বোয়িং দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা ও সতর্কতায় নজর বাংলাদেশের
বোয়িং দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা ও সতর্কতায় নজর বাংলাদেশের
editor
প্রকাশিত জুন ১৬, ২০২৫, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
Manual1 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
ভারতের আহমেদাবাদে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিধ্বস্ত হয় এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট এআই-১৭১। বোয়িং ৭৮৭-৮ মডেলের এয়ারক্রাফটটিতে ২৪২ জন আরোহী ছিলেন। দুর্ঘটনায় একজন বাদে ওই ফ্লাইটের সব আরোহী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার পরপরই সারা বিশ্বে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজের সেফটি সিকিউরিটি নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
Manual3 Ad Code
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো অজানা আশঙ্কায় ভুগছেন বাংলাদেশিরাও। কারণ দেশের উড়োজাহাজ সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের সিংহভাগ উড়োজাহাজই হচ্ছে বোয়িংয়ের। আহমেদাবাদে বিধ্বস্ত হয়েছে বোয়িংয়ের অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে থাকা ২১টি উড়োজাহাজের ১৬টিই বোয়িংয়ের। এর মধ্যে ড্রিমলাইনার রয়েছে ৬টি। ইউএস-বাংলার বোয়িং রয়েছে ৯টি।
ড্রিমলাইনার মডেলের কোনো উড়োজাহাজের এভাবে বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। তবে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার সিরিজের সব বিমান নিয়ে আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ার। গত বছরের এপ্রিলে তিনি দাবি করেছিলেন বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার সিরিজের সব বিমানে গুরুতর যান্ত্রিক ত্রুটি রয়েছে। ওই সিরিজের সব বিমান গ্রাউন্ডেড করে ত্রুটি সারানোর পরামর্শও দিয়েছিলেন তিনি। বোয়িংয়ের সাবেক কোয়ালিটি ইঞ্জিনিয়ার স্যাম সালেহপৌর গত বছরের এপ্রিলে সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বোয়িংকে ত্রুটি সারানোর পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার সিরিজের যতগুলো উড়োজাহাজ অপারেশনে রয়েছে, সব পরীক্ষা করা হোক এবং জরুরি ভিত্তিতে ত্রুটি সারানো হোক। যদিও সে সময় বোয়িংয়ের বিমান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তরফে সেসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়।
ঠিক কী কারণে আহমেদাবাদে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে সে সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ওই উড়োজাহাজের ডানাতে কোনো সমস্যা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
Manual7 Ad Code
Manual5 Ad Code
অন্যদিকে ভারত তাদের স্থানীয় বিভিন্ন অপারেটরের অধীনে বিমান পরিষেবা দেওয়া বোয়িং ৭৮৭ এস মডেলের সব এয়ারক্রাফট নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া এয়ার ইন্ডিয়াকে তাদের বহরে থাকা সব বোয়িং ৭৮৭-৮/৯ মডেলের, বিশেষ করে যেগুলোর জিইএনএক্স ইঞ্জিন ব্যবহার করা এয়ারক্রাফটের অতিরিক্ত রক্ষণাবেক্ষণ পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ ক্ষেত্রে টেকঅফ নিরীক্ষা, ইলেকট্রনিক ইঞ্জিন কন্ট্রোল টেস্ট ও ইঞ্জিন ফুয়েল সম্পর্কিত নিরীক্ষা।
তবে দেশের অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও এই খাতের অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়াররা বলছেন, শঙ্কার তেমন কিছু নেই। এই অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার পরও সারা বিশ্বে থাকা বোয়িংয়ের উড়োজাহাজগুলো সঠিকভাবে চলাচল করছে। কোনো ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। এখন পর্যন্ত বোয়িংয়ের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। দেওয়া হলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও সেফটি সিকিউরিটির জন্য দেওয়া বোয়িং এবং আইকাওয়ের নির্দেশনা আরও কঠোরভাবে পালনে জোর দেওয়া হচ্ছে। ব্ল্যাক বক্স পরীক্ষা করার পর জানা যাবে কোন কারণে বোয়িংটি টেকঅফের ৪৫ সেকেন্ডের মধ্যে উড়োজাহাজটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়। এর আগে কিছু বলা যাবে না।
২০২৪ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অন্তত তিনটি বোয়িং এয়ারক্রাফটে নানা ধরনের ত্রুটির কারণে যাত্রা বিঘ্নিত হয়। অন্যদিকে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের আকাশপথে যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা বলছেন, আকাশ পথে চলাচল খুবই সেনসিটিভ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। এমন দুর্ঘটনা মানুষের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে। কেন এমন দুর্ঘটনা ঘটল তা দ্রুত প্রকাশ করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। সেফটি সিকিউরিটির দিকে কঠোর নজরদারি করতে হবে। তবেই আস্থা ফিরে আসবে।
জার্মানি থেকে দেশে ঈদ করতে আসা শামিম বলেন, এমন অত্যাধুনিক উড়োজাহাজের দুর্ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এটি মানুষের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। এটি থেকে বের হয়ে আসতে সময় লাগবে। তারপরও প্রয়োজনে মানুষকে ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হবে।
ইঞ্জিনিয়াররা বলছেন, উড়োজাহাজ টেকঅফের আগে ইঞ্জিনিয়াররা ইনস্পেকশন করে সবুজ সংকেত দিলে পাইলট সেটি গ্রহণ করেন। সামান্যতম ত্রুটি দেখা দিলেও উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়া হয় না। অনেক সময় উড়োজাহাজে যাত্রী উঠে যাওয়ার পরও ত্রুটিমুক্ত না হওয়ায় যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। উড়োজাহাজে সেফটি সিকিউরিটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এরপরও কখনো কখনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়। এটি কারও হাতে থাকে না। অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার পর দেশে সেফটি সিকিউরিটির বিষয়ে আরও জোর দেওয়া হয়েছে। বোয়িংয়ের পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা এলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. মনজুর-ই-আলম বলেন, বোয়িংয়ের অত্যাধুনিক ড্রিমলাইনারের দুর্ঘটনা এটিই প্রথম। অনেকে অনেক কিছুই বলবে কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত আসল কারণ বলা যাবে না। আমরা বোয়িংয়ের নির্দেশনা পুরোপুরি মেনে চলছি। সার্টিফাইড ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা কাজ করা হয়।
তিনি বলেন, উড়োজাহাজ টেকঅফের আগে সেফটি নিশ্চিত করতে আমরা আরও সতর্ক হয়েছি। সাধারণত কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পালনের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। বোয়িংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, এখনও তারা কোনো নির্দেশনা দেয়নি। আশা করি শিগগিরই দেবে। ইনশাআল্লাহ দেশে এই ধরনের সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাপরিচালক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে অ্যাভিয়েশন খাতে কর্মরত। এ বিষয়ে তিনি বলেন, বোয়িংয়ের অত্যাধুনিক প্রোডাক্ট হচ্ছে ড্রিমলাইনার। কোনো উড়োজাহাজ টেকঅফের আগে সার্টিফাইড ইঞ্জিনিয়ার সঠিকভাবে চেক করার পরে পাইলট সেটি গ্রহণ করে এবং টেকঅফ করে।
তিনি বলেন, ভারতে ড্রিমলাইনারটি মাত্র ৩০ সেকেন্ড ওপরে উঠে। এরপর ১৫ সেকেন্ড নিচে নেমে বিধ্বস্ত হয়। এটি খুবই অল্প সময়। উড়োজাহাজটি টেকঅফের সঙ্গে সঙ্গে ‘মেডে’ (জরুরি অবস্থা) ঘোষণা করে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এত অল্প সময়ে দুর্ঘটনাটি ঘটে যে কারও পক্ষে কিছু অনুমান করাও কঠিন। বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের ‘ব্ল্যাক বক্স’ পরীক্ষা করার পরই দুর্ঘটনার সঠিক কারণ বেরিয়ে আসবে।
Manual7 Ad Code
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, এয়ারক্রাফট ডিজাইনিং বা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে কোনো ত্রুটি থাকলে সেটি ১০ বছর পরেও বেরিয়ে আসতে পারে। এটি ম্যানুফাকচারিং ত্রুটির কারণেও হতে পারে। পাশাপাশি মেইনটেন্যান্সের ঘাটতিও কারণ হতে পারে। মেইনটেন্যান্সের সঙ্গে জড়িত ইঞ্জিনিয়াররা আরেকটু সতর্ক হয়ে কাজ করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমে। দুর্ঘটনায় পতিত উড়োজাহাজের ব্ল্যাক বক্স থেকে আসল কারণ উদঘাটন হবে বলে জানান তিনি।