জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে ইসির ব্যয় আড়াই হাজার কোটি টাকা
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে ইসির ব্যয় আড়াই হাজার কোটি টাকা
editor
প্রকাশিত এপ্রিল ২৫, ২০২৬, ১২:২৩ অপরাহ্ণ
Manual4 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
একদিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট- এই দুই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন শেষ করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ইসির মোট বাজেট ছিল ৩১০০ কোটি টাকা। নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, গণভোট আয়োজন, পোস্টাল ব্যালট এবং প্রচার কার্যক্রম- সব মিলিয়েই এ ব্যয়ের পরিমাণ অতীতের বেশির ভাগ নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি। জাতীয় নির্বাচন সঙ্গে গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভোট আয়োজন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবার নির্বাচনি ব্যয় বাড়াতে হয়েছে। দুটি নির্বাচনে ব্যয় বাড়াকে অস্বাভাবিক মনে করছেন না নির্বাচন বিশ্লেষকরা, তবে ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই বড় বিষয়।
নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট পরিচালনায় সবচেয়ে বড় ব্যয় হয়েছে আইনশৃঙ্খলা খাতে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রশাসনিক ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা এবং গণভোট আয়োজনের জন্য ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়েছে আরও প্রায় ১১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন প্রথমবারের মতো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে নির্বাচনি প্রচার ও জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে; যা দেশের নির্বাচনি ইতিহাসে নতুন একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই নির্বাচনে ব্যয়ের খাত
Manual2 Ad Code
ইসি সূত্রে জানা গেছে, সংসদ নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয়ের প্রধান অংশ গেছে নির্বাচন পরিচালনা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায়। এতে রয়েছে ভোটকেন্দ্র পরিচালনা, ব্যালট পেপার ছাপানো, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের সম্মানি, প্রশিক্ষণ, পরিবহন, লজিস্টিক সরঞ্জাম এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার খরচ। অন্যদিকে গণভোট আয়োজনেও আলাদা ব্যয় যুক্ত হয়েছে। গণভোটে আলাদা ব্যালট পেপার, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা, ভোটার সচেতনতা কার্যক্রম এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনার কারণে এ খাতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোট গ্রহণের জন্য এবার প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা চালু করা হয়। এই ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১০ কোটি টাকা।
Manual8 Ad Code
নির্বাচনি প্রচার খাতে এবার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। ৩০০ সংসদীয় আসনে ৬৯ জন রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের মাধ্যমে ভোটার সচেতনতা প্রচারের জন্য ব্যয় হয়েছে মাত্র দেড় কোটি টাকা। এতে আসনপ্রতি গড় ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। এর তুলনায় আগের সংসদ নির্বাচনে আসনপ্রতি প্রচার ব্যয় ছিল প্রায় ৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এবারের নির্বাচনে এ খাতে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয়ের জন্য প্রথমে ইসির বাজেট ছিল ২ হাজার ৮০ কোটি টাকা। পরে দুটি নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজনের সিদ্ধান্ত হওয়ায় ভোটে ব্যয় ৩ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করে সংস্থাটি। ফলে ইসির নির্বাচনি বাজেটে আরও ১,০৭০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে নির্বাচনি খরচ প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শেষ করতে পারায় বাজেটের ৯৫০ কোটি টাকা অবশিষ্ট রয়েছে।
নির্বাচনি ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র
Manual5 Ad Code
বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচনের ব্যয় সময়ের সঙ্গে দ্রুত বেড়েছে। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে মোট ব্যয় হয়েছিল মাত্র ৮১ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। এরপর ধীরে ধীরে ব্যয় বাড়তে থাকে। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনে ব্যয় ছিল প্রায় ২৬৪ কোটি টাকা। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। দেশের নির্বাচনি ব্যয়ে সবচেয়ে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে, যেখানে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। সেই ধারাবাহিকতায় এবার সংসদ নির্বাচন ও গণভোট মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘একসঙ্গে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কারণে এবারের নির্বাচনে ব্যয় কিছুটা বেশি হয়েছে।’ তিনি জানান, নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিপুলসংখ্যক বাহিনী মোতায়েন করতে হয়েছে। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা, ভোটার সংখ্যা এবং ব্যবস্থাপনার পরিধি বাড়ার কারণে ব্যয়ও বেড়েছে।
Manual6 Ad Code
ব্যয় প্রসঙ্গে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচনের বাজেট একটি প্রাক্কলন মাত্র। প্রকৃত কাজের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন খাতে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। চলতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের জন্য মোট প্রায় ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এর মধ্য থেকেই সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ব্যয় মেটানো হয়েছে।
নির্বাচন বিশ্লেষক ও ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলীর মতে, নির্বাচন পরিচালনার ব্যয় বাড়লেও এর স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘এবার নির্বাচনের ব্যয় বাড়া অস্বাভাবিক নয়, তবে ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এক দিনে দুই ধরনের ভোট আয়োজনের কারণে ব্যয় বৃদ্ধি স্বাভাবিক। তবে ভবিষ্যতে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নির্বাচনি অনেক খরচই কমানো সম্ভব।’ অর্থাৎ বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে এবার ব্যয়ের অঙ্ক কত সেটা মুখ্য নয়; বরং এই ব্যয় কতটা দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে করা হয়েছে- সেটা মূল্যায়ন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।