ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এবার আলোচনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ঈদের পর দেশব্যাপী শুরু হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মহাকর্মযজ্ঞ।
প্রথমে ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজন করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরপর ধারাবাহিকভাবে বাকি সিটি নির্বাচন, পৌরসভা ও জেলা-উপজেলাসহ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজন করবে ইসি। এর আগে রোজার মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন এবং রোজার শেষদিকে বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে কমিশন।
Manual1 Ad Code
রমজানের শেষে সিটি নির্বাচনের তফসিল : ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা না থাকায় প্রতি মুহূর্তে ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক সেবা। এ জন্য রমজানের পরপর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
Manual3 Ad Code
ইসির নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য চিঠি এসেছে। বিষয়টি কমিশনে উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের পাঠানো পৃথক দুই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২০ সালের ২ জুন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে হিসেবে গত বছরের ১ জুন এ সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। আর ২০২০ সালের ৩ জুন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ জুন।
এ ছাড়া ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় সে হিসেবে এ সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গতকাল। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী প্রথম সভার তারিখ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর একটি সিটি করপোরেশনের মেয়াদ গণনা করা হয়। মেয়াদ পূর্তির পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে আলোকে তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
Manual4 Ad Code
এদিকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকারগুলোতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ঈদের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো ধারাবাহিকভাবে সম্পন্ন করা হবে। রমজানের শেষের দিকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল হয়ে যাবে।
অর্থাৎ কুরবানি ঈদের আগে সিটি নির্বাচন হয়ে যাবে। এরপর ধাপে ধাপে সব স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয়ে যাবে। সারা বছরই নির্বাচন হবে। সব নির্বাচন এক বছরেও শেষ করতে পারব কি না সন্দেহ আছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ধাপে ধাপে হয় সে ক্ষেত্রে সময়ের ব্যাপার আছে। উপজেলা নির্বাচনে সময়ের ব্যাপার। অনেক পৌরসভা খালি হয়ে বসে আছে। সবই ধাপে ধাপে করা হবে। তবে এখানে আবহাওয়ার একটা বিষয় আছে। কারণ ওই সময়ে বৈরী আবহাওয়া থাকবে।
কোন উপায়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন : রোজার পর অনুষ্ঠিত হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তবে সেই নির্বাচন দলীয় নাকি নির্দলীয়ভাবে হবে সে সিদ্ধান্তের জন্য সংসদের দিকে তাকিয়ে আছে নির্বাচন কমিশন। কারণ সদ্যবিলুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় নির্বাচন আগের মতো নির্দলীয়ভাবে সম্পন্ন করার অধ্যাদেশ করেছে।
তবে সেটি সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাস হতে হবে। এরপর কমিশন আবার বিধিমালা তৈরি করবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আমার জানা মতে, অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে মেয়র প্রার্থী পদে দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন সংসদ বসবে। সংসদ বসার পর এই বিল বা অর্ডিন্যান্স যদি রেটিফাই (অনুমোদন) হয়, তবে সেভাবেই নির্বাচন হবে। আর যদি পরিবর্তন হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যায় তবে অন্যরকম হবে। আমরা মূলত সংসদ অধিবেশনের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছি।
রোজার মধ্যে সংরক্ষিত আসনের নির্বাচন : এদিকে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট রোজার মধ্যে করার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন। শিগগিরই সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনের তফসিল দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন।
এ বিষয়ে ইসি আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, এ নির্বাচনের প্রক্রিয়া কার্যত শুরু হয়ে গেছে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো যাদের মনোনীত করবেন, মূলত তারাই নির্বাচিত হবেন। দলগুলো এরই মধ্যে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। আনুষ্ঠানিক নিয়ম অনুযায়ী শপথ গ্রহণের ৯০ দিনের মধ্যে এই নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়, আমরা সেই সময়ের মধ্যেই তা করব। তিনি বলেন, সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন রোজার মধ্যে করার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছি। ঈদের আগেই এ নির্বাচনের যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করতে চাই আমরা। সে ক্ষেত্রে রমজানের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন হতে পারে। এটি তো আমাদের একপক্ষীয় না, দলেরও একটা বিষয় আছে।
Manual3 Ad Code
আরপিও অনুযায়ী যে দল যতটি আসন পায়, সেই অনুপাতে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। কোনো দল একাধিক আসন পেলে তবেই নারী আসন পায়, স্বতন্ত্ররা এককভাবে নারী আসন পান না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছে ২০৯টি আসন। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি, এনসিপি ৬টি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন পেয়েছে ১টি। গণঅধিকার পরিষদ আসন পেয়েছে ১টি। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১টি আসনে জয়লাভ করেছে। গণসংহতি আন্দোলন পেয়েছে ১টি আসন। খেলাফত মজলিস পেয়েছ ১টি আসন। অন্যদিকে জাতীয় পার্টিসহ ৪১টি দল কোনো আসন পায়নি। সে হিসেবে জাতীয় সংসদে বিএনপি ৩৫টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১১টি ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি পাচ্ছে ১টি সংরক্ষিত নারী আসন।
এপ্রিলের প্রথমার্ধে বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনে ভোট : নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, পহেলা বৈশাখ অর্থাৎ আগামী ১৪ এপ্রিলের আগে বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন হতে পারে। ঝড়-বৃষ্টির কারণে আমরা পরিকল্পনা করছি বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনে ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের আগেই নির্বাচন আয়োজন করব। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে নির্বাচিত হন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী একসঙ্গে একটির বেশি আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে থাকা যায় না। তারেক রহমান গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বগুড়া-৬ আসনটি ছেড়ে দিলে আসনটি শূন্য ঘোষণা করে ইসি।
সংবিধান অনুযাযী জাতীয় সংসদের কোনো আসন শূন্য ঘোষণা হলে তার ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন করতে হয়। অন্যদিকে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে শেরপুর-৩ আসনের এক বৈধ প্রার্থীর মৃত্যু হওয়ায় সেই আসনের ভোট আরপিও অনুযায়ী স্থগিত করে কমিশন। আইন অনুযায়ী নতুন করে তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে এই আসনের ভোট করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আগে যারা বৈধ প্রার্থী ছিলেন তাদের নতুন করে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে হবে না।