বাস্তব চেহারার সঙ্গে মেলে না এনআইডির ছবি, বিড়ম্বনা
বাস্তব চেহারার সঙ্গে মেলে না এনআইডির ছবি, বিড়ম্বনা
editor
প্রকাশিত জুন ১০, ২০২৬, ০৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Manual2 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
নাগরিকের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করা, প্রতারণা ও জালিয়াতি রোধ এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা নির্বিঘ্ন করতে ২০০৮ সালে সারা দেশে ছবিযুক্ত জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) চালু করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে। এর লক্ষ্য ছিল নাগরিকের দোরগোড়ায় ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং সেবাপ্রাপ্তি সহজ করা।
প্রথমদিকে নাগরিকদের লেমিনেটেড কাগজের এনআইডি দেওয়া হতো। পরে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পরিচয়পত্র চালুর উদ্যোগ নেয় ইসি। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর বায়োমেট্রিক তথ্যসংবলিত স্মার্ট এনআইডি কার্ডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। একই সঙ্গে পুরোনো লেমিনেটেড পরিচয়পত্রের পরিবর্তে স্মার্টকার্ড বিতরণ শুরু হয়।
স্মার্টকার্ড চালুর সময় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, এটি বহুমুখী ও আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ একটি পরিচয়পত্র, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে অন্তত ২২ ধরনের সেবা পাওয়া যাবে।
তবে এক দশক পেরিয়ে গেলেও নাগরিকরা সেই প্রতিশ্রুত সেবাগুলোর উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাননি। ফলে লেমিনেটেড এনআইডি দিয়ে যেসব সেবা পাওয়া যেত, স্মার্টকার্ডেও কার্যত একই সেবা মিলছে। অর্থাৎ কার্ডের ধরন বদলালেও সেবার মানে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি। পাশাপাশি এনআইডির ছবির মান নিয়েও রয়েছে ব্যাপক অভিযোগ।
বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০০৮ সালে যখন ছবিযুক্ত এনআইডি কার্যক্রম শুরু হয়, তখন অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না। ছবি তোলার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যেও ছিল উদাসীনতা।
Manual7 Ad Code
ফলে নাগরিকরা যে অবস্থায় উপস্থিত হয়েছেন, সেভাবেই ছবি তোলা হয়েছে। কার্ড হাতে পাওয়ার পর নিজের ছবিই চিনতে পারিনি। পরে স্মার্ট এনআইডি দেওয়া হলেও সেখানে আগের লেমিনেটেড কার্ডের ছবিই ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি।
এদিকে সময়ের সঙ্গে চেহারার পরিবর্তন এসেছে। এখন কোনো সেবা নিতে গেলে সেবাদাতারা বারবার কার্ডের ছবি ও মুখের দিকে তাকান। অনেক সময় ছবির সঙ্গে চেহারার মিল খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েন। স্মার্টকার্ড দেওয়ার সময় যদি নতুন ছবি নেওয়া হতো, তা হলে এ সমস্যা থাকত না।’
Manual5 Ad Code
দিন দিন এনআইডির গুরুত্ব বাড়ছে। বর্তমানে আয়করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) গ্রহণ, শেয়ার আবেদন ও বিও হিসাব খোলা, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, ট্রেড লাইসেন্স, পাসপোর্ট, যানবাহন নিবন্ধন, চাকরির আবেদন, বীমা স্কিমে অংশগ্রহণ, স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন, ব্যাংক হিসাব খোলা, ভোটার শনাক্তকরণ, ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ সংযোগ, সরকারি ভাতা উত্তোলন, মোবাইল ফোন সংযোগ, ই-টিকেটিং, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি এবং বিভিন্ন অনলাইন সেবায় লগইনসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে এনআইডি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
Manual1 Ad Code
এনআইডির অন্যতম উদ্দেশ্য নাগরিকের পরিচয় নিশ্চিত করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে ছবি দেখে পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয় না। ফলে এনআইডি নম্বরের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করেই সেবাদাতারা পরিচয় নিশ্চিত করেন।
Manual4 Ad Code
মো. রুমেল নামে এক ভোটার বলেন, ‘একদিকে অস্পষ্ট ছবি, অন্যদিকে ভুল তথ্যের ছড়াছড়ি। দেশে এনআইডিতে ভুল নেই- এমন মানুষ খুব কমই আছেন।
কিন্তু এসব ভুল তো নাগরিকরা করেননি। ভোটার নিবন্ধনের সময় যারা দায়িত্বে ছিলেন, দায় তাদেরও। এখন কোনো কাজে এনআইডি ব্যবহার করতে গেলে দেখা যায়, সার্টিফিকেটের সঙ্গে নামের মিল নেই, জন্মনিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে অমিল রয়েছে কিংবা বয়স ভুল।
এসব সংশোধন করতে গিয়ে নানা ধরনের কাগজপত্র জমা দিতে এবং হয়রানির শিকার হতে হয়। অনেক সময় মনে হয়, এনআইডি দিয়ে নিজের নাগরিক পরিচয় প্রমাণ করাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনআইডি শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০০৮ সালে যখন প্রথম ছবিযুক্ত এনআইডি চালু হয়, তখন নাগরিকসেবার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব বর্তমানের মতো ছিল না।
ফলে অনেকেই তথ্য দেওয়ার সময় যথেষ্ট সতর্ক ছিলেন না। কেউ সার্টিফিকেটের নামের পরিবর্তে ডাকনাম ব্যবহার করেছেন, কেউ মা-বাবার নাম ভুলভাবে লিখেছেন।
এর ফলে অনেক ভুল তৈরি হয়েছে। শুধু নাগরিকদের দায় দিলে হবে না, মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারীদেরও দায় রয়েছে। তারা যদি এনআইডি ও এর ছবির গুরুত্ব যথাযথভাবে বোঝাতে পারতেন, তা হলে আজ এত সংশোধনের প্রয়োজন হতো না।’
এ বিষয়ে এনআইডির মহাপরিচালক (ডিজি) আবুল হাসনাত মুহাম্মদ আনোয়ার পাশা বলেন, ‘যারা ছবির কারণে সমস্যায় পড়ছেন, তারা অনলাইনে ফরম-২ পূরণ করে ছবি পরিবর্তনের আবেদন করতে পারেন। এরপর সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে গিয়ে নতুন ছবি তুলতে হবে।’
ছবি পরিবর্তনের ফলে স্মার্টকার্ডের পরিবর্তে আবার লেমিনেটেড কার্ড পাওয়া যাবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্মার্টকার্ড পরিবর্তন হয়ে লেমিনেটেড কার্ড হলেও সমস্যা নেই। কারণ দুটিই সমানভাবে বৈধ পরিচয়পত্র।’