প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

২০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৫ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৯ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

নতুন সরকারের সামনে যত কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

editor
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১০:০০ পূর্বাহ্ণ
নতুন সরকারের সামনে যত কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

Manual5 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

নতুন সরকারের শপথের মাধ্যমে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে মরচে ধরা সম্পর্ক উন্নয়ন, যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত নীতি সামলানো ও দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলাসহ নতুন সরকারকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Manual5 Ad Code

আওয়ামী লীগ সরকারের একপেশে ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ব্যর্থ পররাষ্ট্রনীতির যুগ পেরিয়ে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতা নিচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকারের জন্য এখন প্রয়োজন সুসংগত কূটনীতি ও কার্যকর অর্থনৈতিক পরিকল্পনা- যাতে দেশের স্বার্থ সর্বোচ্চভাবে রক্ষা করা যায়।

 

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছে, নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে বা আগের সমস্যাগুলো রয়ে গেছে। তবে বেশিরভাগ সহযোগী দেশের সঙ্গে যোগাযোগ আগে থেকেই রয়েছে, তাই শুরুটা একেবারে শূন্য থেকে করতে হবে না।’

 

তিনি বলেন, ‘ভারসাম্যপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ ও বাস্তবমুখী কূটনীতি অনুসরণ করলে বড় সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম।’

 

Manual4 Ad Code

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওবায়দুল হক বলেন, ‘নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতি।’

Manual7 Ad Code

তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ বাড়ানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং আরও বেশি বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আনা এখন অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। শুধু বিদেশি বিনিয়োগ নয়, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। অর্থনীতি শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।’

 

 

বিশ্লেষকরা আরও বলেন, নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা, তারপর একটি সুস্পষ্ট কৌশল নির্ধারণ করা। একক ব্যক্তি বা একক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া এখন আর কার্যকর নয়। সবাইকে শুনতে হবে, বিশেষজ্ঞ মতামত নিতে হবে।

ওবায়দুল হক বলেন, ‘যোগ্য মানুষকে তাদের দক্ষতার জায়গায় নিয়োগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। যারা অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন এবং জটিল বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম, তাদের দায়িত্বে আনা উচিত।’

 

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত রাখা প্রধান চ্যালেঞ্জ

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ মনে করেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় তলানিতে পৌঁছেছিল। এটিকে পুনরুজ্জীবিত করা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’

‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মানে এই নয় যে ভারতের সব কথা মেনে নিতে হবে। তবে বাস্তবতা হলো—দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্ক দীর্ঘদিন খারাপ থাকলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কাজেই অতীতের কিছু বিষয়—যেমন আগের প্রধানমন্ত্রী ও কিছু নেতার ভারতে অবস্থান—এসব ইস্যু অগ্রাধিকার না দিয়ে সামগ্রিক সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত,’ বলেন রাষ্ট্রদূত ফয়েজ আহমেদ।

 

তবে নির্বাচনের আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এসে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এছাড়া নির্বাচনে জয়ের পরপরই তারেক ও তার দল বিএনপিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং সহযোগিতার অঙ্গীকার করেছেন।

 

মুন্সি ফয়েজ মনে করেন, ‘এসব ইঙ্গিত দেয় যে সম্পর্ক পুরোপুরি অচল হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘সরকার সতর্কতার সঙ্গে এগোলে পরিস্থিতি অতটা জটিল হবে না। একসময় ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া যেত, কিন্তু এখন সেই বাস্তবতা বদলেছে। ক্ষমতার বাইরে থেকে কিছু বলা যায়, ক্ষমতায় গেলে দায়িত্বশীল হতে হয়। বিএনপির মধ্যে এমন অভিজ্ঞ মানুষ আছেন যারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় পারদর্শী, তাই বিষয়টি যত বড় সমস্যা বলে মনে হচ্ছে, বাস্তবে হয়তো ততটা বড় নয়। তবে এটিই প্রধান কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ওবায়দুল হক বলেন, ‘নতুন সরকারের জন্য শুধু ভারত, চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত ফোকাস করা উচিত নয়। এগুলো অনিবার্য বাস্তবতা, তাই কৌশলগতভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মানে ভারতের সব কথা মানা নয়; বরং পারস্পরিক সহযোগিতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে হবে।’

 

সাবেক রাষ্ট্রদূত ফয়েজ আহমেদও বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান ও প্রতিদানভিত্তিক হওয়া উচিত। পানি, বাণিজ্য ও অন্য বিষয়ে বাংলাদেশের ন্যায্য উদ্বেগ স্বীকৃতি পেলে অনেক চ্যালেঞ্জ সহজে দূর হবে।’

এর আগে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার দিন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, আমাদের পদ্মা, তিস্তা নদীসহ বিভিন্ন নদীর পানির বণ্টনে আমাদের কিছু অসুবিধা আছে। আমরা চাই যাদের সঙ্গে আমাদের এই অসুবিধা আছে তাদের সঙ্গে বসে আলোচনা করে সমস্যার সমাধান করতে। যাতে আমার দেশের মানুষ তার পানির ন্যায্য হিসাব পেতে পারে।’

এদিকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পর শনিবার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এসে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ ঠিক রেখে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের কথা বলেছেন।

Manual3 Ad Code

 

তিনি বলেন, ‘দেশের স্বার্থ, দেশের মানুষের স্বার্থ আমাদের কাছে প্রথম। বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থ ঠিক রেখে আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবো।’

এ সময় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘কোনো একক দেশের প্রতি আনুগত্য নয়- পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতেই ঠিক হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি।’

বিশ্বব্যাপী পরিবর্তন ও বহুমুখী কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওবায়দুল হক বলেন, ‘অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার বাইরে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা। ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকটসহ সাম্প্রতিক বিশ্বজুড়ে ঘটেছে এমন ঘটনা যা নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘পরিচিত ‘রুলস-বেজড অর্ডার’ ভেঙে পড়ছে বা রূপান্তরিত হচ্ছে। সম্পর্কগুলো আরও বেশি লেনদেননির্ভর হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, লাতিন আমেরিকা, আর্কটিক অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়া—সব জায়গায় নতুন শক্তির ভারসাম্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশকে নিজের অবস্থান বুঝে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশকে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না। সহযোগী দেশগুলোর বেশিরভাগই বিএনপি ও অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। বিদ্যমান সহযোগিতা চালু থাকবে এবং নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্রও তৈরি হবে।’

একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গে মুন্সি ফয়েজ বলেন, ‘বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত আনপ্রেডিক্টেবল। তিনি একদিন এক কথা বলেন, আরেক দিন আরেক কথা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রচলিত রীতিনীতির তোয়াক্কা না করেই সিদ্ধান্ত নেন—এমন নজির রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে।’

তবে সম্পর্ক কেবল রাষ্ট্রপ্রধানের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন স্তরে সংলাপের সুযোগ রয়েছে। সেসব প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগিয়ে সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখতে হবে।’

তার মতে, সম্প্রতি ঢাকা-ওয়াশিংটনের মধ্যকার স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিটিও ভালোভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

যদিও নির্বাচনের প্রাক্কালে চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়াকে তিনি সময়োপযোগী মনে করেন না, তবুও চুক্তির ইতিবাচক দিকগুলো কাজে লাগাতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

একসঙ্গে রাশিয়া, চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তানসহ অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ অবস্থায় নেই, তবে নতুন সরকারকে এগুলোকে নতুন গতি দিতে হবে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code