একদিকে দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক মন্দা, অন্যদিকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটÑ এমন জটিল আবর্তের মধ্যেও আকাশছোঁয়া প্রত্যয় নিয়ে আসন্ন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
নতুন সরকার ও অর্থমন্ত্রীর এই প্রথম বাজেটে রয়েছে বিধ্বস্ত অর্থনীতি টেনে তোলার পরিকল্পনা, বিনিয়োগ চাঙ্গার প্রচেষ্টা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি, জ্বালানি সংকট মোকাবিলার রোডম্যাপ, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করার পদক্ষেপ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় বিশেষ নজরসহ আকাশছোঁয়া নানা প্রত্যয়।
তবে নতুন এ বাজেট নিয়ে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কারণ দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেবেন দেশের নতুন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু সাহসী নানা উদ্যোগের কথা জানালেও এ নিয়ে একটি কথাও বলেননি তিনি। অথচ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ এখন অর্থনীতির বড় শত্রু। দীর্ঘ সময় ধরে শেয়ারবাজার মৃতপ্রায়। কিন্তু বাজেটে এ বাজার চাঙ্গা করতে কোনো পদক্ষেপ নেই। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে রপ্তানি খাতও ঝুঁকির মুখে। কিন্তু এ খাতে সক্ষমতা বাড়াতে কোনো পথ দেখানো হয়নি বাজেটে। এক কথায় বিশাল ব্যয়ের এই বাজেট মানুষকে কতটা স্বস্তি দেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য যেসব সাহসী উদ্যোগের কথা এতে তুলে ধরা হয়েছে, তা অর্জন করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কারণ এ বাজেটে ‘বাড়তি’ কর আদায় করতে যেসব নীতিকৌশলের কথা বলা হয়েছে, তাতে জনগণের ওপর চাপ আরও বাড়বে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অর্থমন্ত্রীর আকাঙ্ক্ষা প্রবল হলেও ভিত্তি দুর্বল। কারণ বিশাল ব্যয়ের এই বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা সরকারের নেই। রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব এর জন্য প্রধানত দায়ী।
Manual2 Ad Code
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বিশাল বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। কিন্তু এই বাজেট বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়টি পরিষ্কার করা হয়নি। ‘বাড়তি’ কর আহরণ করতে গিয়ে তিনি যেমন নতুন করে আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের বোঝা চাপানোর প্রস্তাব করেছেন, তেমনি নানা সুবিধা দিয়ে স্বস্তির কথাও বলেছেন। রাজস্ব বাড়াতে বাজেটে তৃণমূল পর্যন্ত ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন তিনি। এছাড়া সকল খুচরা ব্যবসায়ীদের সরবরাহ পর্যায়ে করও বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে টিআইএন। এসব অজনপ্রিয় পদক্ষেপের পাশাপাশি ব্যক্তিশ্রেণি করদাতার আয়করে ছাড় দিয়ে স্বস্তির সুবাতাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। মন্দা বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে ঘোষণা করেছেন অনেক দেশীয় শিল্পের প্রণোদনা সুবিধা অব্যাহত থাকবে।
প্রস্তাবিত বাজেট সবাইকে তুষ্ট করবে বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। বিভিন্ন খাতে করছাড়ের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশীয় শিল্প-উদ্যোক্তারা। প্রস্তাবিত বাজেট উচ্চাভিলাষী এবং ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে মন্তব্য করেছে এনসিপি।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, “বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কল্যাণের বিষয় বিবেচনায় নিয়েই এবারের বাজেট দেওয়া হয়েছে। একটি বিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে দেশকে স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে গিয়ে আগামী দিনে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রচেষ্টা এই বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে।”
Manual6 Ad Code
বাজেট ঘোষণার আগে বলা হয়েছিল, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেবে না বিএনপি সরকার। কিন্তু ঘোষণার পর দেখা গেল এ সুযোগ ফের দেওয়া হয়েছে। বিতর্কিত এ সিদ্ধান্ত হতাশ করেছে সবাইকে।
Manual7 Ad Code
ঘোষিত বাজেটে অনেক আশাবাদের কথা শুনিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বলেছেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে জনগণের শক্তি ও সৃজনশীলতা। সেই সৃজনশীলতা বিকাশের মধ্য দিয়েই গণমানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা হবে।”
সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রবেশ করেন অর্থমন্ত্রী। বেলা ৩টায় বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী, যিনি একই সঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রীও। এর আগে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সংসদ ভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
বাজেটের আকার
