দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘জাতীয় পে-স্কেল-২০২৬’ অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। নতুন এই স্কেলে কর্মরত ২৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর মূল বেতন শতভাগ বা তার চেয়েও বেশি বাড়ছে। তাদের সঙ্গে সুবিধা বাড়ছে ৯ লাখ পেনশনভোগীরও।
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন স্কেলে প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ছে। ১২ থেকে ২০তম গ্রেডের বেতন বাড়ছে ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। এর ফলে ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে।
বর্ধিত বেতনের আর্থিক সুবিধা চার ধাপে পর্যায়ক্রমে যুক্ত হবে। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের কোষাগার থেকে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।
এই বাড়তি বেতন-ভাতায় সরকারি চাকরিজীবীদের ঘুষ ও দুর্নীতির প্রবণতা কমবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পে-স্কেল নিয়ে আলোচনার সময় কেউ কেউ বলেছিলেন, বেতন বাড়লে সরকারি চাকরিজীবীরা ঘুষ বা দুর্নীতি থেকে কিছুটা হলেও দূরে থাকবেন।
খোদ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও গত ১২ জুন রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থবছরের বাজেট পেশ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘বেতন বাড়লে দুর্নীতি কমার কথা। কারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হলেই দুর্নীতি কমবে।’
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু বেতন বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়। তাদের মতে, দুর্নীতির সঙ্গে বেতন কাঠামোর চেয়ে বেশি সম্পর্ক রয়েছে ব্যক্তির মানসিকতা, সিস্টেম ও জবাবদিহির।
‘বেতন-ভাতা বাড়ালে দুর্নীতি কমার আলামত অতীতেও দেখা যায়নি’
বেতন-ভাতা বাড়ালে দুর্নীতি কমবে, এমন কোনও আলামত অতীতেও দেখা যায়নি, এখনও দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স।
তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি সিস্টেমের কারণে হয়। সিস্টেম যতক্ষণ পরিবর্তন না করা যাবে, এই দুর্নীতি অব্যাহত থাকবে। দুর্নীতি যারা করে তারা সমন্বয় করে নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত ভাগ করে এবং সমাজও এটার সঙ্গে জড়িত। সুতরাং এই সিস্টেম পরিবর্তন ছাড়া এই দুর্নীতি কমবে না।’
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘আমরা অতীতে দেখেছি এমন ঘটনার পর অনেক সময় এই দুর্নীতির রেট আরও বেড়ে যায়। নিজেকে অনেক বেশি দামি ভাবা লোকদের এখন আগের চেয়ে দুর্নীতির রেটটা বেড়ে যাবে। আর দুর্নীতির বাইরেও কিন্তু ভালো মানুষের সংখ্যা আমাদের অনেক আছে। তাদের জন্য এটা অবশ্য সুবিধাজনক হবে। তবে আদতে যারা দুর্নীতিবাজ, যাদের মগজে-মস্তিষ্কে দুর্নীতি, তাদের মধ্যে এটা কমার কোনও আলামত দেখতে পাচ্ছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যথেষ্ট সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেতন-ভাতা বাড়ানোর ব্যাপারে, বাড়ানো তো দরকার। তবে খালি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য না, কারণ বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ শ্রমজীবী মানুষ আছে। এখনও জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা হয়নি এবং তার বাস্তবায়ন নাই, মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়তেছে। সেই জায়গাটাতে জোর দিতে হবে। নয়তো দুর্নীতি কমার কোনও সম্ভাবনা দেখছি না।’
দুর্নীতি কমাতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান আরও বেশি পরিচালনা করা দরকার বলে মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তার মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করছেন কি না, এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়া এবং নজরদারি বাড়ানো দরকার ছিল। কিন্তু সে রকম কোনও আলামত এখনও তারা দেখছেন না।
Manual8 Ad Code
সম্পদবিবরণী প্রকাশের আহ্বান টিআইবির
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মজীবীদের নতুন বেতন-ভাতা কাঠামো বাস্তবায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে সরকারি কর্মজীবী ও পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয়-ব্যয়ের হিসাব বাৎসরিক ভিত্তিতে হালনাগাদ করে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরকারি কর্মজীবীদের বেতন-ভাতা সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রত্যাশা করা অসম্ভব। তবে জনগণের করের টাকায় তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে হলে সব পর্যায়ের সরকারি কর্মজীবী ও তাদের পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয় ও সম্পদের হিসাব বাৎসরিক ভিত্তিতে হালনাগাদ করাসহ প্রকাশের বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন করতে হবে।
