ আইন করে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের উপদেষ্টা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের উপজেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর ফলে উপজেলা পরিষদ কার্যত সংসদ সদস্যদের দয়া ও সরকারি কর্মকর্তাদের কর্তৃত্বে চলে যায়। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন করে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে কার্যত স্থানীয় সরকারের সর্বজনীন চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অধিকাংশই আত্মগোপনে চলে যান। জেলা ও উপজেলা পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার প্রায় সব শীর্ষ পদই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দখলে ছিল। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল। পরে দেশের সব (৪৯৩টি) উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হয়। তাদের জায়গায় সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

উপজেলা পরিষদগুলো খালি থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন শুরুতে করতে চাচ্ছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বলা হলেও, সংশ্লিষ্ট মহলগুলো মনে করছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে সরকার তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করতে চায়।

Manual6 Ad Code

দলটির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, আমরা স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে চাই, কিন্তু সেটা হতে হবে নিরপেক্ষ ও কার্যকর কাঠামোর মাধ্যমে। উপজেলা পরিষদ প্রশ্নে তিনি বলেন, ৯০-এর দশকে যে মডেল ছিল, সেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কম ছিল এবং জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা বেশি ছিল। এখন সেই ভারসাম্য নেই।

উপজেলা পরিষদ আদতে শক্তিশালী ভিত্তি পায়নি। পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এলাকায় ‘কাঠের পুতুল’! জনগণের ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে প্রত্যক্ষভাবে জনগণেরই কল্যাণ করতে পারছেন না তারা। এলাকার উন্নয়নে তারা পান না সরকারি কোনো বরাদ্দ। স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারাই (ইউএনও) এলাকার সর্বেসর্বা। উপজেলার প্রতিটি উন্নয়নকাজ হয় কমিটির মাধ্যমে। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা কমিটির সভাপতি থাকলেও উপদেষ্টা করা হয় স্থানীয় এমপি আর ইউএনওকে। এখন উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে সংসদ সদস্যদের জন্য ‘পরিদর্শন কক্ষ’ তৈরির সিদ্ধান্ত এটিকে আরও দুর্বল করবে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদ ভবনে ‘বসার জায়গা’ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা– যা কেন্দ্রীয় সরকারের সমান্তরাল সংবিধান স্ব‍‍ীকৃত আরেকটি সরকার, তা ধ্বংস হয়ে যাবে। ‘এমপি রাজ’ সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ ছাড়া এটি সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন, যে অনুচ্ছেদে জাতীয় সংসদ সদস্যদের সুস্পষ্টভাবে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

Manual1 Ad Code

উপজেলা পরিষদ আইন ঘেঁটে দেখা গেছে, তাদের মূল কাজ ১৭টি, সঙ্গে রয়েছে ৩৮ রকমের দায়িত্ব। এতে চেয়ারম্যানের ১৩টি, ভাইস চেয়ারম্যানের ১২টি আর মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের ১৩টি দায়িত্ব বণ্টন করা আছে। এর মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভূমিকা রাখা, যোগাযোগ ও ভৌত অবকাঠামো, কৃষি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ, যুব ও ক্রীড়া, সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং সংস্কৃতির উন্নয়ন। এসব কাজে প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থানের ক্ষমতা উপজেলা পরিষদের হাতে না থাকায় তারা কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেন না।

Manual2 Ad Code

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয় তথ্যমন্ত্রী জানাবেন। আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার দ্রুতই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আয়োজন করবে। উপজেলা পরিষদ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মেজবাহ-উল- আজম সওদাগর মনে করছেন, উপজেলা পরিষদ হলো জেলা ও ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্তর। এখানে কার্যকর জনপ্রতিনিধি না থাকলে উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দেয়। বিএনপি যদি এই স্তরে অনুপস্থিত থাকে, তা হলে তাদের তৃণমূল রাজনৈতিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code