দেশে গ্যাস সরবরাহ লাইনের লিকেজ ও এলপিজি সিলিন্ডার থেকে বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত পাঁচটি বড় দুর্ঘটনায় ১২ জনের প্রাণহানি হয়েছে এবং অর্ধশতাধিক মানুষ দগ্ধ বা আহত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার অভাব, কারিগরি ত্রুটি, অবহেলাসহ নানা কারণে এসব বিস্ফোরণ-অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বাড়ছে।
এসব দুর্ঘটনায় পুরো পরিবার একসঙ্গে দগ্ধ হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। গুরুতর দগ্ধ হয়ে অনেকেই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চিকিৎসাধীন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব দুর্ঘটনার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে প্রস্তুতকারক, বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই কোনো না কোনোভাবে দায়ী হলেও কার্যকর প্রতিকার বা জবাবদিহি নেই।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স বিভাগের সাবেক উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষরা সচেতন নয়। গ্যাস লাইন বা সিলিন্ডার ব্যবহারে মানুষ যদি সচেতন না হয় তবে এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটেই যাবে। পাশাপাশি বিভিন্ন কোম্পানিরও কিছু দায় রয়েছে। তারা সিলিন্ডারের রেগুলেটরগুলো ভালো মানের দিলে এ ঘটনা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব। এ ছাড়া সচেতনতা বাড়াতে পাড়া-মহল্লায়, এলাকায় আরও ভলান্টিয়ার বাড়াতে হবে। বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যম মানুষকে ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বন্ধ ঘরে ঢুকেই সঙ্গে সঙ্গে বৈদ্যুতিক সুইচ চাপা যাবে না। আগে ঘরের দরজা জানালা খুলে রাখতে হবে অন্তত ১৫ মিনিট এরপর সুইচ চাপতে হবে। এ ছাড়া রান্নাঘরে গিয়েও সঙ্গে সঙ্গে চুলা জ্বালানো যাবে না। ঠিক একই প্রক্রিয়ায় জানাল খুলে রেখে সময় দিতে হবে জমে থাকা গ্যাস বেরিয়ে যেতে। এরপর চুলা জ্বালালে বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঘটনা আর ঘটবে না।’
খিলক্ষেতে শর্ট সার্কিটে দগ্ধ ৪
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় একটি বহুতল ভবনের নিচতলায় হোটেলে এসির কাজ করার সময় শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটনা ঘটে। এতে চারজন দগ্ধ হন। দগ্ধরা হলেন মোহাম্মদ মনসুর আলী (৩২), আবদুল মতিন (৬৭), মোহাম্মদ মাহি (১৭) ও আবদুল জলিল (৬৭)। সহকর্মী মোহাম্মদ ইমরান জানান, তারা সবাই ওই হোটেলের স্টাফ। দগ্ধদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে আবাসিক চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, মনসুরের শরীরের ২১ শতাংশ, আবদুল মতিনের ৫ শতাংশ, মাহির ৫ শতাংশ ও আবদুল জলিলের ৭ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে ভর্তি করা হয়েছে। বাকি তিনজনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
Manual6 Ad Code
ধামরাইয়ে গ্যাসলাইনের লিকেজে বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৪
গত ১০ মার্চ রাত সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকার ধামরাই উপজেলার একটি বাসায় গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। তারা হলেন বাদশা মিয়া (৫৬), তার স্ত্রী সুমনা আক্তার (৪৫), ছেলে মোহাম্মদ আরাফাত (২২) ও আবু বক্কর সিদ্দিক (১৬)। তাদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। পরদিন ১১ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে শরীরের ৯৫ শতাংশ দগ্ধ নিয়ে সুমনা আক্তার মারা যান।
Manual3 Ad Code
কুমিল্লায় চা-দোকানে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, দগ্ধ ২
গত ৬ মার্চ বিকেলে কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শিদলাই ইউনিয়নের পুমকারা এলাকায় একটি চা-দোকানে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে হাসান ও শিশু দ্বীন ইসলাম দগ্ধ হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রথমে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
Manual6 Ad Code
উত্তরায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ ১০, নিহত ৩
গত ৬ মার্চ ভোরে রাজধানীর উত্তরার কামারপাড়া এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণে একই পরিবারের সদস্যসহ ১০ জন দগ্ধ হন। তাদের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। দগ্ধদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা সোনিয়া আক্তার (১০০ শতাংশ), এনায়েত আলী (৪৫ শতাংশ) ও রিয়া আক্তার (৩২ শতাংশ) গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে তিনজনই মারা যান। বাকিদের শরীরের ৭ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছে। চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান জানান, গুরুতর দগ্ধ হওয়ায় দ্রুত চিকিৎসা সত্ত্বেও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
Manual8 Ad Code
মোহাম্মদপুরে প্রাইভেট কারে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, দগ্ধ ৮
গত ২ মার্চ বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের হুমায়ুন রোড এলাকায় একটি প্রাইভেট কারে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে নারীসহ আটজন দগ্ধ হন। দগ্ধরা হলেন রেহানা বাদল (২৩), তারেক রহমান (২৩), মোহাম্মদ মনা (৪০), মোহাম্মদ ইরফান (১৮), মোহাম্মদ আজাদ (৫৫), মোহাম্মদ মিরাজ (৩৬), মোহাম্মদ আকাশ (২৫) ও মোহাম্মদ জনি (৩৫)। তাদের জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে নেওয়া হলে দুজনকে ভর্তি করা হয়, একজনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং বাকিদের চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
চট্টগ্রামের হালিশহরে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ৬
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে চট্টগ্রামের হালিশহরে একটি ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলায় বিস্ফোরণের পর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে একই পরিবারের ৯ জন দগ্ধ হন। তাদের প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিপনের মৃত্যু হয়। এর আগে নুরজাহান আক্তার, শাওন, সামির হোসেন, পাখি আক্তার ও সাখাওয়াত হোসেন মারা যান। বর্তমানে দগ্ধ তিনজন আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
দাউদকান্দিতে রান্নাঘরে বিস্ফোরণ, নিহত ২
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে কুমিল্লার দাউদকান্দির পশ্চিম মাইজপাড়া গ্রামে বাসার রান্নাঘরে চুলা জ্বালাতে গিয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে একই পরিবারের চারজন দগ্ধ হন। তারা হলেন মনোয়ারা বেগম (৬০), জেল হক আহমেদ (৩৭), তার স্ত্রী উম্মে হুমায়রা (৩০) ও শিশু হুররাম (২)। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ মার্চ সকালে উম্মে হুমায়রা ও বিকেলে জেল হক আহমেদ মারা যান। জেল হক আহমেদ কুমিল্লার হোমনা উপজেলার রেহানা মজিদ কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন।