পুশইন ইস্যুতে উত্তপ্ত সীমান্ত: কী বার্তা দিতে চায় ভারত
পুশইন ইস্যুতে উত্তপ্ত সীমান্ত: কী বার্তা দিতে চায় ভারত
editor
প্রকাশিত জুন ৭, ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
Manual5 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
ভারত থেকে সীমান্ত দিয়ে কথিত ‘পুশইন’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানানো হলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। গত এক মাস ধরে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় বাংলা ভাষাভাষী নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)।
মানবাধিকারকর্মী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সীমান্তের শূন্যরেখায় মানুষকে ঠেলে দেওয়া শুধু অমানবিকই নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচারেরও পরিপন্থী এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। তাদের ভাষ্য, বিএসএফের এই ‘পুশইন’ কৌশল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সীমান্ত প্রশ্ন
Manual6 Ad Code
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবৈধ অভিবাসন দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজনীতিতে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের প্রশ্ন প্রায়ই নির্বাচনী প্রচারণা ও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে থাকে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও নিরাপত্তা ঝুঁকির অভিযোগ তুলে আসছে। দেশটির রাজনীতিক ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দাবি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কঠোর করার অংশ হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান হলো— নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকলে তা আন্তর্জাতিক নিয়ম, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, দুই দেশের মধ্যে কোনও ইস্যুতে মতপার্থক্য বা কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হলে সীমান্ত পরিস্থিতিকে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কাউকে অন্য দেশে ফেরত পাঠানোর আগে তার নাগরিকত্ব যাচাই, সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সম্মতি গ্রহণ এবং কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা আবশ্যক। এসব ধাপ এড়িয়ে কাউকে সীমান্তে ঠেলে দিলে তা বিতর্ক ও সংকটের জন্ম দেয়।
বাংলাদেশের উদ্বেগ কোথায়
বাংলাদেশের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো, সীমান্তে আটকে পড়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষও রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা দিনের পর দিন অনিশ্চয়তার মধ্যে শূন্যরেখায় অবস্থান করতে বাধ্য হন, যা একটি মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। এ ছাড়া পরিচয় যাচাই ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দিলে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
একইসঙ্গে এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সীমান্ত হত্যা ও পুশইনের সম্পর্ক
সীমান্ত রাজনীতির আলোচনায় প্রায়ই সীমান্ত হত্যা, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান এবং পুশইনের বিষয়গুলো একসঙ্গে উঠে আসে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এ বিষয়ে প্রতিবাদ ও কর্মসূচি পালন করছে।
অন্যদিকে ভারত সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছে। ফলে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এখন আর শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার, কূটনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি
বিজিবি ও সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, বিএসএফের কথিত পুশইন প্রচেষ্টাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা বেড়েছে। মে ও জুন মাসজুড়ে কতজনকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তার কোনও সমন্বিত সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করছে বিজিবি।
বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ৪ জুন ঝিনাইদহ, যশোর, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, সিলেট ও নেত্রকোনা সীমান্তে মোট ১০টি পৃথক পুশ-ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়। কয়েকটি ঘটনায় বিএসএফ সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় লোকজন জড়ো করলেও বিজিবির সতর্ক অবস্থানের কারণে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করাতে পারেনি।
পরদিন ৫ জুন লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নওগাঁ সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ অন্তত ৬০ জনকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয় বলে জানায় বিজিবি। তবে বিজিবির বাধার মুখে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান নেয়।
লালমনিরহাট সীমান্তে চারটি পয়েন্ট দিয়ে ৩০ থেকে ৩৩ জনকে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। পঞ্চগড়ের বড়বাড়ী সীমান্তে ১০ জনকে শূন্যরেখায় রাখা হয়। বিএসএফ তাদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি করলেও বিজিবি এ দাবির পক্ষে প্রমাণ চেয়েছে। নওগাঁর সাপাহার সীমান্তেও ১৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে ২৮ জনকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। বিজিবির বাধার কারণে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পেরে কয়েক দিন ধরে ‘নো ম্যান্স ল্যান্ডে’ অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিলেন। এ সময় খাদ্যসংকট, বৃষ্টিতে দুর্ভোগ ও অসুস্থতার খবর পাওয়া যায়।
পতাকা বৈঠকে বিএসএফ পুশইনের বিষয়টি স্বীকার করলেও এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। তবে ৬ জুন ভোরের দিকে ওই সীমান্তে অবস্থানরত নারী-শিশুসহ প্রায় ৪৫ জনকে আর দেখা যায়নি। স্থানীয়দের ধারণা, বিজিবির কঠোর নজরদারির মুখে বিএসএফ তাদের ভারতের অভ্যন্তরে সরিয়ে নিতে পারে।
এদিকে ৬ জুন বিজিবি জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ঝিনাইদহ, নওগাঁ, লালমনিরহাট, পঞ্চগড় ও নেত্রকোনা সীমান্তে আরও আটটি পৃথক পুশ-ইন প্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৬০ জনের বেশি মানুষ জড়িত ছিলেন।
সব মিলিয়ে গত তিন দিনে অন্তত ১৮টি পুশইন প্রচেষ্টায় প্রায় ২০০ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঝিনাইদহ ও নেত্রকোনাসহ উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি সীমান্ত এলাকা বর্তমানে এই ইস্যুর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক চাপের কৌশল?
Manual3 Ad Code
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিএসএফের মাধ্যমে কথিত ‘পুশ-ইন’ তৎপরতা বৃদ্ধির পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সরকারের ওপর এক ধরনের রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।
তার মতে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে পশ্চিমা বিশ্বের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ঝোঁকের যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তার প্রেক্ষাপটে ভারত পরোক্ষভাবে চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যু ব্যবহার করে আসছে বিজেপি। বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে। তার মতে, বর্তমান পুশইন তৎপরতা সেই রাজনৈতিক বয়ানকে সামনে এনে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরিরও একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।
সাইফুল হক বলেন, যদি কোনো ব্যক্তিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রয়োজন হয়, তবে আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয়ভাবে স্বীকৃত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তা করা উচিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশেও অনেক ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন, যাদের মধ্যে কেউ কেউ বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান করছেন। কিন্তু কাউকেই অবৈধভাবে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘আগ্রাসী ও অমানবিক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শামিল এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের বক্তব্য এবং একই সঙ্গে সীমান্তে এমন কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট দ্বিচারিতা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
যা বলছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, পুশইনকে শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।
তার মতে, বৈধ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক রীতি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য নেতিবাচক। বাংলাদেশের উচিত সীমান্তে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার পাশাপাশি কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা।
Manual8 Ad Code
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আবু রুশদ এ আর এম শহিদুল ইসলাম মনে করেন, ভারতের এই তৎপরতাকে শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না। এর পেছনে রাজনৈতিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।
আবু রুশদ বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— এই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের প্রধান ভুক্তভোগী হচ্ছেন সীমান্ত এলাকার দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ। কোনোভাবেই সাধারণ মানুষকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
Manual7 Ad Code
আর মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, সীমান্তে একতরফা পুশইন কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি মানবিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। তার মতে, এ ধরনের তৎপরতা বাড়লে সীমান্ত হত্যা, সহিংসতা এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়বে। অতীতেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বা নতুন সীমান্ত নীতির পর সীমান্তে সহিংসতার প্রবণতা দেখা গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।