দেশে সারের মজুত নিরাপদ সীমার নিচে নেমে এসেছে। গ্যাসসংকটে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সারের উৎপাদন ব্যবস্থায় ছেদ পড়েছে। বিশেষ করে আগামী বোরো মৌসুম শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় সার আমদানি ও উৎপাদন নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের কৃষি খাত এখন এক ধরনের ‘অদৃশ্য’ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। কাগজে-কলমে সারের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন বন্ধ, মজুত কমে আসা এবং গ্যাসসংকটের কারণে সামনের বোরো মৌসুম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা দেশের জন্য ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট চাহিদা ধরা হয়েছে ৫৭ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে জুলাই থেকে এপ্রিল সময়ে ইতোমধ্যে ৫৪ লাখ ৭৯ হাজার মেট্রিক টন সার বিতরণ হয়ে গেছে।
তবে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, বর্তমান মজুত নিরাপদ পর্যায়ে নেই। কৃষি খাতকে স্থিতিশীল রাখতে বছরে কমপক্ষে ৪ লাখ মেট্রিক টন অতিরিক্ত সার মজুত থাকা প্রয়োজন। তবে বর্তমানে সরকারের হাতে রয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ নিরাপদ সীমার অনেক নিচে নেমে এসেছে মজুত।
এরই মধ্যে মে মাসের জন্য আগাম ৬৩ হাজার টন সার বিতরণ করা হয়েছে এবং জুন মাসের জন্য চাহিদা এসেছে ৭১ হাজার টন। এই পরিস্থিতিতে চলতি অর্থবছরে বড় সংকট না হলেও আগামী বোরো মৌসুমের আগেই পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে।
মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, দেশের সব কটি সার উৎপাদনকারী কারখানা গ্যাসসংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় সর্বশেষ গতকাল চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত ডিএপি সার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দেশীয় উৎপাদন এখন প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।
চট্টগ্রামের চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) ৪ এপ্রিল গ্যাসসংকটে বন্ধ হয়ে যায়। চলতি অর্থবছরে এ কারখানায় মাত্র ৬৫ হাজার টন সার উৎপাদন হয়েছে, যেখানে অতীতে উৎপাদন ছিল অনেক বেশি। কারখানার মহাব্যবস্থাপক (উৎপাদন) উত্তম চৌধুরী বলেন, উৎপাদন বন্ধ থাকায় শুধু কৃষি খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং কারখানার যন্ত্রপাতিও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
একই অবস্থা কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো)। প্রতিদিন ২ হাজার টন ইউরিয়া সার উৎপাদনে সক্ষম এই কারখানাটিও গ্যাসসংকটে বন্ধ রয়েছে। ইউরিয়া সার কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়েছে ডিএপি উৎপাদনে।
Manual1 Ad Code
বন্ধ হয়ে যাওয়া ডিএপি কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, ৪ মার্চ থেকে অ্যামোনিয়া সরবরাহ বন্ধ থাকায় মজুত দিয়ে কিছুদিন উৎপাদন চালানো হলেও শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে হলো।
Manual4 Ad Code
এই কারখানাটি দেশের সুষম সার ব্যবহারে অতীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টন ডিএপি উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই কারখানাটি এখন পুরোপুরি বন্ধ। এতে দেশের সার সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ সার কারখানা ২০২৫ সালের ১ মার্চ থেকে বন্ধ। এতে প্রতিদিন সাড়ে ১১০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কারখানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে।
জামালপুরের যমুনা সার কারখানার অবস্থাও ভালো নয়। লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও গ্যাসসংকট ও কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন বারবার বন্ধ হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন, গ্যাস বণ্টনে বৈষম্যের কারণে আধুনিক এই কারখানাটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।
Manual8 Ad Code
অন্যদিকে নরসিংদীর ঘোড়াশাল-পলাশ কারখানা দীর্ঘ ৩৩ দিন বন্ধ থাকার পর ৬ এপ্রিল থেকে চালু হয়েছে। বন্ধ থাকার কারণে প্রায় ৯২ হাজার টন উৎপাদন হারিয়েছে কারখানাটি।
সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার কারখানাও ৩ এপ্রিল থেকে বন্ধ রয়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বলছে, আঞ্চলিক চাহিদা মজুত থেকেই মেটানো সম্ভব।
দেশে খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সার আমদানি করতে হয়। চলমান সংকটের কারণে এই নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে সরকার আগামী বোরো মৌসুমের জন্য সার আমদানির লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি থেকেই যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা ও সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশীয় কৃষি মারাত্মক চাপে পড়তে পারে। তবে বর্তমানে আগামী বোরো মৌসুম নিয়ে চাপা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে বন্ধ কারখানাগুলো চালু করা এবং দ্রুত আমদানির উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
Manual8 Ad Code
কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, সমুদ্রপথে সরবরাহ লাইনে সৃষ্ট ঝুঁকি, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় মূল্যের চাপের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে সারের নিরাপদ মজুত কমে যাওয়া, উৎপাদন বন্ধ হওয়া এবং কাঁচামালসংকট। এই সংকট তৈরি করছে এক জটিল পরিস্থিতির, যার প্রভাব পড়তে পারে সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর।