রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে যথাসম্ভব দ্রুত বিদায় দেওয়ার সম্ভাব্য প্রক্রিয়া ও পথ নিয়ে আলোচনা চলছে নতুন সরকারের নীতিনির্ধারক মহলে। এ ক্ষেত্রে একটি প্রক্রিয়া হতে পারে, দ্রুত সংসদ অধিবেশন আহ্বান করে স্পিকারÑডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর স্পিকারের কাছে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করার সুযোগ তৈরি করা। তবে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটেও তার বিদায় কিংবা অপসারণের ঘটনা ঘটতে পারে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনার জন্য অতি সম্প্রতি সংসদ সচিব কানিজ মওলাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে ২৬ ফেব্রুয়ারি সংসদের অধিবেশন আহ্বানের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা হয়। সংসদ সচিব জানান, সংবিধানের বিধান অনুযায়ী আগামী ১৭ মার্চের মধ্যে অধিবেশন আহ্বানের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সরকার গঠনের পরপরই এত দ্রুত সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা সম্ভব নয়। তবে জাতীয় সংসদের অধিবেশনের জন্য সংসদ সচিবালয় প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়ে এসেছেন কানিজ মওলা।
ইতোমধ্যে সংসদ সচিবালয় ৫ আগস্টের পর সংসদের ভাঙচুর-লুটপাটের ঘটনার ক্ষত অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছে। সংসদ পরিচালনার ‘মেইন কম্পোনেন্ট’ এসআইএস সিস্টেম সংস্কার করা হয়েছে। সংসদের প্লেনারি হলসহ অন্যসব অফিস সংস্কার করে অধিবেশনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অধিবেশনের প্রস্তুতি নিয়ে সংসদ সচিব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, তথ্য অধিদপ্তরসহ বেশকিছু সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন।
সংসদ আহ্বানের সময়কাল ও সংবিধান
সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন শুরুর স্থান ও সময় নির্ধারণ করে দিয়ে থাকেন। একইভাবে তিনি সমাপ্তি সম্পর্কিত সিদ্ধান্তও প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানিয়ে থাকেন। সংবিধানের ৭২ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘যে কোনো সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হইবার ত্রিশ দিনের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ আহ্বান করা হইবে।’ বর্তমান সংসদের সদস্যরা শপথ নিয়েছেন ১৭ ফেব্রুয়ারি। সে হিসেবে প্রথম অধিবেশন বসতে হবে ১৭ মার্চের মধ্যে। রাষ্ট্রপতিকে সরানোর জন্য বর্তমান সরকার এত দেরি করতে চায় না।
সাধারণত জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার অন্তত ১৫ দিন আগে রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করে থাকেন। সংসদ সদস্যদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদের অধিবেশন আহ্বান সম্পর্কিত নোটিস পাঠানো হয়ে থাকে, যাতে তারা প্রস্তুতি নিতে পারেন। তবে জরুরি প্রয়োজনে এই সময়সীমা কমও হতে পারে। আজ রোববার রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে চলতি রমজান মাসের মধ্যেই সংসদের প্রথম অধিবেশন বসবে, এমন আশা করা যায়।
অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রদান অনিশ্চিত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশন হবে শীতকালীন অধিবেশন। এ অধিবেশন সাধারণত জানুয়ারি মাসের মধ্যেই শুরু হয় এবং রাষ্ট্রপতি তার বর্ষশুরুর ভাষণ দিয়ে থাকেন। সরকারের বিগত এক বছরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ থাকেন এই ভাষণে। ভাষণটি সাধারণত মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয়ে থাকে। নির্বাচনের কারণে কিছুটা দেরিতেই বসছে সংসদের শীতকালীন অধিবেশন। তবে বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, এই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন কি না তা এখনও নিশ্চিত নয়।
Manual7 Ad Code
প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ডিসেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের পর তার মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে পদত্যাগ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন-পরবর্তী নতুন সরকারের শপথ পড়িয়ে অনেকটাই ভারমুক্ত তিনি। আপাতত সংসদ অধিবেশন আহ্বান করা ছাড়া আর তার বড় কোনো সাংবিধানিক দায়িত্ব নেই। এর আগে সরকারি দল বিএনপিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ না নেওয়ার আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু সাংবিধানিক ব্যত্যয় ঘটবে, এমন বাধ্যবাধকতা থেকে শেষ পর্যন্ত মো. সাহাবুদ্দিনের কাছেই শপথ নেন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার।
এর আগে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের কাছে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। সাংবিধানিক ব্যত্যয় ঘটে বলে তারা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য’ হিসেবে শপথ নেননি। এর যুক্তি হিসেবে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন; সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নয়।
সংবিধান ও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের সম্ভাব্য পথ
সংবিধানের ৫০ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। অভিশংসন বা শারীরিক/মানসিক অক্ষমতার কারণেও তিনি অপসারিত হতে পারেন। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের জন্য সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠের নোটিসে স্পিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যায়। এ ছাড়া শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে তাকে অপসারণ করা সম্ভব। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে বা অপসারিত হলে নতুন রাষ্ট্রপতি না আসা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকারের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের বিধান রয়েছে।
Manual6 Ad Code
একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় সংসদের অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন। এর ফলে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রে পদত্যাগ করার সুযোগ পাবেন। সরকারের পক্ষ থেকে তাকে পদত্যাগ করে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। এতে তিনি সম্মত না হলে সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের নোটিসে তাকে অভিশংসন করার সুযোগও রয়েছে তাদের হাতে। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা বর্তমান সংসদে বিএনপির রয়েছে। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে ইতঃপূর্বে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। এর আগে অষ্টম জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে অভিশংসন করেছিল বিএনপি।
Manual3 Ad Code
রাষ্ট্রপতিও চাইছেন বিদায় নিতে
গত বছরের ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচনের পর তার মেয়াদ পূর্ণ না হলেও পদত্যাগ করার কথা জানিয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকার তার সঙ্গে যথাযথ আচরণ করছে না, এমন অভিযোগ তুলে তিনি তার এই মনোভাবের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘আমি পদত্যাগ করতে অত্যন্ত আগ্রহী। আমি ক্ষমতা ছাড়তে আগ্রহী। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত আমার দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাওয়া উচিত। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতি হওয়ায় আমি আমার অবস্থান ধরে রাখছি।’
তিনি অভিযোগ করেছিলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস প্রায় সাত মাস ধরে তার সঙ্গে দেখা করেননি, তার প্রেস বিভাগ কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিশ্বের সকল বাংলাদেশি দূতাবাস থেকেও তার প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তিনি তখন বলেন, ‘সমস্ত কনস্যুলেট, দূতাবাস এবং হাইকমিশনে রাষ্ট্রপতির ছবি ছিল। এক রাতেই হঠাৎ করে এগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। মানুষের কাছে একটি ভুল বার্তা যাচ্ছে যে, সম্ভবত রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হচ্ছে। আমি অত্যন্ত অপমানিত বোধ করছি।’
অভিযোগ পাশ কাটিয়ে সেফ এক্সিট?
এর মধ্যে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সরকার শপথ নিয়েছে এবং তার চারটি কার্যদিবসও পেরিয়ে গেছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইতোমধ্যে কোনো কনস্যুলেট, দূতাবাস এবং হাইকমিশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের প্রতিকৃতি পুনরায় স্থাপন করা হয়নি। নির্বাচিত সরকারের কাছেও তিনি বিশেষ কোনো মর্যাদা পাচ্ছেন না। তার ওপর গত কয়েক দিন ধরে আলোচনা হচ্ছে, ইসলামী ব্যাংকে পরিচালক এবং দুদকের কমিশনার থাকার সময় তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ এবং মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম ইস্যু। তবে এসব অভিযোগ উপেক্ষা করে বিএনপি তাকে ‘সেফ এক্সিট’ দিতে পারে। তিনি পদত্যাগ করে চলে গেলে হয়তো বিষয়গুলো আমলে না-ও নেওয়া হতে পারে।
এদিকে সর্বশেষ মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের সময় রাষ্ট্রপতির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর যে আনুষ্ঠানিকতা থাকে, তা দৃশ্যমান হয়নি। শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শ্রদ্ধা জানানোর পর অনেক সময় অপেক্ষা করেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেখা না পেয়ে চলে যান। এর পর প্রধানমন্ত্রী শহীদ মিনারে এসে ১২টা ৫ মিনিটে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
Manual3 Ad Code
এদিকে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার আগেই নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন সিনিয়র দুই নেতা ও সাবেক দুই মন্ত্রী ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপি ও ড. মঈন খানÑ এ দুজনের কেউ এ পদে উঠে আসতে পারেন। অনেকের ধারণা, এদের একজনকে রাষ্ট্রপতি এবং অন্যজনকে জাতীয় সংসদের স্পিকার করা হতে পারে। যিনি স্পিকারের দায়িত্বে আসবেন, তিনিও প্রয়োজনে স্বল্প সময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ বিএনপি যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন দুজনেরই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে।