নতুন সংসদ সদস্যদের শপথের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরাও শপথ নিয়েছেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—রাষ্ট্রপতি পদে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, এবং এলে কবে ও কীভাবে।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। তিনি পদে থাকাকালীন আইনগতভাবে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ নেই। সংবিধান অনুযায়ী, তিনি পদত্যাগ না করলে বা অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারিত না হলে নতুন কেউ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিতে পারবেন না।
আইনজীবী ও সংবিধান বিশ্লেষক কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, সংবিধানে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। পদ শূন্য হলেই কেবল নতুন সংসদ এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত; অনেকেই পদটিকে ‘আলংকারিক’ বলে উল্লেখ করেন। তবে রাজনৈতিক সংকট বা নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতির গুরুত্ব বাড়ে। উদাহরণস্বরূপ, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে গেলে এবং সংসদ ভেঙে গেলে রাষ্ট্রপতিই একমাত্র সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্বে থাকেন।
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে পারেন এবং এই ক্ষেত্রে আইনি দিক থেকে কারও পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। বাস্তবে এই ক্ষমতা খুব বেশি প্রয়োগ হয়নি।
রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার ভিত্তিতে ‘জুলাই সনদ’ তৈরি হয়েছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় কিছু সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথ খুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা কমানো এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো।
Manual2 Ad Code
প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রপতি মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে কাজী জাহেদ ইকবালের মতে, এসব কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন, যা সময়সাপেক্ষ।
রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হয় যেভাবে
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর এবং একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইবার এ পদে থাকতে পারেন।
রাষ্ট্রপতির পদ তিনভাবে শূন্য হতে পারে—মেয়াদ পূর্ণ হলে, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে অথবা অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারিত হলে। শারীরিক বা মানসিক অক্ষমতা কিংবা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগেও অভিশংসনের প্রক্রিয়া শুরু করা যেতে পারে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি না পদত্যাগ করেন, না অপসারিত হন।
গত ডিসেম্বর মাসে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিজেকে ‘অপমানিত’ মনে করার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি পদে বহাল থাকেন।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিনের নিয়ম
Manual3 Ad Code
সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন। প্রার্থী হতে হলে বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন আয়োজন করে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে তফসিল ঘোষণা করা হয়।
Manual7 Ad Code
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মেয়াদ শেষের কারণে পদ শূন্য হলে মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একজন প্রার্থীর মনোনয়নের জন্য দুইজন সংসদ সদস্য প্রয়োজন—একজন প্রস্তাবক ও একজন সমর্থক। একমাত্র প্রার্থী থাকলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয় না।
Manual4 Ad Code
তফসিল ঘোষণার পর সংসদ অধিবেশন চলাকালে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। যদি অধিবেশন না থাকে, তবে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে প্রজ্ঞাপন জারি করে অন্তত সাত দিন আগে অধিবেশন আহ্বান করতে হয়।
১৯৯১ সালের আগে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান ছিল। সংসদীয় পদ্ধতিতে ফিরে আসার পর সেই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনের প্রশ্নটি সামনে আসতে পারে। রাষ্ট্রপতি যদি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন, তাহলে অভিশংসনের প্রয়োজন হবে না। যেহেতু তিনি আগেই সরে যাওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন, তাই এ ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন কেউ কেউ।
তবে সংসদের প্রথম অধিবেশন এখনো শুরু হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, সেই অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুব বেশি নেই। সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন হবে কি না, তা নির্ভর করছে বর্তমান রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত এবং সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়ার ওপর।