প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৯শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কতদিনে?

editor
প্রকাশিত জুন ১৩, ২০২৬, ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ
আলোচিত ধর্ষণ ও হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কতদিনে?

Manual5 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual5 Ad Code

ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পল্লবীর শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারকাজ মাত্র ছয় কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়েছে। আট বছর বয়সী শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মাত্র ১৯ দিনে রায় ঘোষণা হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে এই রায় কার্যকর হওয়ার বিষয়ে আশা প্রকাশ করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী।

দ্রুত সময়ে বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণার পরও প্রশ্ন উঠেছে হাইকোর্টে আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানি এবং সুপ্রিম কোর্টে আপিল ও রিভিউ শুনানি শেষ করে দণ্ড কার্যকরে কতদিন লাগতে পারে। কেননা একটি দণ্ড কার্যকর করতে উচ্চ আদালতে বেশ কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। বিচারিক আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকবে কি না সেই প্রশ্নও রয়েছে। নিম্ন আদালতের দণ্ড উচ্চ আদালতে পরিবর্তন, স্থগিত বা সাজা কম হওয়ার নজির অতীতে রয়েছে।

Manual5 Ad Code

 

এ নিয়ে আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলোতে সাধারণ ট্রাইব্যুনালে রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে তা কার্যকরের জন্য ডেথ রেফারেন্স বা নথি উচ্চ আদালত হাইকোর্টে যায়। আইনের বিধি ও নিয়ম অনুযায়ী আসামিপক্ষ আপিল আবেদন করতে পারে। এরপর পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) প্রস্তুত করা হয়। সরকারি ছাপাখানায় ছাপানো সেই পেপারবুক হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছানোর পর শুনানি শুরু হয়।

 

হাইকোর্টে শুনানির পর রায় ঘোষণা করা হয়। সেই রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ কিংবা আসামিপক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে তারা আপিল বিভাগে যেতে পারেন। আপিল বিভাগের রায়ের পরও তা রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যায়। বিচারিক সব ধাপ শেষ হওয়ার পরও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন আসামি। রাষ্ট্রপতি আবেদন প্রত্যাখ্যান করলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ উন্মুক্ত হয়।

 

সাত দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল

বিচারিক আদালতের রায়ের পর হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স আসার পর আপিলের বিধান কী জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ বলেন, মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করতে হাইকোর্টের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এজন্য ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণের) নথিপত্র হাইকোর্টে আসবে রায় ঘোষণার সাত দিনের মধ্যে। তামাদি আইনের ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হবে সাত দিনের মধ্যে। এরপর যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) প্রস্তুত করে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হবে।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় তিন মাসের মধ্যে কার্যকর করার আশা প্রকাশ করেন। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস (কাজল) বলেন, ‘এটা নিষ্পত্তি করে দণ্ড কার্যকর হতেই পারে। কিন্তু এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

 

তিন মাসের মধ্যে রায় কার্যকর করার ব্যাপারে আইনমন্ত্রীর আশা প্রকাশ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, ‘উনি যদি এমন আশা করেন, তাহলে আইনমন্ত্রীর প্রত্যাশাকে সাধুবাদ জানাই। শুধু আইনমন্ত্রী হিসেবে কেন দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে, আইনজীবী হিসেবে এটা করতেই পারেন।’

সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, ‘আমি তো চাই দুই মাসের মধ্যে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হোক। আর এখন কিন্তু বিচারের অর্ধেক পর্যায়ে। অর্থাৎ কেবল নারী ও শিশু স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ অনুযায়ী এটা এখন ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসবে। এরপর আসামিও আপিল করতে পারেন, সেটা তার বিষয়। কিন্তু আসামি আপিল না করলেও এখন কিন্তু ডেথ রেফারেন্স ২০২৬ সাল শুরুই হয়নি। সম্ভবত ২০১৮-১৯ সালের ডেথ রেফারেন্স চলছে। এর সঙ্গে প্রধান বিচারপতির ইচ্ছা অনুযায়ী যদি হাইকোর্টের স্পেশাল বেঞ্চ গঠন করে দেওয়া হয়, তাহলে তো আরও ভালো। যিনি ভিকটিম, নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে সেও কিন্তু শুধু ন্যায়বিচার পাবে না এখানে সবারই ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।’

এ বিষয়ে সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, ইউজ্যুয়ালি একটি ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে শুনানি শেষ করতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে, মামলার মেরিট বুঝে। পল্লবীর ঘটনার মামলাটি শর্ট মেরিটের। এটা হয়তো পাঁচ-সাত দিন লাগতে পারে। হাইকোর্টের রায়ের পর যদি আসামিপক্ষ আপিল না করে তাহলে রায় কার্যকর করতে সহজ হবে। এরপর, আপিল বিভাগে আবেদন করে যাওয়া না যাওয়ার ইচ্ছা আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের। ডিও প্রসিডিওর এগিয়ে যেতে হবে। সব সময় আবেগতাড়িত হলে চলবে না।

Manual4 Ad Code

 

এ সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের স্পেশাল অফিসার, অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মাজহারুল হক বলেন, তিন মাসের মধ্যেই দণ্ড কার্যকরের বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, নিশ্চয় তিনি জেনে-বুঝে বলেছেন। তবে, আমাদের দিক থেকে আমরা যেটা জানি, এই যে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স আসবে। ডেথ রেফারেন্স আসার পর সেটির পেপারবুক প্রস্তুত করতে হবে।

‘ডেথ রেফারেন্সের পেপারবুক প্রস্তুত করতে মামলার প্রতিটি অক্ষর লিখতে হয়। যদিও পল্লবীর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ঘোষিত রায়ের মধ্যে আশা করা যায়, অল্প কয়েকদিনে বিচার হওয়ায় নথিটি ছোট হতে পারে। আমরা লক্ষ্য করেছি অন্যান্য মার্ডার কেসের, যে সব (ডেথ রেফারেন্স) নথি আসে সেটা ভলিউম ভলিউম হয়। তা হলে পেপারবুক করতে হয় খণ্ড খণ্ড।’

Manual4 Ad Code

স্পেশাল অফিসার জানান, হাইকোর্টের পেপারবুক করতে হয় কমপক্ষে পাঁচ থেকে সাতটি। এগুলো ১০ থেকে ১৫ হাজার পৃষ্ঠার হবে। এর পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন করা হলে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৯ থেকে ১০টি পেপারবুক প্রস্তুত করতে হয়। এখানে বেঞ্চে বিচারকের সংখ্যা বেশি। আইনজীবী রয়েছেন (অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড) অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় রয়েছে।

 

সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মতে, হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স শুনানি করে মৃত্যুদণ্ডের সাজা বহাল রাখতে বা কমাতে পারেন। আইন অনুযায়ী আসামিরাও সাজা থেকে খালাসের জন্য আপিল করতে পারবেন। তামাদি আইনের ১৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে হয়। আপিল করলেই বিচারিক আদালতের সাজা স্থগিত হয়ে যাবে। এটি আইনের বিধান। ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষে রায় ঘোষণা করবেন হাইকোর্ট। এরপর এ মামলার কোনো পক্ষ সংক্ষুব্ধ হলে আপিল করতে পারবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। এখানে আপিল আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। এরপরই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হবে।

ফৌজদারি কার্যবিধির কতিপয় ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে সুপ্রিম কোর্টে আপিলের বিধান করা হয়েছে। আপিল বিভাগে যাওয়ার আগে প্রয়োজন হতে পারে লিভ টু আপিলের (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন)। লিভ টু আপিল গ্রহণ করা হলে আপিল করতে পারবেন সংক্ষুব্ধ আসামি বা বাদীপক্ষ।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৪২ (ক) ধারা অনুযায়ী আপিল নিষ্পত্তি করতে হবে। আপিলের পর ৯০ দিনের মধ্যে সেটি নিষ্পত্তি করতে হয়। আপিলে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করতে পারবেন আসামিরা। দণ্ডবিধির ৫৫ (ক) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আসামিকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।

 

আইনমন্ত্রী যা বলেছিলেন

গত রোববার (৭ জুন) পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, আলোচিত হত্যাকাণ্ড জাতির কাছে অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনার। আমরা তার বাবা-মায়ের কাছে শিশুকে ফিরিয়ে দিতে পারব না, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায় মাত্র ছয় কার্যদিবসের মধ্যে বিচার করতে সক্ষম হয়েছি।

দ্রুত বিচার সম্পন্ন হওয়ার বিষয়ে মন্ত্রী জানান, ১৯ মে’র ঘটনার পর ২৪ মে চার্জশিট দেওয়া হয়। গত ১-১৫ জুন পর্যন্ত আদালতে ছুটি থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি এবং প্রধান বিচারপতির সম্মতিতে শিশু ট্রাইব্যুনালকে ছুটির আওতামুক্ত রাখা হয়। ঢাকা বারের সিদ্ধান্তে আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবী না দাঁড়ালে ২৪ তারিখই রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়, যাতে ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কোনো প্রশ্নবোধক চিহ্ন না থাকে। এরপর চার্জ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন ও যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণা করা হয়।

রায় কার্যকরের সময়সীমা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী সাত দিনের মধ্যে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে যাবে। সেখানে পেপারবুক তৈরি ও শুনানির বিষয় রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ যদি অগ্রাধিকার দিয়ে শুনানি করেন, তবে আমার প্রত্যাশা আগামী তিন মাসের মধ্যে রায় কার্যকর করা সম্ভব।

 

আইনমন্ত্রী বলেন, শিশু হত্যার পাশাপাশি আটকে থাকা অন্য মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে সলিসিটর উইং এবং অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস যৌথভাবে উদ্যোগ নেবে।

শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে সরকারের পদক্ষেপের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আগে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো সাধারণ ট্রাইব্যুনালে যেত। আমরা আইনের রূপান্তর ঘটিয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতার জন্য আলাদা আদালত প্রতিষ্ঠা করেছি, যাতে এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code