‘অর্থাৎ, যে সকল কর্মজীবী তাদের আয়-ব্যয় ও সম্পদবিবরণী প্রতিবছর হালনাগাদ করাসহ প্রকাশ করবেন, কেবল তাদের জন্যই নতুন বেতন-ভাতা বৃদ্ধি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। যারা প্রকাশ করবেন না, তাদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রযোজ্য হওয়া অনুচিত। এই শর্ত বাস্তবায়িত হলে সরকারি খাতে দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত সেবার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সহজ হবে।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অনেক সরকারি কর্মজীবী আছেন যারা অনিয়ম ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন ও সৎভাবে জীবনযাপন করেন। তাদের জন্য এই নতুন বেতনস্কেল সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত ও অপরিহার্য। অন্যদিকে, যারা অসৎভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ-সম্পদ অর্জনে লিপ্ত, তাদের জন্য এই সুবিধা যেমন অযৌক্তিক, তেমনই সম্পূর্ণ নিষ্প্রয়োজন।’
Manual1 Ad Code
তিনি বলেন, ‘তাদের অর্থসম্পদের আকাঙ্ক্ষা এতটাই গগনচুম্বী যে, কার্যকর জবাবদিহির উপায় নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে নতুন বেতনস্কেল প্রয়োগ করা হলে, সরকারি খাতে দুর্নীতির মাত্রা আরও বাড়বে। যার দৃষ্টান্ত ইতিপূর্বে স্থাপিত হয়েছে।’
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘ইতিপূর্বে সর্বশেষ ২০১৫ সালে বাস্তবায়িত অষ্টম পে স্কেলের ক্ষেত্রে যে আশাবাদ ছিল, তা সম্পূর্ণ বিপরীত হয়েছে। বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিপরীতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের ব্যাপকতা ও গভীরতা বেড়েছে অধিকতর হারে। এবার অন্তত তার ব্যতিক্রম হবে—এই বিশ্বাস করতে চাই।’
Manual6 Ad Code
তিনি আরও বলেন, ‘এক্ষেত্রে সরকারি খাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক চর্চায় পরীক্ষিত পদ্ধতি হিসেবে সম্পদবিবরণী প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা না হলে, সরকারি খাতে দুর্নীতির দুষ্টচক্র থেকে জনগণের পরিত্রাণের উপায় নেই। অথচ দুর্নীতির ভুক্তভোগী জনগণের অর্থেই সরকারি কর্মজীবীদের বেতন-ভাতাসহ সকল ব্যয় বহন করা হয়।’
‘বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি কমার কোনও সম্পর্ক নেই’
বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সঙ্গে দুর্নীতি কমার কোনও সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে পিওনরা বেশি দুর্নীতি করে নাকি সচিবেরা! অতীত ইতিহাস দেখলে কিন্তু দেখা যাবে সচিবদের কোটি টাকার দুর্নীতির খবর। যারা দুর্নীতি করে এটা আসলে তাদের মানসিকতার সমস্যা। এটার সঙ্গে বেতন কাঠামো বৃদ্ধির কোনও সম্পর্ক নেই।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আমলে দেখবেন এমপি-মন্ত্রী-সচিবরা হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি করেছে, কিন্তু পিওনরা কয় টাকা দুর্নীতি করেছে! এটা আসলে যাদের জন্য হয়েছে তাদের সংসার চালাতে কষ্ট হয়। ৮ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন হয়েছে, এতে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়ালে কী হবে? দেশে যদি ১৫ লাখ সরকারি চাকরিজীবী থাকে, তাহলে তো ৩০ লাখ বেসরকারি চাকরিজীবীও আছে। তাদের কথা কে চিন্তা করবে? তাদেরও তো বাজার করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার এই বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছে তাদের কর্মচারীদের হাতে রাখার জন্য। অবশ্য এটা অন্তর্বর্তী সরকার এই সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে গেছে। তাই তারা বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে।’
Manual1 Ad Code
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের জিনেই দুর্নীতি। বেতন-ভাতা যতই বাড়ানো হোক, দুর্নীতি কমবে না। দুর্নীতি নীতিতে পরিণত। দুর্নীতি প্রতিরোধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু বেতন বাড়ালে হবে না। সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাকরিজীবীদের নজরদারি করতে হবে। যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তবেই দুর্নীতি কিছুটা হলেও কমবে।’
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘দেখা গেল, অনেকের দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ার পরও লঘু শাস্তি হওয়ায় অন্যরা দুর্নীতি করতে ভয় পায় না। সেজন্য সরকারের উচিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা।’