প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চ্যালেঞ্জে ঘেরা রূপান্তরকাল
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চ্যালেঞ্জে ঘেরা রূপান্তরকাল
editor
প্রকাশিত মার্চ ১, ২০২৬, ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Manual7 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
রাজনীতিতে পরিবারভিত্তিক নেতৃত্ব নতুন নয়। ব্যতিক্রম নয় বাংলাদেশও। স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ধারাবাহিকভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে দুটি পরিবার। সেই প্রেক্ষাপটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দীর্ঘ শাসন-অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়ের আলোচনা। তবে উত্তরাধিকার দায়িত্বের সঙ্গে তারেক রহমানের সামনে রূপান্তর পর্বের চ্যালেঞ্জ। কেননা একটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছেন তারেক রহমান।
সরকারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, পূর্ববর্তী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক অচলাবস্থা, অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক বিভাজনের বাস্তবতায় নতুন নেতৃত্ব পুনর্গঠনমূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
Manual4 Ad Code
Manual1 Ad Code
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘উত্তরাধিকার’ একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে দায়। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনীতির প্রবর্তন, গ্রামীণ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের মধ্য দিয়ে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলেছিলেন। খালেদা জিয়ার সময় সেই ধারার সাংগঠনিক বিস্তার ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘদিন দলের নীতিনির্ধারণী ও সাংগঠনিক স্তরে সক্রিয় ছিলেনÑ দলীয় নেতাদের এমন দাবি। তবে সমালোচকরা মনে করেন, সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা সীমিত হওয়ায় তাকে একটি জটিল আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে হচ্ছে।
Manual4 Ad Code
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরাধিকার নেতৃত্বের দরজা খুলে দেয়; কিন্তু কার্যকর শাসননির্ভর করে নীতির ধারাবাহিকতা, দক্ষ টিম গঠন এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর।
বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতাÑ সব মিলিয়ে চাপ বহুমাত্রিক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় তিনটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হয়েছে। রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণ (পোশাকের বাইরে ফার্মাসিউটিক্যাল, আইটি ও কৃষিপণ্য), বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও তদারকি জোরদার। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও কর কাঠামোয় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিল্পোদ্যোক্তা বলেন, নীতি বদলালে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়। তাই পাঁচ বছরের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক রোডম্যাপ প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা, বিশেষত জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে। ফলে কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, আস্থাভিত্তিক অর্থনৈতিক সংস্কার জরুরি।
দুর্নীতি, ধীরগতি ও রাজনৈতিক প্রভাব এই তিন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি প্রশাসনের বিরুদ্ধে রয়েছে। নতুন সরকার কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে সূচক প্রণয়ন, ডিজিটাল ফাইল ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়সীমা নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বলে দাবি করছে।
Manual8 Ad Code
সাবেক সচিব ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক বলেন, সংস্কারের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। মাঠপর্যায়ে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমাতে না পারলে টেকসই পরিবর্তন আসবে না। প্রশাসনে গতি ফেরাতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা সহায়ক হতে পারে; তবে সংস্কারের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতার ওপর।
রাজনৈতিক পালাবদলের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সব সময় সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। সরকার বলছে, নিরাপত্তা বাহিনী আধুনিকায়ন, গোয়েন্দা সমন্বয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব মোকাবিলায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সতর্কবার্তাÑ নিরাপত্তার নামে নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব হলে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিরতা বাড়তে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থিতিশীলতার জন্য নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা অপরিহার্য।
সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষই সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। তবে বাস্তবে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গড়ে উঠবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি ঐকমত্য ছাড়া বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কঠিন।
শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, সাধারণ মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন এখন মূল চাহিদা। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণÑ এই চার সূচকেই রাজনৈতিক সমর্থন টেকসই হয়। তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ বান্ধবনীতি ও ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণে নজর রাখছে। সরকার স্টার্টআপ ফান্ড ও উদ্ভাবন-কেন্দ্র গঠনের পরিকল্পনার কথা বলছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা অনেকাংশে বৈদেশিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কূটনৈতিক মহল বলছে, অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুমুখী সম্পর্ক জোরদারের কৌশল নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আস্থার জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
বর্তমান বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনায় রূপান্তরপর্বের চ্যালেঞ্জগুলো বহুমাত্রিক-অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার, রাজনৈতিক সংলাপ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। সাফল্য নির্ভর করবে নীতির ধারাবাহিকতা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিÑ এই তিনটি বিষয়ের ওপর।
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যেমন প্রত্যাশা তৈরি করে, তেমনি দায়ও বাড়ায়। সেই দায় কতটা দক্ষতার সঙ্গে নতুন প্রধানমন্ত্রী সামলাতে পারবেনÑ তা-ই নির্ধারণ করবে, এটি শুধু ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, নাকি কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের এক নতুন অধ্যায়।