প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৯শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

অসম্ভবকে সম্ভব করার বাজেট, সরকারের সামনে কঠিন পরীক্ষা

editor
প্রকাশিত জুন ১৩, ২০২৬, ১০:১৮ পূর্বাহ্ণ
অসম্ভবকে সম্ভব করার বাজেট, সরকারের সামনে কঠিন পরীক্ষা

Manual3 Ad Code

 

Manual3 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দাঁড়িয়ে দেশের ইতিহাসের অন্যতম উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট শুধু একটি আর্থিক দলিল নয়, বরং এক অর্থে সংকট থেকে উত্তরণের একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গীকার। তবে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারণী মহলের বড় একটি অংশ মনে করছে— এই বাজেট বাস্তবায়ন করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘ ১৯ বছর পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের উপস্থাপিত এই প্রথম বাজেটকে অনেকেই ‘স্বপ্নের বাজেট’ বলছেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকারকে এমন কিছু অর্জন করতে হবে— যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অনেকের কাছেই প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।

 

রাজস্ব ঘাটতির পাহাড়ের সামনে নতুন লক্ষ্য

সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আহরণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। মূল বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি ইতোমধ্যে এক লাখ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে শুধু এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রাই ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, গত কয়েক বছর ধরে রাজস্ব আহরণে ধারাবাহিক ঘাটতির পর এমন উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ রাজস্ব আদায় বাড়াতে হলে অর্থনীতির সামগ্রিক কর্মকাণ্ড, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি এবং বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য গতি ফিরিয়ে আনতে হবে।

 

ব্যয়ের বাজেট, কিন্তু অর্থ আসবে কোথা থেকে?

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে রেকর্ড ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। আবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা। এডিপির বাইরে আরও ১৬ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয় রয়েছে।

 

প্রশ্ন উঠছে, এত বড় ব্যয়ের অর্থায়ন হবে কীভাবে?

রাজস্ব আদায় প্রত্যাশিত মাত্রায় না হলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে। এতে ব্যাংক খাতে তারল্যের চাপ বাড়বে, বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমবে এবং বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেটের রাজস্ব ও প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘‘চলতি অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে রফতানি, রাজস্ব আদায় ও বেসরকারি ঋণে অলৌকিক পরিবর্তন হবে—এমন ধারণার ওপর আগামী বছরের বাজেট দাঁড় করানো হয়েছে।’’

 

প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কি বাস্তবসম্মত?

সরকার আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Manual7 Ad Code

অপরদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই স্থবির। ব্যাংক ঋণের সুদের হার তুলনামূলক বেশি, উদ্যোক্তাদের আস্থার সংকট রয়েছে, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি এবং বৈশ্বিক বাজারেও চাহিদা এখনও দুর্বল। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, এই পরিস্থিতিতে ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানিতে বড় ধরনের গতি আনতে হবে, যা সহজ কাজ নয়।

 

Manual8 Ad Code

মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই

সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। অথচ বর্তমানে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মূল্যস্ফীতি কমবে না। খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন, আমদানি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।

সিপিডির ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহজনিত। ফলে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।

 

ব্যবসায়ীদের সমর্থন, রয়েছে শঙ্কাও

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের উদ্যোগের প্রশংসা করেছে। তবে সংগঠনটি সতর্ক করেছে, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেষ্টা করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ ও হয়রানির কারণ হতে পারে।

এমসিসিআই মনে করে, বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ানোর পরিবর্তে করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন এবং সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

 

সরকারের পাল্টা যুক্তি: সংস্কারেই মিলবে সমাধান

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য এই চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে অবগত। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, বাংলাদেশকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করা এখন আর বিকল্প নয়, বরং বাধ্যবাধকতা।

তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, বিনিয়োগে নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা হবে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের অবহেলা, বিলম্ব কিংবা হয়রানির বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারীরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন— এমন একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালু করা হবে।

Manual5 Ad Code

অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, কোনও সেবা নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন না হলে তার জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ চালু করা হবে। তিনি বলেন, ‘‘অতীতে এক বছরের প্রকল্প শেষ হতে সাত থেকে ১০ বছর লেগেছে। নতুন ব্যবস্থায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করতে হবে।’’

 

সাফল্যের চাবিকাঠি সুশাসন ও বাস্তবায়ন

অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বাজেটের অনেক লক্ষ্যই কাগজে-কলমে অসম্ভব মনে হলেও সেগুলো পুরোপুরি অপ্রাপ্য নয়। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, সরকারি ব্যয়ের অপচয়, কর ফাঁকি এবং ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

 

অসম্ভবের বাজেট নাকি পরিবর্তনের সূচনা?

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট মূলত দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে রাজস্ব ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ সংকট ও ঋণের চাপ। অন্যদিকে রয়েছে অর্থনীতিকে পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এ কারণেই অনেক অর্থনীতিবিদ এই বাজেটকে ‘অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন।

প্রশ্ন এখন একটাই— সরকার কি কেবল বড় স্বপ্ন দেখছে, নাকি প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে? উত্তর মিলবে আগামী এক বছরে। তবে এটুকু নিশ্চিত, এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে বাজেট বক্তৃতায় নয়, বরং মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code