সদ্যবিদায়ী ২০২৫ সালেও গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি ও সালফেট অ্যারোসল হ্রাসের প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বব্যাপী সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। এ নিয়ে টানা তিন বছর সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটির গবেষকরা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদের পরিবেশগত অবস্থান ও বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হয়। তা ছাড়া মৎস্যসম্পদ কমে যায় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব কিছু সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য অশনিসংকেত।
গবেষণায় বলা হয়েছে, গত বছর ‘লা নিনা’ থাকার পরও তাপমাত্রা বৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। কেননা ২০২৫ সালে বিগত ২০২৪ সালের তুলনায় বিশ্বব্যাপী ২০০০ মিটার সমুদ্রের তাপের পরিমাণ (ওএইচসি) ২৩ প্লাস ৮ জেটজে বৃদ্ধি পেয়েছে। সিআইজিএআর-আরটি এবং কোপার্নিকাস মেরিন তথ্যও সমুদ্রের তাপ বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
Manual2 Ad Code
গবেষণায় বলা হয়েছে, আঞ্চলিকভাবে বিশ্বব্যাপী সমুদ্র এলাকার প্রায় ৩৩ শতাংশ তার ঐতিহাসিক (১৯৫৮-২০২৫) শীর্ষ তিনটি উষ্ণতম অবস্থার মধ্যে স্থান পেয়েছে। যেখানে প্রায় ৫৭ শতাংশ অঞ্চল শীর্ষ পাঁচের মধ্যে পড়ে। এসব অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এবং দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর, ভূমধ্যসাগর, উত্তর ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ ভারত মহাসাগর।
Manual5 Ad Code
গত তিন বছর (২০২৩-২৫) আটটি ডেটাসেটের মধ্যে তিনটিই ছিল উষ্ণতম বছর। ২০২৩-২৫ সালের সমন্বিত তিন বছরের গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের তুলনায় ১.৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা প্লাস ০.১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। গত ১১ বছর তথা ২০১৫-২৫ আটটি ডেটাসেটের মধ্যে ১১টি ছিল উষ্ণতম বছর।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল শুরু এবং শেষ হয়েছিল লা নিনার শীতলতা দিয়ে, তবুও এটি বিশ্বব্যাপী রেকর্ডের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণতম বছরগুলোর একটি। কারণ আমাদের বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে থাকা গ্রিনহাউস গ্যাস জমা হয়েছিল।
এদিকে অ্যাডভান্সেস ইন অ্যাটমোস্ফিয়ারিক সায়েন্সেসে প্রকাশিত পৃথক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সমুদ্রের তাপমাত্রা রেকর্ড সর্বোচ্চ ছিল; যা জলবায়ু ব্যবস্থার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি তাপ সঞ্চয়ের প্রতিফলন ঘটায়। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে প্রায় ৯০ শতাংশ অতিরিক্ত তাপ সমুদ্রে সঞ্চিত হয়, যা সমুদ্রের তাপকে জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক করে তোলে।
Manual8 Ad Code
তাছাড়া চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব অ্যাটমোস্ফিয়ারিক ফিজিক্সের সঙ্গে লিজিং চেং-এর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ পর্যন্ত ২০২৪ সালের তুলনায় বিশ্বব্যাপী ২০০০ মিটার সমুদ্রের তাপের পরিমাণ (ওএইচসি) ২৩ প্লাস ৮ জেটজুল বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ২০২৪ সালে বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ২০০ গুণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী বার্ষিক গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা (এসএসটি) ১৯৮১-২০১০ সালের বেসলাইনের চেয়ে ০.৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ০.১২ প্লাস ০.০৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম ছিল। তারপরও গত বছরটি ছিল রেকর্ড তৃতীয় উষ্ণতম বছর।
গত এক দশকে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও ঘনত্ব নজিরবিহীনভাবে বেড়েছেÑ এমনটাই উঠে এসেছে বাংলাদেশের হাইড্রো-ক্লাইমেট অ্যান্ড ওশান সেন্টারের (বিএইচসিও) চলমান গবেষণায়, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের লিডিং সায়েন্টিস্ট (প্রফেসর) ড. মোহন কুমার দাশ ও তার গবেষক দল।
১৯৯৫-২০২৫ সময়কালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯৬-২০০৫ সালে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের মৌসুমি গড় তীব্রতা ছিল প্রায় ১.০-১.৩ °সে, যা ২০১০-এর পর বেড়ে ≥১.৩ °সে-এ পৌঁছেছে। বঙ্গোপসাগরের মধ্যাঞ্চল একটি স্থায়ী হটস্পটে পরিণত হয়েছে।
