প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
১৯শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি

এক পরিবার, এক আইডি: বদলে যাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার চিত্র

editor
প্রকাশিত জুন ১৬, ২০২৬, ১১:১৭ পূর্বাহ্ণ
এক পরিবার, এক আইডি: বদলে যাচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার চিত্র

Manual3 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আমূল পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’ –এই দর্শন সামনে রেখে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রণয়ন করেছে ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬’।

এ নীতিমালার আওতায় আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর একটি সমন্বিত সিস্টেম বা সেন্ট্রাল ডেটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলোকে শনাক্ত করে সরাসরি সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হবে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন (সংশোধন) গাইডলাইন-২০২৬’ চূড়ান্তকরণ এবং ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা-২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা ও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

প্রণীত নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে এবং প্রকৃত অভাবী মানুষের মুখে হাসি ফুটবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নীতিমালা কেবল একটি কার্ড বিতরণ নয়, বরং এটি হবে একটি ডিজিটাল লাইফলাইন।
যেখানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ওয়ান-আইডি এবং ফ্যামিলি ট্রির মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, এতদিন ব্যক্তিভিত্তিক সাহায্য দেওয়া হলেও এখন থেকে পুরো পরিবারকে একটি স্বনির্ভর ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো নারীর ক্ষমতায়ন। ফ্যামিলি কার্ডটি ইস্যু করা হবে পরিবারের মাতা অথবা জ্যেষ্ঠ নারী সদস্যের নামে। এর ফলে পারিবারিক সিদ্ধান্তে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে এবং সম্পদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।

কী থাকছে এই স্মার্ট কার্ডে?

Manual8 Ad Code

প্রস্তাবিত ফ্যামিলি কার্ডটি হবে একটি ‘ডুয়াল ইন্টারফেস স্মার্ট চিপ’ কার্ড। এতে থাকবে–
এনএফসি ও চিপ প্রযুক্তি: যার মাধ্যমে এটিএম বুথ বা পয়েন্ট অব সেলস থেকে টাকা তোলা যাবে।
টাকা-পে অ্যাপলেট: বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিস্টেমের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ ইত্যাদি) থেকে সুবিধাভোগীরা টাকা উত্তোলন করতে পারবেন।
কিউআর কোড: মাঠ পর্যায়ে সুবিধাভোগীর পরিচয় তাৎক্ষণিক যাচাইয়ের জন্য এটি ব্যবহৃত হবে।
অফলাইন ভেরিফিকেশন: ইন্টারনেট না থাকলেও কার্ডের ভেতরে থাকা তথ্যের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

ওয়ান-আইডি ও ফ্যামিলি ট্রি

নতুন এই নীতিমালার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো প্রতিটি সুবিধাভোগী পরিবারের জন্য একটি স্থায়ী ও অনন্য ‘ওয়ান-আইডি’ নম্বর প্রদান করা হবে। ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক বৃক্ষের মাধ্যমে পরিবারের সব সদস্যের তথ্য এই আইডির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এর ফলে একই ব্যক্তি বা পরিবারের একাধিক উৎস থেকে সরকারি সুবিধা নেওয়ার সুযোগ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। এটি আইবাস++, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন ডেটাবেজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে।

উপকারভোগী নির্বাচনে ‘পিএমটি’ স্কোরিং

প্রকৃত অভাবী পরিবার শনাক্ত করতে সরকার ‘প্রক্সি মিস টেস্ট’ বা ‘পিএমটি’ স্কোরিং পদ্ধতি ব্যবহার করবে। পরিবারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, আয়ের উৎস ও জীবনযাত্রার মান বিশ্লেষণ করে একটি স্কোর দেওয়া হবে। এই স্কোরের ভিত্তিতে পরিবারগুলোকে পাঁচটি স্তরে ভাগ করা হবে। সেগুলো হলো– অতি দরিদ্র (শতভাগ অন্তর্ভুক্ত করা হবে), দরিদ্র (অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত), ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং সচ্ছল বা উচ্চবিত্ত (এরা সরাসরি বর্জন বা এক্সক্লুশন তালিকার অন্তর্ভুক্ত)। এছাড়াও ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে হাওর, চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা বা পাহাড়ি এলাকার পরিবারগুলোকে বিশেষ ‘আঞ্চলিক ওয়েটেজ’ বা অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

সরাসরি অর্থ প্রেরণ

মাঝারি কোনো পক্ষ বা দালালের হস্তক্ষেপ ছাড়াই সরকারি কোষাগার থেকে সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যাবে। এর ফলে কোনো কমিশন বা ঘুষ দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। নীতিমালায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো চার্জ ছাড়াই সুবিধাভোগীরা তাদের পাওনা টাকা বুঝে পাবেন।