প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আদায় হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া কর ব্যতীত প্রাপ্তি থেকে আদায় ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার কোটি টাকা। অনুদান আসবে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। অন্যদিকে প্রস্তাবিত ব্যয় হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই ব্যয় জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে অনুন্নয়ন ব্যয় ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ঠিক করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা; যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক উৎস থেকে এই ঘাটতি মেটানো হবে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। বৈদেশিক উৎস থেকে আসবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী একই সঙ্গে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটও সংশোধন করে নির্ধারণ করেন ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। যার মূল আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা।
প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী সরকার যেভাবে অর্থনীতিকে ধ্বংস করে গেছে তা পুনরুদ্ধার ও গতিশীল করতে সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়। এই সংস্কার সফল করতে হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে অর্থনীতিকে ঢাকা হয়েছে মিথ্যার পরিসংখ্যান আর কথার ফুলঝুরি দিয়ে।’ অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা-পূর্ববর্তী অর্থমন্ত্রীদের চেয়ে ছোট হওয়ায় তা প্রশংসিত হয়েছে।
যা আছে বাজেটে
বিশাল ব্যয়ের বাজেটে স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় বেশি নজর দেন অর্থমন্ত্রী। স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে বরাদ্দ ৩৪ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৯ হাজার কোটি টাকা করেন। স্বাস্থ্য খাতে অতীতে আর কোনো সরকার একলাফে এত বেশি বরাদ্দ বাড়ায়নি। তিনি শিক্ষায় বরাদ্দ ৮৭ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। ফ্যামিলি-কৃষিকার্ডসহ অন্যান্য সামাজিক কর্মসূচির আওতা ব্যাপক বাড়িয়েছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল। শিক্ষাব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যুক্ত করার প্রস্তাব করেন তিনি। পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি বিকাশে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন। এসব উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। বহুল আলোচিত নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা আসায় খুশি হয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকর হবে আংশিক। পর্যায়েক্রমে পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে।
কর প্রস্তাব
কর প্রস্তাবে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে নানা সুবিধা ঘোষণা করেন আমির খসরু মাহমুদ। দেশীয় শিল্প বিকাশের ধারা অব্যাহত রাখতে মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও ল্যাপটপ শিল্পে বিদ্যমান কর সুবিধা পাঁচ বছর অব্যাহত রাখা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে। জ্বালানির সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস হিসেবে এ খাতে কর সুবিধা অব্যাহত রাখা হয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ কমাতে আগামী দু্ই অর্থবছর ব্যক্তিশ্রেণি আয়করে ছাড়ের ঘোষণা করদাতাদের মাঝে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে। পাঁচ বছরের জন্য কর নির্ধারণের আগাম পরিকল্পনায় স্বস্তি পেয়েছেন করদাতারা। করব্যবস্থা সহজীকরণের ঘোষণাও ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিয়েছে। স্থানীয় ও মোবাইল উৎপাদকারীদের জন্য কর সুবিধা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব ইতিবাচক মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাজেট প্রস্তাবে প্রতিবন্ধীদের দিকেও বিশেষ নজর দেন অর্থমন্ত্রী। তাদের ব্যবহারোপযোগী অন্তত ১৫টি পণ্যে অগ্রিম আয়কর তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ৫ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে।
বাজেট প্রস্তাবে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। স্টার্টআপ ব্যবসা প্রসারে এ খাতে ওপর থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। হার্টের রোগীদের জন্য সুখবর দেন অর্থমন্ত্রী। আমদানি করা হার্টের রিং-এর ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবার দিকেও দৃষ্টি দিয়েছেন তিনি। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে উৎসে কর মওকুফ করা হয়েছে। সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দিতে নিত্যপণ্যসহ ৬০টি পণ্যে করছাড়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রত্যাহার করা হয়েছে মোবাইল সিমের কর। পরিবেশবান্ধব গাড়ি ব্যবহার উৎসাহিত করতে ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানিতে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাবও করেন অর্থমন্ত্রী।