প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৯শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

৫৫ বছরে বাজেট বেড়েছে বহুগুণ, মানুষের জীবন বদলেছে কতটা?

editor
প্রকাশিত জুন ১১, ২০২৬, ০৮:৩৭ পূর্বাহ্ণ
৫৫ বছরে বাজেট বেড়েছে বহুগুণ, মানুষের জীবন বদলেছে কতটা?

Manual8 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। এর পর গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের মানুষের আয় কয়েক গুণ বেড়েছে।
সেইসাথে অর্থনীতির আকার বেড়েছে, বেড়েছে ভোগব্যয়ও। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও পারিবারিক খরচ বৃদ্ধির কারণে সেই আয় বৃদ্ধির সুফল পুরোপুরি সাধারণ মানুষ পায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে দেশের প্রথম বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭১৯ কোটি টাকা।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর এসে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ৫৫ বছরে বাজেটের আকার বেড়েছে প্রায় হাজার গুণ।
১৯৭২ সালে একজন মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৯৪ মার্কিন ডলার। পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে ২০২৬ সালে তা ৩ হাজার ২০ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ পাঁচ দশকে মাথাপিছু আয় প্রায় ৩০ গুণেরও বেশি। আর ১৯৭২ সালে মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাসে সেটা দাঁড়িয়েছে ৯.৪২ শতাংশ।

এদিকে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এক বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই সাধারণ মানুষের পকেট ফাঁকা হওয়ার বাস্তবতা আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। খসড়া বাজেটে আগামী অর্থবছরের জন্য সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ। কিন্তু এই লক্ষ্য যখন নীতিনির্ধারকদের টেবিলে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখনই দেশের বাজারে মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত মে মাসেই দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। এই মূল্যস্ফীতি গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাতা-কলমে দাম কমানোর সরকারি সদিচ্ছা আর বাজারের রূঢ় বাস্তবতার এই বিশাল ব্যবধান দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের চাপে ফেলে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একটানা চলতে থাকা এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ আসন্ন অর্থবছরের বাজেটের কার্যকারিতাকে শুরুতেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

খসড়া বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে পেশ হতে যাচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট। এবারের বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এবারের বাজেটে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন তথা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট হতে যাচ্ছে সরকারের জন্য এক বিশাল পরীক্ষা। একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন আমদানি করা প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

Manual1 Ad Code

ব্যয় বেড়েছে আয়ের চেয়েও দ্রুত

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে খাদ্যে ব্যয়ের অংশ নেমে এসেছে প্রায় ৪৫ শতাংশে। অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, পরিবহন, যোগাযোগ ও বিনোদন খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্বাধীনতার পর এক কেজি চালের দাম ছিল ১ থেকে ২ টাকার মধ্যে। বর্তমানে ভালো মানের চাল কিনতে ৭০ থেকে ৮৫ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। একইভাবে ভোজ্যতেল, ডাল, মাছ, মাংস, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে এক কেজি ছিল ১-২ টাকা। সেই চাল ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে দাঁড়িয়েছে ৭০ থেকে ৮৫ টাকা। তখন গরুর মাংসের কেজি ছিল ১২ থেকে ১৫ টাকা। এখন ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা। সয়াবিন তেলের লিটার ছিল ৫ থেকে ৬ টাকা এখন ১৮০ থেকে ১৯৯ টাকা।

Manual7 Ad Code

বিবিএসের গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০১০ সালে একটি পরিবারের মাসিক গড় ব্যয় ছিল প্রায় ১১ হাজার টাকা। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৩১ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছায়। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মাসিক গড় ব্যয় ৪৩ হাজার টাকারও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে গত তিন বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করেছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস ও সবজির দাম বাড়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ বেড়েছে।

ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজারদরের তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক বছরে মোটা চালের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি কেজি ৫২ থেকে ৫৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মধ্যবিত্তের প্রিয় বিআর-২৮ চালের দাম ৬ শতাংশ বেড়ে মানভেদে ৫৪ থেকে ৬৮ টাকায় ঠেকেছে। এমনকি খোলা সয়াবিন তেলের দাম এক বছরে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা এবং পাম তেল ১২ শতাংশ বেড়ে ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবজির বাজারে সারা বছরই আগুন লেগে থাকছে। শীত বা গ্রীষ্ম যে কোনো ঋতুতেই এখন বাজারে ৭০ থেকে ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি পাওয়া যাচ্ছে না।

২০২০-২১ অর্থবছরে মহামারি পরবর্তী অর্থনৈতিক স্থবিরতা থাকলেও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। বিবিএস-এর বার্ষিক গড় হিসাবে এই সময়ে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৫৬ শতাংশ। এর বিপরীতে কৃষি ও শিল্প খাতের মতো আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের গড় মজুরি বা মজুরি সূচক বৃদ্ধি পেয়েছিল ৬.১২ শতাংশ। অর্থাৎ, এই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কিছুটা বেশি থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ কম ছিল।

এরপর ২০২২ সালের শুরুর দিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় দেশের অভ্যন্তরেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করে। এই অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৬.১৫ শতাংশে। তবে এই সময়ে স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষের নামমাত্র মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল গড়ে ৬.০৬ শতাংশ। বিবিএস-এর এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, এই অর্থবছর থেকেই মূলত মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে ডলার সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন এবং আমদানি খরচের তীব্র বৃদ্ধির কারণে এই অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি এক লাফে বড় অঙ্কে রূপ নেয়। বিবিএস-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়ায় ৯.০২ শতাংশে (খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বেশি ছিল)। কিন্তু এর বিপরীতে নিম্ন ও সাধারণ আয়ের মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল গড়ে মাত্র ৭.২৬ শতাংশ। ফলে শ্রমিক ও স্বল্প আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমতে থাকে।

২০২৩-২৪ অর্থবছর সামষ্টিক অর্থনীতির নানামুখী সংকটে এই অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি আগের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। বিবিএস-এর তথ্যানুসারে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি রেকর্ড ১০.৪২ শতাংশে পৌঁছায়, যা বিগত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর বিপরীতে কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাতের স্বল্প আয়ের ও অদক্ষ শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল গড়ে ৭.৭৪ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির হারের মধ্যে প্রায় ২.৬৮ শতাংশের এই বিশাল ব্যবধানের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে চরম হিমশিম খেতে হয়।

বিবিএসের সর্বশেষ ২০২৬ সালের মে মাসের তথ্য এবং আগের অর্থবছরের বার্ষিক গড় হিসাব অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতি কিছুটা ওঠানামার মধ্যে রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯.৭ শতাংশের আশেপাশে অবস্থান করে। তবে ২০২৬ সালের মে মাসে এসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আবারও বেড়ে ৯.৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ মে মাসের তথ্য অনুযায়ী, স্বল্প আয়ের মানুষের জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৮.২১ শতাংশ। দীর্ঘ সময় ধরে মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি উচ্চে থাকায় সাধারণ মানুষের সঞ্চয় কমে গেছে এবং নিত্যদিনের ভোগব্যয়ের ওপর চাপ বেড়েই চলেছে।

জানা গেছে, ২০২২ সালের পর খাদ্য ও জ্বালানি বাজারে বৈশ্বিক অস্থিরতা বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে ধরে রেখেছে। মজুরি বেড়েছে, কিন্তু ব্যয় বেড়েছে আরও দ্রুত।

স্বাধীনতার পর একজন কৃষিশ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ৫-১০ টাকার মধ্যে। বর্তমানে অনেক এলাকায় তা ৬০০ থেকে ১,০০০ টাকায় পৌঁছেছে। পোশাক খাতে ন্যূনতম মজুরি ১৯৮৫ সালে কয়েক শ টাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তবে মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাসাভাড়া, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরিবহন ব্যয়। ফলে আয় বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল মেলেনি।

