প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

রোহিঙ্গা পাচ্ছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট: ভবিষ্যতে সৃষ্টি হতে পারে নতুন সংকট

editor
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ০৮:৪৮ পূর্বাহ্ণ
রোহিঙ্গা পাচ্ছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট: ভবিষ্যতে সৃষ্টি হতে পারে নতুন সংকট

Manual2 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে বসবাসরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দিচ্ছে সরকার। গত ৬ মাস ধরে দেওয়া এই কর্মকাণ্ডে এখন পর্যন্ত কমবেশি ২১ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট হাতে পেয়েছেন বলে এই প্রতিবেদক কূটনৈতিক সূত্রে নিশ্চিত হয়েছেন। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ‘গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার’ মামলায় রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ হিসেবে অভিহিত করে মিয়ানমারের দেওয়া বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। আবার সৌদির রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। এমন কাণ্ড ভবিষ্যতে নতুন সংকটের সৃষ্টি করতে পারে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-রিয়াদ দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন্ন রাখতে বাংলাদেশ সৌদি আরবে বসবাসরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত সৌদিতে কমবেশি ৩৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য সৌদির জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের কার্যালয় গত ৬ মাস ধরে এই বিষয়ে কাজ করছে। এখন পর্যন্ত ২১ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। বাকিদের বিষয়ে প্রক্রিয়া চলমান।

বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার মূল শর্ত হচ্ছে, যাদের পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে তাদের পিতামাতার বাংলাদেশের পাসপোর্ট থাকতে হবে। ঘটনা হচ্ছে যে রোহিঙ্গাদের এবারই প্রথম বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে না। এর আগেও একবার সত্তর দশকের শেষের দিকে সৌদিতে আশ্রয় (ওই সময়েও রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় এবং তাদের তখন সৌদি পাঠানো হয়) নেওয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়া হয়। ওই সময়ে এই ঘটনার পর সৌদির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিবিড় হয়।

Manual1 Ad Code

সত্তর দশকের শেষের দিকে যখন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়া হয়, তখন সরকারের আমলারা ঘুষের বিনিময়ে অনেক বাংলাদেশি নাগরিককে রোহিঙ্গা বানিয়ে সৌদি পাঠিয়ে দেন। ওই রোহিঙ্গাদের পরবর্তী প্রজন্ম হচ্ছে এই ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা, যারা এখন বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাচ্ছে। আবার অনেক বাংলাদেশি সৌদি গিয়ে নিজের পরিচয় গোপন ও পরিবর্তন করে রোহিঙ্গা সেজে গেছে। এর মূল কারণ হচ্ছে সৌদিতে রোহিঙ্গা, ফিলিস্তিন এবং সিরিয়ার নাগরিক হলে প্রতি মাসে ২০০ রিয়াল (সৌদি অর্থ) মুদ্রার সমান ট্যাক্স মওকুফের সুবিধা পাওয়া যায়। প্রতি মাসে ২০০ রিয়াল ট্যাক্স সুবিধা ছাড়াও সৌদিতে রোহিঙ্গারা সৌদি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের সম্পর্কে যেতে পারেন। এ জন্য অনেকেই বাড়তি সুবিধা পাওয়ার জন্য রোহিঙ্গা সেজেছেন। মূলত তারাই এখন পাসপোর্ট পাচ্ছেন।

Manual5 Ad Code

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বুধবার অনুষ্ঠিত ব্রিফিংয়ে এই প্রতিবেদক প্রশ্ন করেন যে সৌদি আরবে বসবাসরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে কোনো সংকট সৃষ্টি করবে কি না?

জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, যারা আমাদের পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আরবে গেছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ তাদের পাসপোর্ট নবায়নের জন্য আমাদের ওপর চাপ দিচ্ছে। একটি সিদ্ধান্ত যখন নেওয়া হয়, তখন কোনো দেশের প্রেক্ষাপটে সেখানে আরও অনেক স্বার্থ জড়িত থাকে।

আমরা চেষ্টা করেছিলাম, যেন এটা করতে না হয় কিন্তু আমাদের অন্যান্য স্বার্থের কারণে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এই ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেওয়া হবে। তবে পাসপোর্ট দেওয়া মানেই তারা বাংলাদেশের নাগরিক, এমন নয়। যেকোনো দেশের নাগরিককে পাসপোর্ট দেওয়া যায়, এর উদাহরণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রয়েছে। অন্য দেশের নাগরিককেও পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব। আমাদের মূল বিষয় হলো, এই মানুষগুলো মিয়ানমার থেকে এসেছে। তারা এথনিসিটি নিয়ে গবেষণা করতেই পারে, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু বর্তমানে এখানে থাকা ১৩ লাখ মানুষের পূর্বপুরুষরা শত শত বছর ধরে সেখানে বসবাস করে আসছিলেন।

কাজেই তাদের ফেরত নিতে হবে। সারা পৃথিবীই স্বীকার করে যে রোহিঙ্গারা একটি জনগোষ্ঠী, যারা মিয়ানমারের আরাকানের অধিবাসী। আমাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বিষয়টি ডিল করতে হবে। ছোটখাটো টেকনিক্যাল ইস্যুর কারণে এটি আটকে থাকবে না। যদি তাদের ফেরত পাঠানোর মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়, সেটার জন্য আমাদের আরও অনেক কাজ করতে হবে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, ভবিষ্যতে এই রোহিঙ্গারা (সৌদিতে বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়া) অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়ালে বা আইনবহির্ভূত কাজ করলে সৌদি বাংলাদেশকে চাপ দিতে পারে। পাসপোর্ট পাওয়া এই রোহিঙ্গা যদি ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আসতে চায়, তখন কী হবে? আমরা তো সৌদির সঙ্গে এই বিষয়ে চুক্তির বিষয়গুলো জানি না, যা প্রকাশ্য নয়। যদি তারা বাংলাদেশে আসতে চায়, তখন যদি তাদের সরাসরি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠানোর শর্ত চুক্তিতে থাকে তবে তা ঠিক আছে। এমন ঘটনা ভবিষ্যতে অনেক সংকটের সৃষ্টি করতেই পারে।

Manual5 Ad Code

সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল শহীদুল হক এক সময়ে মিয়ানমারে বাংলাদেশ দূতাবাসের সামরিক এটাচে ছিলেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ড. ইউনূস সরকারের ওপর রোহিঙ্গা ইস্যুতে অনেক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু এই সরকার এই বিষয়ে কিছুই করতে পারল না। সৌদির রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার ঘটনায় নতুন ভয় লাগছে। রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়া নতুন ঘটনা নয়।

Manual1 Ad Code

এর আগে ৭০ দশকের শেষ দিকেও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের পাসপোর্ট দিয়ে সৌদিতে পাঠানো হয়। ওই সময়ে পাকিস্তানও একই কাজ করেছিল। কিন্তু পাকিস্তান সাধারণ নাগরিকের মতো পাসপোর্ট না দিয়ে বিশেষ পাসপোর্ট দিয়েছিল কিন্তু বাংলাদেশ তা করেনি। যে কারণে এখন আবার ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে যে এই ইস্যু আরও ভোগাবে না তার নিশ্চয়তা নাই। আবার শুধু সৌদি নয়, আমি লিবিয়াতেও অনেক রোহিঙ্গা দেখেছি যাদের কাছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট রয়েছে। আর এই রোহিঙ্গারা অনেক উগ্র এবং নেতিবাচক। তাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়া হলেও বিশেষ আইডি নম্বর থাকা উচিত। যাতে তাদের সহজেই চিহ্নিত করার যায়।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, সরকার যদি এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তবে তা যথেষ্ট ভয়ংকর সিদ্ধান্ত। এতে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের স্বার্থহানি ঘটবে। বাংলাদেশের এমন আচরণে কার্যত প্রমাণ হয়-বাংলাদেশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আত্মিকভাবে সম্পর্কিত।

সুতরাং মিয়ানমার যেমন দাবি করে যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ বংশোদ্ভূত, তাই প্রকারান্তরে প্রমাণিত হয়। ভবিষ্যতে মিয়ানমার এ উদাহরণ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারে। এতে শরণার্থী প্রত্যাবাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে হয়তো সমগ্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে গ্রহণ করতে আন্তর্জাতিক চাপের শিকার হতে হবে।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code