দেশব্যাপী সমন্বিত পরিবার জরিপ

ফ্যামিলি কার্ডের তথ্যভাণ্ডার তৈরিতে জনশুমারি ২০২২-এর তথ্য অনুসরণ করে দেশব্যাপী নতুন করে জরিপ চালানো হবে। জিও-ট্যাগিং প্রযুক্তির মাধ্যমে সুবিধাভোগীর বসতবাড়ির অবস্থান নিশ্চিত করা হবে। তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা হবে ‘পেপারলেস ডেটা কালেকশন’ পদ্ধতি বা মোবাইল অ্যাপ।

Manual4 Ad Code

কারা পাবেন না এই কার্ড (বর্জন নীতিমালা)

নীতিমালায় কঠোরভাবে কিছু ‘নেগেটিভ লিস্ট’ বা বর্জন নীতিমালা করা হয়েছে। কিছু বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তি বা পরিবার ফ্যামিলি কার্ডের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না– যাদের পিএমটি স্কোর নির্ধারিত সীমার উপরে; সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী (এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীসহ); সরকারি পেনশনভোগী; যাদের নামে ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র বা স্থায়ী আমানত আছে; যাদের পরিবারে চার চাকার মোটরযান (কার, জিপ, মাইক্রোবাস) আছে; যাদের নিবন্ধিত বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আছে; নিয়মিত আয়কর দাতা; যাদের ০.৫০ একরের বেশি চাষযোগ্য জমি বা ৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের অকৃষি জমি আছে।

Manual4 Ad Code

 

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স

ডেটাবেজে কোনো ধরনের অসঙ্গতি বা জালিয়াতি ঠেকাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করা হবে। যদি কোনো পরিবার ভুল তথ্য দিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা শনাক্ত করে ‘ফ্ল্যাগ’ বা ব্লক করে দেবে। এছাড়া লাইভ ফেশিয়াল রিকগনিশনের মাধ্যমে সুবিধাভোগীর অস্তিত্ব যাচাই করা হবে।

অভিযোগ প্রতিকার ও তদারকি

ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে সাধারণ মানুষ সরকারি হেল্পলাইন নম্বর (নম্বরটি পরবর্তীতে নির্ধারিত হবে) বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন। প্রতিটি অভিযোগের বিপরীতে একটি ‘ট্র্যাকিং আইডি’ দেওয়া হবে এবং ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।

বাস্তবায়ন তদারকিতে জাতীয় পর্যায় থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত শক্তিশালী কমিটি থাকবে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মন্ত্রিসভা কমিটি ও জাতীয় কারিগরি কমিটি সার্বিক দিকনির্দেশনা দেবে। মাঠ পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এই কার্যক্রম সমন্বয় করবেন।

ভবিষ্যৎ রূপকল্প

সরকারের লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্য নিরসন ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন করা। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ হবে সেই লক্ষ্য অর্জনের প্রধান হাতিয়ার। এর মাধ্যমে শুধু নগদ অর্থ নয়, বরং ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং কৃষিসহ অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তামূলক সেবাও দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি) মো. সাইফুল হক বলেন, সরকারের ফ্যামিলি কার্ড উদ্যোগ সফল করতে একটি ইন্টিগ্রেটেড নীতিমালা করা হয়েছে। সরকারি সুবিধাভোগীদের সুনির্দিষ্ট করতে মন্ত্রণালয়ের ভাতা সংক্রান্ত সবগুলো কার্ড ব্যবস্থাপনা এই নীতিমালার মধ্যে একীভূত থাকবে, যাতে কেউ ডাবল সুবিধা না নিতে পারে। ফ্যামিলি ট্রি কনসেপ্টের মাধ্যমে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিষয়টি একটি পরিবারের মধ্যে থাকলে সেখানে সুবিধা ভোগী নির্দিষ্ট করা যাবে।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ

সোমবার (১৫ জুন) সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির চতুর্থ সভায় নীতিমালাটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং সমাজকল্যাণ সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ কার্যক্রম তদারকিতে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সক্রিয় ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দেশের দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের জীবনমান উন্নয়ন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যেই এই কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।

Manual1 Ad Code

তিনি বলেন, সরকারের এত বড় ব্যয়ের এই কর্মসূচি কতটা সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে মাঠ প্রশাসনকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩১৫১৬
১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭৩০
৩১  

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code