বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর এরই মধ্যে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। ওই প্রণালির উভয় পাশে আটকা পড়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বহনকারী জাহাজ ও ট্যাংকার।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। হামলার পর ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য থমকে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। সমস্যা তৈরি হয়েছে দুবাই হয়ে ট্রান্সশিপমেন্টের বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশি পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও। এছাড়াও হামলা-পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক কার্গো পরিবহনেও বিঘ্ন ঘটছে। সবকিছু মিলে এ যুদ্ধ বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে তৈরি করছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল ও এলএনজি আমদানিও বাধাগ্রস্ত হবে, পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। যার প্রভাব পড়বে সব উৎপাদনমুখী শিল্পে। এছাড়া বাংলাদেশের খাদ্য ও অন্য পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জরুরি পণ্য রপ্তানিও ব্যাহত হবে। সব মিলিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।
এ বিষয়ে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপমহাব্যবস্থাপক মো. তসলিম শাহরিয়ার বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম বেড়ে গেছে। বিশ্ববাজার চালু হয়েই প্রায় ২০ থেকে ৪০ ডলার বেড়েছে সয়াবিন ও পাম তেলের দাম। আবার এর ওপর নির্ভর করে এখন হু হু করে অন্য ভোগ্যপণ্যের দামও বাড়বে বিশ্ববাজারে। ফলে সামনে ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখছি।’
তিনি বলেন, ‘এ সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি হলে খুব সমস্যা হবে। জ্বালানি ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশে উৎপাদন কমে যাবে। বাজারে প্রভাব পড়বে।’
এদিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় খাদ্যশস্য আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, ‘এ যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে বন্ধ করছে ইরান। যেটা জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা করবে। এ পথে বাংলাদেশ সরাসরি কোনো খাদ্য আমদানি করে না। তবে জ্বালানি তেলের কারণে অন্য সব পথেই খাদ্য আমদানি খরচ বাড়বে।’
‘আর যুদ্ধের ব্যাপ্তি বেড়ে গেলে, সুয়েজ খালসহ অন্য সব রুটে চাপ পড়বে। তখন পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। সেটা বড় উদ্বেগের।’
Manual7 Ad Code
তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই হয়ে যে পণ্য ট্রান্সশিপমেন্ট হয়, যেসব পণ্যের আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হবে।’
এদিকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—এই সাত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য আনা-নেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশও বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। আর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলা ও পাল্টা হামলায় দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় আছেন রপ্তানিকারকেরা।
Manual3 Ad Code
প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী মো. ইকতাদুল হক বলেন, ‘রপ্তানি হওয়া প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের অর্ধেকের কাছাকাছি যায় মধ্যপ্রাচ্যে। এখন মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য রপ্তানিকারক অনেক প্রতিষ্ঠান হুমকিতে পড়বে।’
তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে করোনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যেভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যকে অস্থিতিশীল করেছে- এখন আবারও তেমন একটি অনিশ্চয়তায় ভুগছি আমরা।’
Manual2 Ad Code
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরিস্থিতি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এটি দীর্ঘমেয়াদি হলে সেটা উত্তরণে পরিকল্পনা নেওয়া হবে।’
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘এ প্রণালি বন্ধ হলে জাহাজ ভাড়া বেড়ে যায়। তখন পণ্যের দাম বাড়বে। তবে এখনো আমরা আশঙ্কার মধ্যে যাবো না। দু-একদিনের মধ্যে সমাধান হতে পারে। সেটা না হলে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। তবে আমাদের পণ্যের কোনো সংকট নেই।’