প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৭ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

এক কারাগারে ১৩ বছরে ৭০ মৃত্যু, ৪২ জনই ফাঁসির বন্দি

editor
প্রকাশিত জুলাই ২৫, ২০২৬, ১০:২২ পূর্বাহ্ণ
এক কারাগারে ১৩ বছরে ৭০ মৃত্যু, ৪২ জনই ফাঁসির বন্দি

Manual1 Ad Code

 

Manual7 Ad Code

প্রজন্ম ডেস্ক:

Manual4 Ad Code

বছরের পর বছর একই কারাকক্ষে বন্দিজীবন, মানসিক অবসাদ, নানা রোগ ও বার্ধক্যজনিত জটিলতায় গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে গত ১৩ বছরে ৭০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ৪২ জনই ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত (ফাঁসি) বন্দি।
২০১৩ সালের ৬ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের ২৮ মে পর্যন্ত সময়ে এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। মৃতদের মধ্যে ৪২ জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এবং ২৮ জন সাধারণ বন্দি ছিলেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষা, আপিল ও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটানো এসব বন্দির মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার কারণে অনেক বন্দির সঙ্গে পরিবার-পরিজনের যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে দিন কাটাতে গিয়ে এই সময়ে দুইজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি আত্মহত্যাও করেছেন।

গত ১৬ জুলাই কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “হাই সিকিউরিটি কারাগারে বন্দি রাখা শুরু হওয়ার (২০১৩ সাল) পর এ পর্যন্ত বার্ধক্যজনিত জটিলতা ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭০ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত (ফাঁসির) বন্দি, যাদের অধিকাংশই আপিল বিচারাধীন ছিল।”

কারা নথি অনুযায়ী জানা যায়, হৃদরোগ, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট, বার্ধক্যজনিত জটিলতাসহ বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় এসব বন্দির মৃত্যু হয়েছে। বন্দিরা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য কারাগারের বাইরে সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাদের ‘ব্রট ডেড’ (Brought Dead) বা হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যু হয়েছে বলে ঘোষণা করেন।

আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মৃত ৭০ বন্দির মধ্যে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগারে বন্দিদের বিদ্রোহের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়া ৬ জনও এই তালিকায় রয়েছেন।

Manual5 Ad Code

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে সর্বশেষ ২৮ মে মারা যান কয়েদি ‘নং-৮১৮৭/এ’ বন্দি মো. আলাউদ্দিন। তার আগে ২ মে মারা যান ‘৬৮৬০/এ’ বন্দি আকবর আলী ওরফে অটো আকবর। ২০২৫ সালে মারা যাওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে ছিলেন কয়েদি নং ‘৫০৫০/এ’ বন্দি সোহরাব ফকির।

নথিতে উল্লেখিত অন্যান্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিরা হলেন— কয়েদি নং-৪৪৩/এ মো. রজব আলী, ২১৬/এ ফরিদ, ৬৬১/এ কামু ওরফে কামরুল, ২৪২/এ আলমগীর, ১৫২৫/এ মির্জা হাবিবুর রহমান, ১১৫২/এ গোপাল করাতী, ১৩১/এ রহিম খান, ১৬১৭/এ নুরুল ইসলাম হাওলাদার, ২৯১১/এ মো. আল আমিন, ৩১৮১/এ ওমর আলী, ৬৭৫/এ সিরাজুল ইসলাম, ৭৪৫/এ বিশারত ওরফে বিশা, ১৪২৯/এ আবদুল গফুর, ৮৪৭/এ আশরাফ আলী ওরফে মালেক, ৩৪৭৪/এ আব্দুর রহিম ওরফে কাচা আবু, ৩৬৫০/এ মো. নজরুল ইসলাম, ৩২৪০/এ আফসার আলী শেখ, ১৯০/এ দুধ মিয়া, ৩৬৯৪/এ হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, ২৭৩৫/এ সামসুল হক ওরফে পাঠা সামসুল, ৪২৬৯/এ সাত্তার প্যাদা, ৪৪১২/এ মো. মাহবুবুর রহমান, ৪২৬৩/এ মো. জনি, ২৪৪৯/এ মো. মুলুক হোসেন ভূঁইয়া, ৪৩২২/এ কান্তি মারাক, ৪৩৩৪/এ লিয়াকত আলী, ৩৭০১/এ সিরাজ প্রামাণিক, ৫০২৭/এ শাহিদ খাঁ, ৫০৪৫/এ গোলাম মোস্তফা, ৩৬১০/এ মো. ডালিম, ৩৬২১/এ কালাম ওরফে নমো কালাম, ৪০৪৮/এ আবু বক্কর সিদ্দিক, ২৫৯৭/এ আমিরুল ইসলাম ওরফে রাশেদ উদ্দিন, ৪২৭৭/এ জহিরুল হক ভূঁইয়া ওরফে জহির মেম্বার, ৪৯৭৬/এ নজরুল ইসলাম, ৫০৪৮/এ সুমন ঢালী ওরফে ডাকু সুমন, ৩৮১৮/এ হেলপার আকরাম, ২১০৯/এ আনোয়ার হোসেন সরকার, ৬০৬৪/এ বদর উদ্দিন ওরফে বদু, ৪৪৯৯/এ রাধে শ্যাম হরিজন জমাদার, ৪৫৯৬/এ মো. আফজাল হোসেন, ৪৬২৩/এ মো. আসলাম হোসেন র‍্যাশ এবং ৫৯০১/এ মহিউদ্দিন ওরফে মহি ফিটার।

