পুরোনো বৃত্তে নির্বাচনী প্রচারণা—বিষোদগার ও ইতিহাস বিকৃতি
পুরোনো বৃত্তে নির্বাচনী প্রচারণা—বিষোদগার ও ইতিহাস বিকৃতি
editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১১, ২০২৬, ০৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ
Manual2 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
দুয়ারে এসে পড়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শেষ হয়ে গেছে নির্বাচনী প্রচারণার বেঁধে দেওয়া সময়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনীতিতে নতুন বন্দোবস্তের কথা বলা হলেও প্রচার-প্রচারণায় দৃশ্যত পূর্বের সঙ্গে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা ছিল না। এক্ষেত্রে অতীতের মতোই ধর্মের ব্যবহার, পারস্পরিক বিষোদগার এবং এমনকি ইতিহাস বিকৃতির ঘটনাও ঘটছে।
Manual5 Ad Code
তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, অপবাদ, কুৎসা রটনা ও মিথ্যাচারে যেমন দলের তৃণমূল কিংবা মাঝারি পর্যায়ের নেতারা জড়িত, তেমনি পিছিয়ে নেই শীর্ষ নেতারাও; বরং ক্ষেত্রবিশেষে তারা অনেকখানি এগিয়ে। আনুষ্ঠানিক প্রচারণার প্রথম দিনেই, ২২ জানুয়ারি সিলেটের আলিয়া মাদরাসা মাঠে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দিকে ইঙ্গিত করে নানা সমালোচনা করেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। নাম উচ্চারণ না করলেও দলটির বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, মানুষ ঠকানো এবং এমনকি শিরক করার মতো অভিযোগও তোলেন তিনি। পাশাপাশি একাত্তরে দলটির ভূমিকা কী ছিল, সে কথাও ভোটারদের স্মরণ করিয়ে দেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
Manual8 Ad Code
এরপর ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বন্দর স্কুল মাঠে নির্বাচনী জনসভায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা এখান থেকেই হয়েছিল। আপনাদেরই এক গর্বিত সন্তান সবার আগে চিৎকার করে বলেছিলেন—‘উই রিভোল্ট’। তিনি হচ্ছেন এলডিপির সম্মানিত সভাপতি ড. কর্নেল অলি আহমদ, বীর বিক্রম। তিনি জিয়াউর রহমান সাহেবকে হাতে ধরে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। চট্টলাবাসী, আপনাদের স্যালুট। এই গর্বিত ইতিহাসের সূচনা আপনারাই করেছিলেন।”
একই দিনে বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “এক হাতে মায়ের গায়ে হাত দিয়েছেন, আরেক হাতে ফ্যামিলি কার্ড দিয়েছেন। রাখ তোর ফ্যামিলি কার্ড। চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, মামলাবাজ ও নারীদের ইজ্জত হরণকারীদের আপনারা রুখে দেবেন।
” দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ধরনের পারস্পরিক আক্রমণাত্মক বক্তব্য রাজনৈতিক পরিবেশকে যথেষ্ট বৈরী করে তুলেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
Manual3 Ad Code
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার বলেন, “নির্বাচনী প্রচারণায় আমরা আসলে কোনো পরিবর্তন দেখতে পাইনি। বরং প্রার্থীরা একে অপরের বিরুদ্ধে যে মিথ্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে, তা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় কোনো অংশেই কম নয়। পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো তো বটেই, নতুন বন্দোবস্তের কথা বলা দলগুলোর আচরণও জাতিকে হতাশ করেছে। তাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে নির্বাচনী পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রে মারমুখী ও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এবারে নতুন প্রজন্মের কিছু নেতার শব্দচয়ন এতটাই অশালীন ও অমার্জিত, যা সত্যিই উদ্বেগজনক।”
এক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ইঙ্গিত করে ‘জবান’ সম্পাদক রেজাউল করিম রনি বলেন, কেবল নির্বাচনী প্রচারণা নয়, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ের শুরু থেকেই একটি মহল যেকোনো ইস্যুতে—যেমন পুরোনো ঢাকায় পাথর দিয়ে মানুষ হত্যা, বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা এমনকি মৃত্যু, কিংবা তারেক জিয়ার দেশে ফেরা না ফেরা; সব ক্ষেত্রেই বিএনপিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শীর্ষ নেতৃত্ব সভ্যতার সব সীমা অতিক্রম করেছেন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির বলেন, সব দায় জামায়াত কিংবা এনসিপির ওপর চাপানো ঠিক হবে না। বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির প্রচারণা কৌশলও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মানুষ এখন আর এসব গ্রহণ করে না। গত ১৭ বছর ধরে এ ধরনের আওয়ামী বয়ান শুনে দেশের মানুষ ত্যক্ত-বিরক্ত। সাধারণ জনগণ এখন আগামীর কথা শুনতে চায়।
তবে এ বিষয়ে রেজাউল করিম রনির মত ভিন্ন। তার মতে, বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রিকারী কোনো দল নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধে বিশ্বাসী ও তা বাস্তবায়নকারী একটি রাজনৈতিক শক্তি। আওয়ামী ন্যারেটিভ অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধকে অতিসংবেদনশীল করে তোলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টাও জাতির জন্য কল্যাণকর নয়। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রিকারী আওয়ামী রাজনীতি যদি ফ্যাসিজম হয়, তবে ’২৪-এর জুলাই চেতনা বিক্রিকারীদের রাজনীতি হচ্ছে আল্ট্রা-ফ্যাসিজম।’
এনসিপি সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, নতুন ধারার রাজনীতির কথা বললেও তারাই পুরোনো ও বস্তাপচা প্রচারণা কৌশল গ্রহণ করেছে।
তবে এনসিপি নেতাদের বিষয়ে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির বলেন, এসব তরুণই জীবন বাজি রেখে জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বয়স কম হওয়ার কারণে কেউ কেউ রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্ব হতে পারেন। সেক্ষেত্রে সবাই মিলে তাদের নার্সিং করা প্রয়োজন।
তার মতে, বিএনপির উচিত ছিল আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন তরুণকে কিছু আসনে ছাড় দেওয়া। এ প্রসঙ্গে তিনি মির্জা আব্বাসের প্রশংসা করে বলেন, চাইলে তিনি প্রতিদিনই অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারতেন, কিন্তু তা করেননি। একই সঙ্গে তিনি বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলকেই আক্রমণাত্মক বক্তব্য পরিহারের আহ্বান জানান।
Manual4 Ad Code
নির্বাচনী প্রচারণায় রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দিলীপ কুমার সরকার কিছুটা স্বস্তি প্রকাশ করে বলেন, আশঙ্কার তুলনায় সহিংসতার ঘটনা কম ঘটেছে। তবে ডান, বাম, মধ্য কিংবা উদারপন্থি—এমনকি নতুন প্রজন্মের প্রার্থীদের মধ্যেও প্রচারণায় ধর্ম ব্যবহারের একটি অদ্ভুত মিল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি বলেন, তাদের পোশাক-আশাক, চলন-বলন ও প্রকাশভঙ্গি প্রায় একই রকম।
ভোটের মাঠে কর্মী-সমর্থকদের চাঙা রাখতে রাজনৈতিক দলের মধ্যে বাদানুবাদ, যুক্তি-পাল্টা যুক্তি ও বিরোধিতা স্বাভাবিক এবং গণতন্ত্রের সৌন্দর্যও বটে। তবে বিরোধিতা যেন বৈরিতা কিংবা শত্রুতায় রূপ না নেয়—এই প্রত্যাশাই বিশিষ্টজনসহ সবার।