সেই দিন শুধু একটি ভবন ধসে পড়েনি- ধসে পড়েছিল হাজারো শ্রমিকের স্বপ্ন, ভেঙে গিয়েছিল অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ। আর এই ঘটনার ১৩ বছর পরও রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি যেন চাপা পড়ে আছে সেই ধ্বংসস্তূপেরই নিচে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির বিচার আজও শেষ হয়নি- সাক্ষী না আসা, আইনি জটিলতা আর দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে বিচারিক নথি। ভুক্তভোগীরা আজও বিচার পাওয়ার ন্যায্যতা বঞ্চিত।
ভয়ানক নির্মমতা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর ২৪ এপ্রিল। ২০১৩ সালের এই দিনেই ঘটেছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল দুর্ঘটনা। ধসে পড়েছিল সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত রানা প্লাজা। আর প্রাণ হারিয়েছিলেন ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমজীবী। সেই সঙ্গে আহত হয়েছিলেন আরও প্রায় দুই হাজার মানুষ। তাদের মধ্যে পঙ্গু হয়েছেন ৭৮ জন।
ভয়াবহ এই ঘটনায় হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনের পৃথক দুটি মামলা করা হয়। মামলা দুটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করার পর ইতিমধ্যে হত্যা মামলায় বাদী ও অন্যান্য সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে বিচারকাজ শুরু হলেও ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় দীর্ঘদিন উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে থাকায় আটকে ছিল বিচারকাজ।
Manual4 Ad Code
আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই হত্যা মামলায় ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত। ওই আদেশের বিরুদ্ধে বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সাত আসামি হাইকোর্ট বিভাগে আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার কার্যক্রম কয়েক বছর স্থগিত ছিল। বর্তমানে কোনো স্থগিতাদেশ না থাকায় বাদীসহ ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী ৩০ এপ্রিল এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য দিন ধার্য করেছেন ঢাকার ৮ম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ মুনির হোসাঈন।
Manual1 Ad Code
সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পিপি ফয়সাল মাহমুদ বলেন, হত্যা মামলায় অভিযোগ গঠনের পর কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালতে গিয়ে মামলাটি স্থগিত করেন। এ কারণে বিচার প্রক্রিয়া অনেক বছর স্থগিত ছিল। বর্তমানে কোনো স্থগিতাদেশ না থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলমান আছে। তা ছাড়া মামলাটি আমাদের আদালতে বদলি হয়ে আসার পর এ পর্যন্ত ৫৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আশা করছি নিয়মিত ধার্য তারিখে সাক্ষীরা যদি আদালতে সাক্ষী দিতে আসেন, তা হলে দ্রুত এ বিচার সম্ভব হবে।
অপরদিকে ২০১৬ সালের ১৬ জুন ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। ওই আদেশের বিরুদ্ধে বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বজলুস সামাদ আদনানসহ চার আসামি রিভিশন মামলা করেন। আবেদনকারীদের মধ্যে নিউ ওয়েব বটমস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বজলুস সামাদ ও সাভার পৌরসভার সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমানের রিভিশন আবেদন নামঞ্জুর করেন আদালত। অপরদিকে ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আমিনুল ইসলামসহ অপর একজনের রিভিশন মঞ্জুর করে তাদের এ মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া এ মামলার অপর আসামি সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ হাইকোর্ট বিভাগে মামলা বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। শুনানি শেষে হাইকোর্ট এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম তার পক্ষে স্থগিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পিপি ইশতিয়াক হোসেন জিকু বলেন, ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটি ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া স্বীয় ক্ষমতাবলে তার আদালতে বিচারের জন্য নিয়ে যান। তবে অনেক দিন উচ্চ আদালত থেকে এ মামলার ওপর স্থগিতাদেশ ছিল। বর্তমানে মামলাটি পুনরায় অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারের জন্য এসেছে। এই মামলায় একজন আসামির পক্ষে স্থগিতাদেশ থাকায় অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গত ২০ এপ্রিল ১-৩ নম্বর সাক্ষীকে হাজিরের জন্য প্রসেস ইস্যু করা হয়েছে। আশা করছি আগামী ২০ সেপ্টেম্বর সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হবেন।
আসামি সোহেল রানার আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনের দুই মামলায় প্রায় ১০ বছর আগে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এই আদেশের বিরুদ্ধে কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালতে যান। তাদের মধ্যে সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহর পক্ষে মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ থাকায় ইমারত নির্মাণ আইনের মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হচ্ছে না। তবে ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় রানা হাইকোর্ট থেকে জামিনে রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, হত্যা মামলায় রানা ছাড়া সবাই জামিনে আছেন। তবে হাইকোর্ট সোহেল রানাকে জামিন দেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সেই জামিন স্থগিত করেন। আর এতে করে মামলার বিচারপ্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায়বিচার থেকে।
২০১৫ সালের ১ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনের পৃথক দুই মামলায় ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রাথমিক তদন্তে বাদীর দায়ের করা অভিযোগের আলোকে প্রাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হওয়ায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হলো।
দুই মামলায় রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা, তার বাবা আব্দুল খালেক ওরফে খালেক কুলুসহ ৫৯ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে আসামিদের মধ্যে ১৭ জনের নাম উভয় মামলার অভিযোগপত্রে থাকায় ব্যক্তি হিসেবে আসামি ৪২ জন। এর মধ্যে হত্যা মামলায় ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং সাক্ষী করা হয়েছে ৫৯৪ জনকে। এ ছাড়া ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় ১৮ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং সাক্ষী করা হয়েছে ১৩৫ জনকে। এই দুটি মামলার মধ্যে হত্যা মামলায় ৪১ জন আসামির মধ্যে চারজন মারা যাওয়ায় বর্তমানে আসামির সংখ্যা ৩৭ জন। অপরদিকে ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় ১৮ জনই রয়েছেন।
Manual7 Ad Code
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভার বাসস্ট্যান্ডের পাশে নয় তলা বিশিষ্ট রানা প্লাজাটি ধসে পড়লে ১ হাজার ১৩৬ জন পোশাকশ্রমিক মারা যান। জীবিত উদ্ধার করা হয় প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিককে। ঘটনার পরদিন সাভার থানা পুলিশের এসআই ওয়ালী আশরাফ খান অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ এনে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাসহ ২১ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। এ ছাড়াও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অথরাইজড অফিসার হেলাল উদ্দিন ইমারত নির্মাণ আইনে ১৩ জনকে আসামি করে আরও একটি মামলা করেন।