 

সারাদেশের কারাগারের চিত্র ও চিকিৎসা ব্যবস্থা

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে মোট দুই হাজার ৭০৮ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত (ফাঁসির) বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে ২ হাজার ৬১৫ জন পুরুষ ও ৯৩ জন নারী।

কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও উন্নয়ন) মো. জান্নাত উল ফরহাদ জানান, তাদের প্রত্যেকের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, “ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার (কেরানীগঞ্জ)-সহ দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দিদের প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল ও চিকিৎসক রয়েছেন। এছাড়া গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত বাইরের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য আনুমানিক ২০ থেকে ২২টি কারাগারে একটি করে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার (কেরানীগঞ্জ) প্রাঙ্গণে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি আধুনিক কারা হাসপাতাল নির্মাণের প্রকল্প বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন।”

কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বর্তমানে একতলা ভবনে একটি কারা হাসপাতাল রয়েছে, যেখানে বহির্বিভাগে রোগী দেখা ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। এখানে একটি ইসিজি মেশিন রয়েছে এবং ছোটখাটো সাধারণ অস্ত্রোপচারও করা হয়। এই হাসপাতালে দুইজন চিকিৎসক ও একজন ফার্মাসিস্টসহ কয়েকজন কর্মী দায়িত্বে রয়েছেন।

কারাগারটির নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স থাকায় চিকিৎসকের সুপারিশ পাওয়ার পর গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত বাইরের সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়।

 

বিচ্ছিন্ন স্বজন, বন্দি কল্যাণ ফান্ড ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

একটি সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন কারাগারে এমন অনেক বন্দি রয়েছেন যাদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। পরিবার থাকলেও অনেকে খোঁজখবর নেন না, ফলে চিকিৎসাসহ সার্বিক দায়িত্ব কারা কর্তৃপক্ষকেই নিতে হয়।

কারা সূত্র জানায়, বন্দিদের এমআরআই, সিটি স্ক্যানসহ জটিল পরীক্ষার ব্যয় কারা কর্তৃপক্ষ বহন করে। সম্প্রতি এক বন্দির বুকে ভালভ প্রতিস্থাপনের ব্যয়ও কারা কর্তৃপক্ষ বহন করেছে। এসব খরচ মেটাতে ব্যবহার করা হয় ‘বন্দি কল্যাণ ফান্ড’, যা পরিচালিত হয় কারাগারের বেকারির লভ্যাংশ দিয়ে। অসচ্ছল ও পরিবার বিচ্ছিন্ন অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসায় এই তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কারা কর্মকর্তারা বলছেন, একজন বন্দি কারাগারে থাকা অবস্থায় তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, আর সে কারণেই জীবন রক্ষায় সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

Manual1 Ad Code

 

চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ও আইনি প্রক্রিয়া

হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যাওয়া রোগীদের বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক (আরএস) ডা. মোস্তাক আহমেদ বলেন, “হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই যেসব রোগীর মৃত্যু হয়, তাদের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ব্রট ডেড ঘোষণা করেন। এর অর্থ হলো, ওই ব্যক্তিকে হাসপাতাল মৃত অবস্থায় গ্রহণ করেছে, তিনি হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা গেছেন।”

তিনি বলেন, “কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করে হাসপাতালে আনা হলেও চিকিৎসকরা গলায় থাকা দাগ দেখে প্রাথমিকভাবে তা শনাক্ত করতে পারেন। একইভাবে শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন থাকলে সেটি নতুন নাকি পুরোনো এবং কতক্ষণ আগে হয়েছে, তা পর্যবেক্ষণ করে চিকিৎসকরা মৃত্যুর কারণ ও পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে ডেথ সার্টিফিকেট, এইটা পুলিশ কেস এমনভাবে উল্লেখ করা থাকে।”

ডা. মোস্তাক আহমেদ আরও স্পষ্ট করেন, “অসুস্থতাজনিত কারণে মারা গেলেও সরকারি হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী ডেথ সার্টিফিকেটে ‘ব্রট ডেড’-এর পাশাপাশি ‘পুলিশ কেস’ উল্লেখ করতে হয়। তবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে স্বজনরা ময়নাতদন্ত না চাইলে পুলিশের লিখিত ছাড়পত্রের ভিত্তিতে ছাড় দেওয়া হলেও কয়েদিদের ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা। কারাগারে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের ক্ষেত্রে মৃত অবস্থায় আনা হলেও আইন অনুযায়ী ময়নাতদন্ত বাধ্যতামূলক।”

কারাগারের পরিবেশে শারীরিক ও মানসিক প্রভাব নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের একজন সাবেক সিনিয়র চিকিৎসক জানান, দীর্ঘদিন বন্দি জীবন শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সীমিত পরিসরে বসবাস, নিরন্তর মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভাবে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, বিষণ্ণতা, অনিদ্রা, গ্যাস্ট্রিক, বাত, চোখ ও শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগ জটিল রূপ ধারণ করে, যা অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

দেশজুড়ে ৭৫টি কারাগারের মধ্যে কেবল একটি কারাগারেই ১৩ বছরে ৭০ জন বন্দির মৃত্যু—দীর্ঘ সময় ধরে আপিল শুনানির অপেক্ষায় থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের জীবনযাপন, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং বন্দিজীবনের মানবিক ও আইনি বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code