তাপপ্রবাহের বার্ষিক সংখ্যা ১৯৯০-এর দশকে যেখানে ছিল প্রায় ০-৪টি, বর্তমানে বেড়ে ৮-১২টিতে পৌঁছেছে এবং বার্ষিক তাপপ্রবাহ-প্রভাবিত দিন অনেক ক্ষেত্রে ১০০-১৮০ দিন পর্যন্ত হচ্ছে; যা প্রায় মৌসুমি চরম অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। এসব উচ্চ প্রভাবের বছরগুলো সাধারণত শক্তিশালী ওশানিক নিনো ইনডেক্স (ONI > +1) ও ধনাত্মক ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল (IOD > +0.5)-এর সঙ্গে এবং সমুদ্রের ওপরিভাগে শক্তিশালী
Manual6 Ad Code
কী বলছেন গবেষকরা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদ বিবর্তনের মাধ্যমে হোক আর যেভাবেই হোক; তাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে একেকটি এনভায়রনমেন্টাল কন্ডিশনে সুইটেবল হয়ে বেঁচে থাকে। যেকোনো প্রাণী-উদ্ভিদের ক্ষেত্রে হঠাৎ তার পরিবেশগত যেকোনো প্যারামিটারের তারতম্য ঘটলে তথা তাপমাত্রা, স্যালানিটি, অ্যাসিডিটি বা অন্য কোনো কিছু হলে সেটি কারও বৃদ্ধি সমস্যা হয়। কোনোটার বংশ বৃদ্ধি থেমে যায়। তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ২ ডিগ্রি বেশি থাকলে কোনো-না কোনো প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যেকোনো একটি প্রাণী যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে যদি বংশবিস্তার করতে না পারে, তাকে ঘিরে অন্য যে প্রাণী আছেÑ সেটিও ক্ষতির মুখে পড়বে।
সামুদ্রিক তাপমাত্রা সাধারণত এভাবে বৃদ্ধি পায় না, এটি মূলত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র বিষয়ক ডিপার্টমেন্টের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) সহযোগী অধ্যাপক ড. আবু হেনা মুহাম্মদ ইউসুফ। তিনি বলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সি-লেভেল রাইজ হয়। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে আর্কটিক ও অ্যান্টার্কটিকার বরফ গলতে থাকে। এতে সামুদ্রিক উচ্চতা বাড়তে থাকে। যেমন আমাদের দেশেই গত এক বছরে কত কল-কারখানা বেড়েছে। সেই তুলনায় বিশ্বেও বেড়েছে। যানবাহন কালো ধোঁয়া ছাড়ছে। এটি আমাদের দেশে যেমন বাড়ছে, তেমনি বৈশ্বিকভাবেও বাড়ছে। বরফ গলার কারণে সমুদ্রে পানির উচ্চতা বাড়ে। এতে নিম্নভূমি ডুবে যাবে বা প্লাবিত হবে। তা ছাড়া একেকটি প্রাণী সাগরে একেকটি তাপমাত্রায় বসবাস করে। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাবে। ফলে জীববৈচিত্র্যের বাঁচার সম্ভাবনা ক্ষীণ হবে বা মারা যাবে।
আবু হেনা মুহাম্মদ ইউসূফ বলেন, বর্তমানে বঙ্গোপসাগরে মাছের উৎপাদন কমে গেছে। এই বৈশ্বিক তাপমাত্রার সঙ্গে মাছের একটি সম্পর্ক রয়েছে। কিছুদিন আগে সেন্টমার্টিনে প্রচুর পরিমাণে জেলিফিশ পাওয়া গেছে। এটিও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ। তাপমাত্রা বেড়ে গেলে জেলিফিশের বংশবিস্তার বেড়ে যায়। এসব জেলিফিশ সাগরের অন্য মাছগুলো খেয়ে ফেলে। অর্থাৎ জেলিফিশের বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মাছের উৎপাদন কমে যাবে। মোটকথা, একটির সঙ্গে অন্যটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বঙ্গোসাগরে তাপমাত্রা আরও বেড়ে গেলে অনেক ধরনের প্রাণীর অস্তিত্ব পাওয়া যাবে না। একে বলা হয় কোরাল ব্লিচিং। আমাদের সেন্টমার্টিনেও প্রচুর কোরাল পাওয়া যায়। এসব কোরাল ক্ষয় হয়ে দ্বীপে ভাঙন শুরু হবে, যা দ্বীপের জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেবে। সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দর বলেন, সামুদ্রিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ঘনঘন নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড় হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাবে। আবহাওয়ার বিরূপ অবস্থা বিরাজ করবে। সাগর তীরে ভাঙন বেড়ে যাবে।
তিনি বলেন, সামুদ্রিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে কচ্ছপের প্রজননে সমস্যা হয়। কেননা কচ্ছপের মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে। মাটির তাপমাত্রা ৩৩-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে হলে সবগুলো স্ত্রী হয়ে যাবে। আবার যদি ৩০-৩৩ এর কম থাকে, তাহলে সব পুরুষ হয়ে যাবে। আর ৩০-৩৩ ডিগ্রির মাঝামাঝি থাকলে স্ত্রী-পুরুষ সমান হবে। তাই তাপমাত্রা বেড়ে গেলে প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।