৫৩ হাজার মসজিদ-মন্দির উন্নয়নে নতুন এমপি প্রকল্প নিচ্ছে সরকার
৫৩ হাজার মসজিদ-মন্দির উন্নয়নে নতুন এমপি প্রকল্প নিচ্ছে সরকার
editor
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬, ০৯:৪০ পূর্বাহ্ণ
Manual4 Ad Code
Manual2 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
Manual6 Ad Code
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (এমপি) নির্বাচনী এলাকায় ৫৩ হাজার সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়নে দুই হাজার ৫৯০ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক কল্যাণ, ধর্মীয় চেতনা ও সম্প্রীতি জোরদারের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথা বলা হলেও প্রকল্পটি চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায়ও নেই।
অথচ প্রকল্প প্রস্তাবে বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত।
‘সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’ নামের এ উদ্যোগ স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের পুরো অর্থ, অর্থাৎ দুই হাজার ৫৯০ কোটি টাকা সরকারি তহবিল থেকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার উপজেলা ও পৌরসভা এলাকায় মোট ৫৩ হাজার সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণ, সংস্কার বা উন্নয়ন করা হবে।
প্রকল্পের মোট ব্যয়কে প্রস্তাবিত স্থাপনার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে প্রতিটি স্থাপনার পেছনে গড়ে প্রায় চার লাখ ৮৮ হাজার টাকা ব্যয় হবে। তবে এ অর্থের মধ্যে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা উন্নয়ন ব্যয়ই নয়, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, জনবলসহ অন্যান্য ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত।
প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক কল্যাণ, ধর্মীয় চেতনা ও সম্প্রীতি সুসংহত করা, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির চেতনা শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকার সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করতে সামাজিক সমাবেশ, ধর্মীয় আচার বা অনুষ্ঠান আয়োজনে অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।
Manual7 Ad Code
প্রকল্পের আওতায় মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে কোন এলাকায় কী ধরনের স্থাপনা নির্মাণ বা সংস্কার করা হবে এবং সেগুলো নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড কী হবে, তা প্রকল্পের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
প্রকল্পটির প্রক্রিয়া নিয়েও দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। গত ১৬ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ স্থানীয় সরকার বিভাগকে এ বিষয়ে চিঠি দেয়। সেখানে বলা হয়, দুই হাজার ৫৯০ কোটি টাকার প্রকল্পটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপির অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় নেই।
একই সঙ্গে জনবল বিবেচনায় উদ্যোগটি আন্ত মন্ত্রণালয় প্রোগ্রামিং কমিটির সভায় তুলতে প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর গত ২৪ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের সদস্যের সভাপতিত্বে আন্ত মন্ত্রণালয় প্রোগ্রামিং কমিটির বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভার আলোচ্যসূচিতে সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি রাখা হয়। সভায় বিবেচনার জন্য থাকা ১১টি প্রকল্পের মধ্যে দুই হাজার ৫৯০ কোটি টাকার এ প্রকল্পটিই ছিল সবচেয়ে ব্যয়বহুল।
প্রকল্প বাস্তবায়নে শুরুতে মোট ৬৫৮টি পদ ও সেবা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরে অর্থ বিভাগের জনবল নির্ধারণসংক্রান্ত কমিটি তা পর্যালোচনা করে ১০টি পদ এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৫৯৮টি সেবা—মোট ৬০৮ জনবলের সুপারিশ করেছে।
সুপারিশ করা ১০টি পদের মধ্যে প্রকল্প পরিচালক, উপপ্রকল্প পরিচালক, প্রকৌশলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষক ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক রয়েছে। এ ছাড়া আউটসোর্সিংয়ের তালিকায় তথ্য-প্রযুক্তি, পেশাগত, প্রকল্প, কারিগরি, কম্পিউটার, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা রাখা হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য সৃষ্ট কোনো পদই পরবর্তী সময়ে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করা যাবে না। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে এসব পদ বা সেবা বিলুপ্ত হবে। আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ করা হলেও সংশ্লিষ্ট সেবাকর্মীর পারিশ্রমিক সরাসরি তাঁর নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাস্তবায়নের জন্য কোনো জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। তবে প্রকল্পটির কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়নি। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নও পরিচালিত হয়নি। প্রস্তাবে পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা-২০২৩ অনুযায়ী প্রকল্পটি কোনো পরিবেশগত শ্রেণিভুক্ত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে এডিপির তালিকায় না থাকা অবস্থায় প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে শুরু দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই ৫৩ হাজার স্থাপনা নির্মাণ, সংস্কার বা উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকাকে কেন্দ্র করে প্রকল্পটির পরিকল্পনা হওয়ায় বরাদ্দ ও স্থাপনা নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে কোন স্থাপনা কিভাবে নির্বাচন করা হবে, স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে কি না, একই স্থাপনায় একাধিক সরকারি প্রকল্পের অর্থায়ন হচ্ছে কি না এবং নির্মাণকাজের মান কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়। সংসদ সদস্যদের সুপারিশের সঙ্গে স্থানীয় বাস্তব প্রয়োজনের ভারসাম্য রাখাও প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্পটির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, চলমান ‘সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২ প্রকল্প’ জুন ২০২৭ সালে শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রকল্প চালু হবে। সেই আলোকেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প প্রস্তাব করতে একটা বাস্তবায়নকাল দেওয়া লাগে, সেই আলোকেই আগস্ট ২০২৬ কাজ শুরুর সময় দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় জনগণের চাহিদার আলোকে প্রকল্পের স্কিম ঠিক করা হবে।
নতুন এই উদ্যোগের সঙ্গে আগের আওয়ামী লীগ সরকারের ‘এমপি প্রকল্প’-এর মিল রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া ‘সর্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২’ নামের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যা পরে ‘এমপি প্রকল্প’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ওই প্রকল্পের আওতায় কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা, ঈদগাহসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়ন, সংস্কার, মেরামত ও প্রাচীর নির্মাণের সুযোগ ছিল। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুন মাসে শেষ হবে।
Manual7 Ad Code
চলমান এমপি প্রকল্প নিয়ে অবশ্য বিতর্ক কম নয়। আওয়ামী লীগের সময়ে বিভিন্ন এলাকায় সংসদ সদস্যরা নিজেদের মতো করে মসজিদ-মন্দির এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেতাদের নিজস্ব কবরস্থানও উন্নয়ন করেছিলেন। আবার অনেক জায়গায় কাজ শেষ না করেই বিল উত্তোলনের ঘটনাও ঘটেছিল। এসব কারণে নতুন প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।