সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান: বাংলাদেশ কি আলোর মুখ দেখবে
সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান: বাংলাদেশ কি আলোর মুখ দেখবে
editor
প্রকাশিত জুন ১, ২০২৬, ০২:১৮ অপরাহ্ণ
Manual1 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের ভাগ্য খুব একটা ভালো না। দেশের একমাত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন কোম্পানি বাপেক্সের সাগরে অনুসন্ধানের কোনও অভিজ্ঞতা নেই। অপরদিকে বারবার দরপত্র আহ্বান করেও খুব একটা সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। আর সাড়া পেলেও অনেক কোম্পানি কাজ না করে ব্লক ফেলে রেখে চলে গেছে।
Manual3 Ad Code
২০২৬ সালে সবশেষ এই বিডিং রাউন্ডের আগে আরও ৫ বার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এরমধ্যে শুরুর দিকে স্থলভাগেও দরপত্র আহ্বান করা হতো। স্থলভাগে বাপেক্সকে এককভাবে কাজ দিতে শেষের দিকে টেন্ডার বাদ দেওয়া হয়। তবে টেন্ডারের মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানিগুলো সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ করে থাকে।
বাংলাদেশ প্রথম বড় ধরনের তেল গ্যাস অনুসন্ধান দরপত্র আহ্বান করে ১৯৯৩ সালে। সে সময় বিদেশি কোম্পানির মধ্যে শেল অয়েল এবং কেয়ার্ন এনার্জি আগ্রহ দেখায়। এরপর ১৯৯৭ সালে দ্বিতীয় বড় অফশোর দরপত্র অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কয়েকটি আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি অংশ নেয় এবং পরে কিছু ব্লকে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম ধাপে ১৯৯৩ সালে বিডিং রাউন্ড হলেও তখন বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে দরপত্রের বাইরে দর কষাকষির মাধ্যমে কাজ দেওয়া হয়।
Manual4 Ad Code
এরপর ২০০৮ সালে গভীর সমুদ্রের নতুন ব্লক উন্মুক্ত করে আবারও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। ওই রাউন্ডে কনোকো ফিলিপস বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র ব্লকে অনুসন্ধান চুক্তি পায়। এটি ছিল বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পৃক্ততা। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কনোকো ফিলিপস দরপত্রের বাইরে গিয়ে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম এক ডলার করে বৃদ্ধির সুপারিশ করে। তখন পেট্রোবাংলা থেকে এর বিরোধিতা করায় বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায় কোম্পানিটি।
পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে আবারও দরপত্র ডাকা হয়। এ রাউন্ডে ভারতের ওনজিসি ভিদেশ এবং অয়েল ইন্ডিয়া যৌথভাবে অংশ নেয়। তারা অগভীর সমুদ্রে ৪ এবং ৯ নম্বর ব্লকের দায়িত্ব পায় এবং বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে। যদিও এখন তারা কোনও কাজ করছে না।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৪ সালে সরকার ২৪টি অফশোর ব্লকের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে প্রায় ৫৫টি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু ওই সময় বাংলাদেশে ছাত্র- জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ফলে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং অনির্বাচিত সরকারের অধীনে কেউ বড় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়নি।
বর্তমানে নতুন অফশোর দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এবার ২৬টি ব্লক উন্মুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বাড়াতে সরকার গ্যাসের মূল্য, মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং রফতানি নীতিতে কিছু শর্ত শিথিল করেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, নতুন সরকারের প্রতি আস্থার কারণেই এবার সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সফল হবে বাংলাদেশ। তিনি জানান, ইতোমধ্যে আমেরিকা এবং চীনের কোম্পানিগুলো তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। তিনি আশা করেন, এবারের বিডিং রাউন্ড সাড়া ফেলবে।
সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে একমাত্র সফল খনি ছিল সাঙ্গু। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য অকালেই হারিয়ে গেছে গ্যাস ক্ষেত্রটি।
জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘‘২০২৪ সালের বিডিং রাউন্ডে কোনও কোম্পানি দরপত্র জমা না দেওয়ার কারণ উদঘাটনে কমিটি করা হয়। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এবার গ্যাসের মূল্য, পাইপলাইনের খরচ, ডব্লিউপিপিএফ এবং তথ্য উপাত্তের বিষয়ে অনেকের সঙ্গে আলোচনা করে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। যাতে করে এবার আগ্রহী কোম্পানিগুলো আসতে আগ্রহী হয়।’’
Manual5 Ad Code
এদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, ‘‘বিদেশি কোম্পানিগুলো রাজনৈতিক সরকার না থাকায় আগে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী ছিল না, এটা ঠিক। তবে পাশাপাশি ওয়ার্কারদের কোম্পানি লাভের ৫ ভাগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি আছে। তারা চায় এটা আরও কমানো হোক। এদিকে বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী সব কোম্পানিই এই প্রোফিট শেয়ার করে। তাই কিছুটা জটিলতা আছে।’’ তবে তিনি আশাবাদী, এবার হয়তো কিছুটা অগ্রগতি হতে পারে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘‘সাগর থেকে তেল-গ্যাস উত্তোলন আমাদের জন্য জরুরি৷ তবে আমাদের মূল আশঙ্কা হচ্ছে— আমদানি ব্যয়ের চেয়ে যদি এই গ্যাসের দাম বেশি পড়ে যায়, তাহলে সাগর থেকে তেল-গ্যাস তোলা আমাদের জন্য লাভজনক না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। এখন যেমন আদানির বিদ্যুতের দাম দেশীয় বিদ্যুতের দামের চেয়ে বেশি পড়ছে। বানরের পিঠাভাগের মতো না হয়ে যায়, সেটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। এটা নিয়েই আমরা বেশি উদ্বিগ্ন।’’