প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১০ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৪শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

শূন্যরেখায় মানুষ ঠেলে দেওয়া কতটা বৈধ?

editor
প্রকাশিত জুন ১০, ২০২৬, ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ
শূন্যরেখায় মানুষ ঠেলে দেওয়া কতটা বৈধ?

Manual8 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

সীমান্তের শূন্যরেখায় মানুষকে জোর করে এনে রেখে দেওয়া বা একতরফা ‘পুশইন’ করার ঘটনা শুধু মানবিক সংকটই নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় আচরণের ক্ষেত্রেও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও দেশের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ থাকার অভিযোগ থাকলেও তাদের ফেরত পাঠানোর জন্য নির্ধারিত কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া এড়িয়ে সীমান্তে মানুষ ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার-নীতি এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পরিপন্থি।

আন্তর্জাতিক আইনে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, কোনও রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ কিংবা চাপ প্রয়োগ করতে পারে না। ফলে সীমান্তে একতরফা মানুষ ঠেলে দেওয়া বা শূন্যরেখায় আটকে রাখা শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচার ভঙ্গ নয়, বরং আন্তর্জাতিক নীতিরও লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

Manual2 Ad Code

শূন্যরেখা ও নো-ম্যানস ল্যান্ডের আইনি অবস্থান

আন্তর্জাতিক সীমান্তের বিভাজনরেখাকে সাধারণত ‘শূন্যরেখা’ বলা হয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় শূন্যরেখার উভয় পাশে প্রায় ১৫০ গজ এলাকাকে বাফার জোন বা নো-ম্যানস ল্যান্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সীমান্ত-সংক্রান্ত চুক্তি ও প্রচলিত ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী এই এলাকায় কোনও পক্ষ একতরফাভাবে শক্তি প্রদর্শন, স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ বা আগ্রাসী তৎপরতা চালাতে পারে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নাগরিকত্ব যাচাই বা কনস্যুলার প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে সীমান্তে এনে অন্য দেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। এমন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত রাষ্ট্র তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কূটনৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার রাখে।

প্রথম প্রতিক্রিয়া: ফ্ল্যাগ মিটিং থেকে কূটনৈতিক প্রতিবাদ

সীমান্তে এ ধরনের উত্তেজনা দেখা দিলে প্রথম পদক্ষেপ হয় দ্বিপাক্ষিক কাঠামোর ভেতরে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাতে পারে এবং বিদ্যমান সীমান্ত চুক্তির বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। একইসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতে পারে। ‘নোট ভারবাল’-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ, স্বরাষ্ট্র বা পররাষ্ট্র পর্যায়ের বৈঠকেও বিষয়টি আলোচনায় আনা যেতে পারে। ভারতের দিল্লিতে এখন বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক চলছে। সেখানেও এসব নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কী করা সম্ভব?

দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগে সমাধান না এলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামেও উত্থাপন করা যেতে পারে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে তা জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে তোলা সম্ভব। প্রয়োজনে জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার তদন্ত বা তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।

আন্তর্জাতিক প্রথাগত আইন অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করলে তার জন্য আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। সেই ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ভবিষ্যতে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ এবং পুনরাবৃত্তি না হওয়ার নিশ্চয়তা দাবি করতে পারে।

Manual5 Ad Code

প্রমাণ সংগ্রহ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে ঘটনার তথ্য-প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিডিও ফুটেজ, জিও-লোকেশন ডেটা, ড্রোনচিত্র কিংবা প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য পরবর্তী আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইসঙ্গে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের স্বীকৃত প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কাউকে গ্রহণ না করার অবস্থানও আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

শূন্যরেখায় কতদিন রাখা যায়?

সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক বা দ্বিপাক্ষিক কোনও আইনেই শূন্যরেখা বা নো-ম্যানস ল্যান্ডে সাধারণ মানুষের অবস্থানের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা নেই। কারণ আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সেখানে কোনও ব্যক্তির অবস্থান করার কথাই নয়। তবে বাস্তবে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক জটিলতা বা রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে অনেক সময় মানুষ দিনের পর দিন, এমনকি মাসের পর মাস শূন্যরেখায় আটকে থাকে। কিন্তু এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই আইনি স্বীকৃতি পায় না, বরং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

‘পুশ-ইন নয়, অনুসরণ করতে হবে স্বীকৃত প্রক্রিয়া’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘‘ভারত যদি কোনও ব্যক্তিকে অবৈধ বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তাদের ফেরত পাঠাতে হবে। আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও যাচাই-বাছাই ছাড়া জোরপূর্বক সীমান্তে এনে ঠেলে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।’’

তিনি বলেন, ‘‘যদি সত্যিই তারা বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকে এবং ভারতে অবৈধভাবে অবস্থান করে থাকে, তাহলে বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা হওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।’’

Manual2 Ad Code

তিনি মনে করেন, কোনও কূটনৈতিক যোগাযোগ নেই, যাচাই-বাছাই নেই—এ অবস্থায় হঠাৎ কিছু মানুষকে ধরে সীমান্তে এনে পাঠিয়ে দেওয়া সঠিক প্রক্রিয়া নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রীয় আচরণের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিষয় নির্ধারিত নিয়ম মেনেই পরিচালিত হওয়া উচিত।

ড. মান্নানের মতে, এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও এমন ঘটনা নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। তবে নাগরিকত্ব নির্ধারণ ও প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করাই দুই দেশের জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও টেকসই পথ।

Manual3 Ad Code

বর্তমান পরিস্থিতিকে ভারতের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক চাপের অংশ উল্লেখ করে সীমান্তে ‘পুশইন’ ইস্যুতে সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক আবু রুশদ এ আর এম শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমি এটিকে এক ধরনের ‘প্রেসার ট্যাকটিক্স’ বা চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখি। একদিকে তারা বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে সীমান্তে পুশ ইনের মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চাপ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। পুশইনের ক্ষেত্রে অনুসরণ করতে হবে সীমান্ত আইনের স্বীকৃত প্রক্রিয়া।’’

তিনি বলেন, ‘‘এই ধরনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপড়েনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন সীমান্তবর্তী দরিদ্র মানুষরা। অতীতেও দেখা গেছে, কথিত অনুপ্রবেশকারী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code