১৯৭২-৭৩ থেকে ২০২৫-২৬ বাজেটের আকার, মূল্যস্ফীতি, মাথাপিছু আয়, পারিবারিক ব্যয়ের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭১৯ কোটি টাকা, আর মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ৯০ মার্কিন ডলার। গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ২০-৩০ শতাংশ এবং মাসিক গড় পারিবারিক ব্যয় ৫০০ টাকা এর নিচে।

১৯৮০-৮১ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৩,৮৯৬ কোটি টাকা, আর মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ২৮০ মার্কিন ডলার। গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ শতাংশ।

১৯৯০-৯১ অর্থবছরের বাজেট ছিল ১১,৬৮০ কোটি টাকা, আর মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ২৯০ মার্কিন ডলার। গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে এবং মাসিক গড় পারিবারিক ব্যয় ২৪০০ টাকা।

২০০০ -০১ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৩০,৫০০ কোটি টাকা, আর মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ৪০০ মার্কিন ডলার। গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ২ শতাংশের মধ্যে এবং মাসিক গড় পারিবারিক ব্যয় ৫২০০ টাকা।

২০১০ -১১ অর্থবছরের বাজেট ছিল ১.৩২ লাখ কোটি টাকা, আর মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ৮৯০ মার্কিন ডলার। গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৮ শতাংশের মধ্য এবং মাসিক গড় পারিবারিক ব্যয় ১১২০০ টাকা।

২০২০ -২১ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৫.৬৮ লাখ কোটি টাকা, আর মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ২৫৯১ মার্কিন ডলার। গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৬ শতাংশের মধ্য এবং মাসিক গড় পারিবারিক ব্যয় ৩১৫০০ টাকা।

২০২৫ -২৬ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৭.৯০ লাখ কোটি টাকা, আর মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ২৮২০ মার্কিন ডলার। গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ থেকে ৯ শতাংশের (প্রাক্কলন) মধ্য এবং মাসিক গড় পারিবারিক ব্যয় ৪৩ হাজার টাকা এর বেশি।

Manual8 Ad Code

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি দেখা যায় স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের আগে ও পরে খাদ্যদ্রব্যের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে ২০০৭-০৮ সালের বৈশ্বিক খাদ্য সংকট এবং ২০২২ সালের পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে দেশে মূল্যস্ফীতি আবারও তীব্র হয়।

২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে অবস্থান করায় মানুষের প্রকৃত আয় বৃদ্ধির সুফল অনেকাংশে কমে যায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে।

সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা খাদ্য মূল্যস্ফীতি। মে মাসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এপ্রিলের ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ থেকে লাফিয়ে মে মাসে ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশে উঠেছে। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে যেন আগুন লেগেছে। পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে খাদ্য বহির্ভূত খাতের মূল্যস্ফীতি যা মে মাসে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। যাতায়াত, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ মিটাতে গিয়ে সীমিত আয়ের মানুষরা এখন দিশেহারা। টানা কয়েক বছর উচ্চ মূল্যস্ফীতির যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে তার ওপর নতুন করে এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং বিভিন্ন অনুৎপাদনশীল খাতে সরকারের অর্থ সরবরাহের নীতি বাজারে টাকার প্রবাহ সচল রাখছে, যা মূল্যস্ফীতি উসকে দেয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। ফলে সরকারের সাড়ে সাত শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা শুধু কঠিনই নয়, বরং এক প্রকার অবাস্তব ও কল্পনাবিলাসী বলে মনে করছেন গবেষণা সংস্থাগুলো।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার মে মাসে ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। তাই ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি সরাসরি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চাপে ফেলছে। আয়ের চেয়ে ব্যয়ের গতি বেশি হওয়ায় মানুষ এখন টিকে থাকার জন্য জমানো টাকা ভাঙছে অথবা চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে। বাজারে চলমান এই অস্থিরতার পেছনে কেবল বৈশ্বিক পরিস্থিতি নয়, অভ্যন্তরীণ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কাঠামোগত দুর্বলতা বড় ভূমিকা রাখছে। দেশের শক্তি ও জ্বালানি খাতের ওপর চাপ কমাতে সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ও পরিবহন খরচ এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে গেছে।

