চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের দেয়ালের গ্রাফিতিতে ছাত্র মুছে ‘গুপ্ত’ লেখা নিয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘাতের পর সেই উত্তেজনা ছড়িয়েছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও। এমনকি বিষয়টি নিয়ে হইচই হয় জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও।
Manual6 Ad Code
বুধবার (২২ এপ্রিল) সংসদের অধিবেশন চলার সময় ‘গুপ্ত’ শব্দটি নিয়ে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। উত্তেজনার সৃষ্টি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও।
চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের পর পুরো শিক্ষাঙ্গনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এ ঘটনার জেরে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ আজ বৃহস্পতিবার বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২০২৪ সালের ডিগ্রি (পাস) দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা পূর্বঘোষিত সূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। ওই সহিংস ঘটনার জেরে গতকাল চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাল্টাপাল্টি মিছিল ও শোডাউন হয়েছে বলে খবর পাওয়া যায়। এর মাঝে গতকাল চট্টগ্রামে গিয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কথা বলেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।
অন্যদিকে ওই ঘটনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চট্টগ্রাম মহানগর শাখা চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। গত মঙ্গলবারের ওই ঘটনাকে তারা পরিকল্পিত ও ন্যক্কারজনক বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া ওই ঘটনার জেরে গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ করে ছাত্রদল। ওই সময়ে ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির বলেন, ‘একবার গুপ্ত বলায় যদি এত জ্বালা হয়, তাহলে প্রতিটি ক্যাম্পাসে হাজারবার গুপ্ত বলব।’
Manual7 Ad Code
সংসদে গুপ্ত নিয়ে উত্তেজনা
Manual6 Ad Code
চট্টগ্রামে ‘গুপ্ত’ শব্দকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ক্যাম্পাসে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে গতকাল বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৯তম দিনে বিষয়টি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। হয় ব্যাপক হইচই।
Manual5 Ad Code
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বিরোধীদলকে উদ্দেশ করে বলেন, তারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত করছে। তিনি চট্টগ্রামের ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, চট্টগ্রামের ছাত্রদল কী কথা বলেছে, গুপ্ত বলেছে। এই সংসদে আমরা নির্বাচিত হয়ে আসছি কথা বলার জন্য। বিরোধীদলের ভাইয়েরা আজকে কণ্ঠ চিপে ধরতে চায় ফ্যাসিস্টের মতো। ‘গুপ্ত’ শব্দকে কেন্দ্র করেই সেখানে ছাত্রদলের ওপর হামলা হয়েছে এবং বিরোধীরা গণতান্ত্রিক পরিবেশ নষ্ট করছে। তিনি আরও বলেন, সরকারকে নাজেহাল করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং জনগণ তা প্রতিরোধ করবে। অতএব, আমি তাদের সবিনয়ে অনুরোধ করব, সরকারকে সাহায্য করুন।
তার বক্তব্য ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে স্পিকার বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন দলের বিভিন্ন মতাদর্শ থাকতে পারে, তাদের কথাবার্তার সবাই সবটাই পছন্দ হবে এমন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু, অনুগ্রহ করে শুনুন, আমার কথাটি শুনুন। এখন আপনাদের একজন বক্তাকে আমি দিচ্ছি। উনি (বিরোধীদলীয় নেতা) যা যা বলেছেন প্রয়োজন হলে আপনারা তার জবাব দিতে পারবেন। বক্তব্যের মাধ্যমে জবাব দেন। একজন বক্তাকে বক্তব্যের সময় অনুগ্রহ করে ডিস্টার্ব করবেন না।’
আবদুল ওয়াদুদের বক্তব্যের সময় বিরোধীদলের এমপিরা তীব্র আপত্তি জানান। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে তা এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান। তিনি বলেন, জনগণ বসে থাকবে না মানে কী? তিনি কি উসকিয়ে দিচ্ছেন জনগণকে বিশৃঙ্খলার দিকে? এগুলো সংসদীয় আচরণ না। জনগণকে উসকানি দেওয়ার ভাষা গ্রহণযোগ্য নয় এবং সংসদীয় শিষ্টাচার লঙ্ঘন করা হয়েছে।’
এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে স্পিকার বলেন, ‘আমরা পরীক্ষা করে দেখব, যদি কোনো অসংসদীয় ভাষা থাকে সেটা আমরা এক্সপাঞ্জ করব। আর দ্বিতীয়ত, এটা তো বাংলাদেশের রাজনীতির ভাষা। আমরা চুপ করে থাকব না, এগুলো তো শত শত বছর ধরে রাজনীতিবিদরা বলে এসেছেন। আপনারা যখন বক্তব্য দেবেন তখন এর জবাব দেবেন।’
প্রসঙ্গত, ‘গুপ্ত’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ–লুকানো, গোপন, আড়ালে রাখা বা প্রকাশ না করা। কোনো বিষয়, তথ্য বা বস্তু, যা সবার অগোচরে রাখা হয়। বর্তমানে দেশে নির্বাচনি প্রচারে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দলকে উদ্দেশ করে শব্দটি এখন বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের পরের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ শব্দটি একটি বিশেষ অর্থে বহুল আলোচিত। বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলো এটি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষ বা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীদের ইঙ্গিত করছে, যারা পরিচয় গোপন রেখে রাজনীতি বা কার্যক্রম পরিচালনা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, যারা গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে বা ছদ্মবেশে থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এই শব্দটি এখন রাজনৈতিক বিদ্রূপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।