দেশের এক-দশমাংশ আয়তনের অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি)। সবুজ পাহাড়-পর্বতবেষ্টিত অপার সম্ভাবনার এই ভূখণ্ড নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে স্বার্থান্বেষী চক্র। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে মাঝেমধ্যেই পার্বত্য অঞ্চলে অশান্ত করতে উসকানি-উত্তেজনা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে দায়ী জেএসএস-ইউপিডিএফসহ আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নজরে আনতে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে কৌশলে সামনে আনা হচ্ছে ‘আদিবাসী’সহ নানা ইস্যু।
গত সপ্তাহে তিন দিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এ তথ্য। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ পাহাড়ি বাসিন্দারা খুবই নিরীহ ও সহজ-সরল প্রকৃতির। হাতে গোনা কিছু সুবিধাভোগী আঞ্চলিক সংগঠনের নেতা এবং সার্কেল চিফরা (রাজা) তাদের স্বার্থে সাধারণ বাসিন্দাদের ব্যবহার করছেন। সরকার বা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বিব্রত করতে পাহাড়ি একশ্রেণির বাসিন্দার মধ্যে বাংলাদেশি, উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শব্দকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা চলছে। তাদের অনেকেই সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ‘আদিবাসী’ শব্দ প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হচ্ছেন। অধিকাংশ পাহাড়ি বাসিন্দার জীবনে শব্দাবলি নিয়ে কোনো আগ্রহ বা মাথাব্যথা নেই।
Manual2 Ad Code
ঘুরে যা জানা গেল
গত সপ্তাহে খাগড়াছড়ি এবং রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি বাসিন্দাদের কাছ থেকেও আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সশস্ত্র তৎপরতার ভয়ানক খবর জানা যায়। গত শুক্রবার খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকে যাওয়ার পথে রওনা হলে দীঘিনালায় গিয়েই আটকে যেতে হয়। স্থানীয় পাহাড়ি বাসিন্দারা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে আর সামনে অগ্রসর না হওয়ার পরামর্শ দেন। একপর্যায়ে সামনে আর না এগিয়ে দীঘিনালা বাজারের ‘ভার্মা স্কয়ারে’ আটকে যেতে হয়। সেখানে কথা হয় বেশ কয়েকজন পাহাড়ি বাসিন্দার সঙ্গে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কোথাও পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সমস্যা নাই। সমস্যা সৃষ্টি করে থাকে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী। এর মধ্যে রয়েছে পার্বত্য আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস, ইউপিডিএফসহ অন্য সংগঠনগুলো। অভিযোগ রয়েছে, এরাই পরিকল্পিতভাবে নিজেদের চাঁজাবাজি ও আধিপত্য ধরে রাখতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে, আদিবাসী বিতর্ক তুলে ধরছে ও শান্তিচুক্তিসহ নানা বিষয়ে উত্তেজনার সৃষ্টি করছে।
Manual6 Ad Code
সেখানকার অপর একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ভানু চাকমা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা সবাই শান্তিপ্রিয় মানুষ। এখানে হানাহানি হোক, গোলাগুলি হোক–এটা আমরা কখনোই চাই না। পর্যটক আসেন, আমরা ফলমূল বিক্রি করি। সবাই মিলে ভালো আছি। কিন্তু মাঝেমধ্যেই আমাদের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। তখন সব দিক থেকেই আমরা সমস্যায় পড়ি।’
Manual7 Ad Code
‘আদিবাসী নই, আমরা সবাই বাংলাদেশি’
এ প্রসঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাক সম্প্রদায়ের বাসিন্দা এবং ‘সিএইচটি সম্প্রীতি জোট’-এর আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার থোয়াইচিং মং শাক বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে (সিএইচটি) বাঙালি, চাকমা, মারমাসহ বর্তমানে ১৪টি জাতিগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর আলাদা বা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কিন্তু সবাইকে ‘আদিবাসী’ বলার চেষ্টা করে থাকে কিছু ষড়যন্ত্রকারী। আমরা কেউই উপজাতি না, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী না, আবার আদিবাসীও নই। আমরা সবাই বাংলাদেশি।”
থোয়াইচিং মং শাক বলেন, ‘প্রতি জাতিগোষ্ঠীর আলাদা বা স্বতন্ত্র সাংবিধানিক স্বীকৃতি না দেওয়ার কারণে পাহাড়ের কিছু স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বিতর্কিত (আদিবাসী) শব্দ সামনে আনার চেষ্টা করছে। কিছু সন্ত্রাসী ও গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। পাহাড়ের সাধারণ বাসিন্দারা এ দেশকে ভালোবাসেন।’
ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে কারা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দেশের তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে বর্তমানে প্রায় পাঁচ থেকে ছয়টি আঞ্চলিক সংগঠনের তৎপরতার খবর রয়েছে। এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-সন্তু লারমা বা মূল), জেএসএস (সংস্কার), ইউপিডিএফ (মূল বা প্রসীত খীসা) ও ইউপিডিএফ (সংস্কার) এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সশস্ত্র তৎপরতা রয়েছে। পাশাপাশি তিন জেলার তিনজন সার্কেল চিফ বা রাজা রয়েছেন, যারা এসব আঞ্চলিক সংগঠনের মদদদাতা হিসেবেও পরিচিত। বিশেষ করে রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সার্কেল চিফ ব্যরিস্টার দেবাশীষ রায় ও তার স্ত্রী ইয়েন ইয়েনের বিরুদ্ধে রয়েছে পার্বত্য অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ। সন্তু লারমা, প্রসীত খীসাসহ অন্যদের কর্মকাণ্ডের ওপর তাদের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করে থাকেন। সন্তু লারমা প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন।
পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে ষড়যন্ত্রের প্রশ্নে যা বলছেন গোয়েন্দারা
পার্বত্য অঞ্চলে নিবিড়ভাবে কাজ করা একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অনেক ‘প্রগতিশীল নামধারী’ ও ‘প্রখ্যাত সুশীল বুদ্ধিজীবী তকমাধারী’ ব্যক্তিরা যে চিন্তার চর্চা করেন, তা দেশের স্বার্থের ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত। তাদের অনেকেই সংবিধানে আদিবাসীসহ বিভিন্ন শব্দ যুক্ত করার কূট বিতর্ক চালিয়ে যাচ্ছেন। গোয়েন্দাদের মতে, ওই ব্যক্তিরা ‘জ্ঞানে-অজ্ঞানে’ সুপরিকল্পিত সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। রাষ্ট্র হিসেবে পূর্ব তিমুরের আত্মপ্রকাশ বা রাখাইন রাজ্যের নীল নকশার সঙ্গে তথাকথিত ‘সুশীল সমাজের’ কর্মকাণ্ডের পটভূমিগত মিল রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
গোয়েন্দারা আরও জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামে এনজিওগুলোর কর্মকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন করা জরুরি। পার্বত্য অঞ্চল সারা দেশের এক-দশমাংশ। এখানে ৮০ শতাংশ এনজিওর বিভিন্ন প্রকল্প (প্রজেক্ট) চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু এনজিও তাদের প্রকল্পের অর্থ কোথায় ব্যয় করছে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। এনজিওগুলোর অর্থ ব্যয়ের সঠিক অডিট হলেই সেই তথ্য বের হয়ে আসবে।
রাজনৈতিকভাবে সমাধানের পাশাপাশি সামরিক নিয়ন্ত্রণ জরুরি
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে কথা হয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে। বর্তমানে তিনি মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) এবং আর্মি ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (আইবা) প্রফেসর অ্যাডজাঙ্কট বা চুক্তিভিত্তিক অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল (অব.) ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো বিভিন্ন সশস্ত্র আঞ্চলিক গোষ্ঠীর অব্যাহত কার্যক্রম এবং তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতার পুনরুত্থান। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংঘাতের অবসান। তবে দীর্ঘ সময় পরও অস্ত্র ধারণ, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে। তবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের চেষ্টা থাকলেও কার্যকরী কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো শক্তি, সমর্থন বা অবস্থান তাদের নেই। রাজনৈতিকভাবে এই বিষয়গুলো সমাধান জরুরি। তবে পাশাপাশি জানমালের নিরাপত্তায় শক্ত সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘আদিবাসী বিতর্ক পূর্ণাঙ্গরূপে একটি অনাহুত কূট তর্ক। পশ্চিমা ধারণার সঙ্গে বাংলাদেশের ‘জাতি ধারণা’ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জাতীয়তাবাদ নিয়ে আলোচনার সমাধান অনেক আগেই নিশ্চিত হয়েছে।’
সরকারকে বিব্রত করতে সামনে আনা হয় বাছাইকৃত ইস্যু
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, ‘উপজাতিদের মধ্যে কিছু সন্ত্রাসী বা গোষ্ঠী তিন পার্বত্য জেলায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে তৎপর রয়েছে। এরাই নিজেদের স্বার্থ ও সুযোগ-সুবিধা ধরে রাখার জন্য সরকারকে বিব্রত করতে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন ইস্যু সামনে আনার চেষ্টা করে থাকে।’
ইতিহাস কী বলছে
ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, বিশ্ব অভিবাসনের স্রোতধারায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি গোষ্ঠীগুলো ১৭ থেকে ১৯ শতকের মধ্যে প্রতিবেশী দেশ মায়ানমার (আরাকান), চীনের তিব্বত ও ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম ও আসাম অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে স্থানান্তরিত হয়ে বাংলাদেশের এই অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে। এর মধ্যে চাকমা সম্প্রদায় ১৭ শতকের দিকে, মারমা ১৮ শতকের শেষে (১৭৮৪-এর পর) আরাকান থেকে এসে এখানে বসবাস শুরু করে।
Manual3 Ad Code
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন নম্বর ১৬৯ এবং জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, আদিবাসী (Indigenous) তারা, যারা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে ঔপনিবেশিক শাসন বা অনুপ্রবেশের আগে থেকেই বাস করত। এদিকে বাঙালিরা এই অঞ্চলের প্রাচীনতম ভূমিপুত্র। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী এখানে পরবর্তী সময়ে অভিবাসিত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর গুলশানে এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সব নাগরিকের মূল পরিচয় বাংলাদেশি। ভৌগোলিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতায় দেশে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই, বরং সবাই বাংলাদেশের ‘অধিবাসী’।”
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে সন্তু লারমা, দেবাশীষ রায়সহ আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে মাঝেমধ্যে সন্তু লারমার ভিডিও বক্তব্য বিভিন্ন মাধ্যমে দেখা যায় এবং সেখানে তিনি নিয়মিতভাবে নিজের দায় অস্বীকার করেন। উল্টো সরকারকে দায়ী করে পাহাড়কে অস্থির করতে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে থাকেন।