এই উচ্চ উৎপাদন ও পরিবহন খরচের চাপ সরাসরি এসে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ঘাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি নির্ধারণী সুদের হার বাড়িয়ে ১০ শতাংশে ধরে রাখলেও এবং মুদ্রা সংকোচন নীতি নেয়ার কথা বললেও, বাজার ব্যবস্থাপনার ত্রুটি এবং অসাধু চক্রের সিন্ডিকেটের কারণে তার কোনো সুফল মিলছে না।

আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি শেষ পর্যন্ত সাড়ে ৮ শতাংশের নিচে নামানো সম্ভব নাও হতে পারে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রা নীতির লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের খসড়া বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানোর আভাস থাকলেও, তা মধ্যবিত্তের ক্ষোভ কিংবা নিম্নবিত্তের হাহাকার কমাতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েই গেছে। যদি আসন্ন বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সরকার ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়ার ধারা বজায় রাখে, তবে তা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দেবে এবং বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির খান বলেন, অর্থনীতির আকার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় বাজেটের পরিমাণও বেড়েছে। তবে জিডিপির তুলনায় আগামী অর্থবছরের বাজেটকে খুব বেশি বড় মনে করার সুযোগ নেই। তবে ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপও বেড়েছে। কিন্তু পরিবারের মাসিক হিসাব-নিকাশ বলছে, আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যয়ের চাপও সমানতালে বেড়েছে। শুধু মাথাপিছু আয় দিয়ে মানুষের জীবনমান বোঝা যায় না। কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রকৃত আয় কমিয়ে দেয়। ফলে আয়ের বৈষম্য বেড়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ব্যক্তিগত ব্যয় বেড়েছে। শহরাঞ্চলে বাসাভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। ফলে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির পরও সাধারণ মানুষের বড় অংশ মনে করছে, সংসার চালানোর চাপ আগের চেয়ে বেড়েছে।

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে ব্যয় বৃদ্ধির বড় কারণ হিসেবে মূল্যস্ফীতিই কাজ করছে। আয় বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকায় সরকারের ওপর অর্থসংস্থানের চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ওপরও। প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় কর পরিশোধের সক্ষমতা কমেছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও বাড়তি করের বোঝা বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ, কমে যাওয়া প্রকৃত আয় এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে সরকারকে রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হলে ব্যাংকঋণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগামী বছর সরকারের প্রধান দুটি চ্যালেঞ্জের একটি হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। আরেকটি হলো, রাজস্ব আহরণ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ না করা গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি আসবে না। তাই সরকারের উচিত এই দুটি বিষয়ে জোর দেয়া।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বাজেটের আকার হাজার গুণ বেড়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও মানুষের আয়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি। তবে আয়-ব্যয়ের বৈষম্যও বেড়েছে। মানুষের কাছে অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রকৃত অর্থ এখন শুধু আয় বৃদ্ধি নয়, বরং আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এই বৈষম্য কমাতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, কৃষক ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি চালু রয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির সামগ্রিক গতি না বাড়লে এসব কর্মসূচির পরিধি বাড়ানো কঠিন হবে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান মূল্যস্ফীতির মূল কারণ সরবরাহ সংকট ও অর্থনীতির ধীরগতির প্রবৃদ্ধি। কেবল সুদের হার বাড়িয়ে চাহিদা কমানোর নীতি প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। বরং সরবরাহ বৃদ্ধি, সরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

আবু আহমেদ বলেন, অর্থনীতিকে বর্তমান স্থবির অবস্থা থেকে বের করে আনতে হবে। প্রবৃদ্ধি বাড়লে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বেকারত্ব কমবে এবং রাজস্ব আয়ও বাড়বে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফেরাতে সরকারি বিনিয়োগ, সুদের হার হ্রাস, পুঁজিবাজারের বিকাশ এবং উৎপাদনমুখী খাতে সহায়তা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

Manual3 Ad Code

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code