ঈদ এলেই রাস্তায় নামতেন পোশাক শ্রমিকরা, এবার চার কারণে স্বস্তি
ঈদ এলেই রাস্তায় নামতেন পোশাক শ্রমিকরা, এবার চার কারণে স্বস্তি
editor
প্রকাশিত মার্চ ২৬, ২০২৬, ০৯:০৬ পূর্বাহ্ণ
Manual5 Ad Code
প্রজন্ম ডেস্ক:
এবার স্বস্তিতে ঈদ পালন করেছেন তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিক-মালিকরা। ঈদের আগে বেতন-বোনাস পাওয়ার জন্য আন্দোলনে নামতে হয়নি শ্রমিকদের। কারখানা বন্ধ করে নিখোঁজ হতে হয়নি মালিককে। সড়ক দখল করে বিক্ষোভ না করায় ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি যাত্রীদের।
এই ঘটনাগুলো বিগত এক দশক ধরে দেখতে দেখতে অনেকটা গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল খাতসংশ্লিষ্টদের।
এবার সরকারের কঠোর নির্দেশনার পাশাপাশি মালিকদের দীর্ঘ দিনের বকেয়া প্রণোদনা পরিশোধের উদ্যোগ, শ্রমিকদের এক মাসের বেতন-ভাতার সমপরিমান অর্থ সহজ শর্তে কারখানা মালিকদের ঋণ প্রদান ও প্রশাসনের নিবিড় পর্যবেক্ষণের ফলে কোনো ধরনের অসন্তোষ দেখা যায়নি পোশাক খাতে। কেটেছে স্বস্তির ঈদ।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত ঈদুল ফিতর উপলক্ষে পোশাক শিল্প খাতের সচল ২ হাজার ১২৭টি কারখানার সবগুলোয় শ্রমিকদের জানুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়।
ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন পরিশোধ করা হয় ২ হাজার ১২৫টি কারখানার। ঈদ বোনাস পরিশোধ করা হয় ২ হাজার ১২৩টি কারখানায়। এছাড়া চলতি মার্চ মাসের বেতন থেকে অগ্রিম টাকা দিয়েছে ১ হাজার ৩৬২টি কারখানা।
এর বাইরে যে কটি কারখানা ঈদ বোনাস পরিশোধ করেনি তারা নিজেরা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে সমস্যার সমাধান করেছে বলেও জানা গেছে।
এর ফলে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ বা বিক্ষোভ থেকে বিরত ছিল।
এর সামগ্রিক ফলাফল, কারখানা মালিক-শ্রমিকরা নিজেরা যেমন আনন্দের সঙ্গে ঈদ পালন করতে পেরেছেন, তেমনি শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ থেকে সৃষ্ট যানজটে অন্যের ঈদযাত্রা ব্যহত হয়নি।
বিগত বছরগুলোর ঈদের সময়ের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অনেক কারখানা বেতন-ভাতা পুরোপুরি দিতে পারতো না। বেতন-ভাতার সমস্যা থেকেই যেতো। এ কারণে ঈদ এলেই পোশাক শিল্প এলাকায় বেতন-বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভ দেখা যেতো।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরও নিয়মিত বিরতিতে দেখা মিলেছে শ্রম অসন্তোষের। বিভিন্ন কারখানার মালিক বিগত সরকার পতনের পর দেশ থেকে পালিয়েছেন। সেসব কারখানার শ্রমিকদের বেতন বকেয়া ছিল। বেতন পরিশোধের দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ করতে হয়েছে। ২০২৫ সালে ঈদুল ফিতর ঘিরেও বিক্ষোভ দেখা গিয়েছিল। বিশেষ করে গাজীপুর, আশুলিয়া এলাকায় বেশি বিক্ষোভ দেখা যায়। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন সেখানকার শ্রমিকরা।
বিজিএমইএ’র পরিচালক আব্দুর রহিম ফিরোজ বলেন, ‘তৈরি পোশাক শিল্পের বড় অংশ নিজেরাই নিজেদের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করে, সমস্যা হয় না। এরই অংশ হিসাবে বেতন-ভাতা পরিশোধের ব্যাপারে আমাদের প্রস্তুতি ছিল। এই প্রস্তুতিকে এগিয়ে দিয়েছে উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারে দেওয়া প্রণোদনা। এই প্রণোদনা দীর্ঘদিন ধরে আটকে ছিল। অতীতে এই প্রণোদনা দিলেও তা অল্প অল্প করে ছাড় করতো। আমাদের দাবি ছিল এবার ঈদকে সামনে রেখে পুরো ছাড় করার। সরকার পরিশোধ করেছে। এতে উদ্যোক্তাদের নগদ অর্থের সংকট দূর হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকদের এক মাসের বেতন ও ভাতার সমপরিমান অর্থ সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা সহজ হয়েছে। এমনকি তুলনামূলক দুর্বল কারখানাগুলোও বেতন-ভাতা দিতে পেরেছে।’
জানা গেছে, ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে গঠিত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পর্ষদের (টিসিসি) বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে মালিকদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। গত ৩ মার্চ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মন্ত্রী, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে মালিক-শ্রমিকের পক্ষের বক্তব্য আমলে নিয়ে সমস্যা সমাধানে নির্দেশনা দেয় সরকার। আর্থিক বিষয়গুলো নিরসনের পাশাপাশি শ্রমিক ছাটাই করে ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের মাঠে না নামতে করণীয় নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথা বলা হয়।
Manual3 Ad Code
এ বিষয়ে বৈঠকের অন্যতম সদস্য বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েই তৈরি পোশাক শিল্পের সমস্যাগুলো সমাধানে মনোনিবেশ করে। সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের পদক্ষেপ নেয়। এই পদক্ষেপের অংশ হিসাবে গঠিত টিসিসি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বৈঠকে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে ঈদের আগে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা, ছাটাই থেকে বিরত থাকা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে বেশ কিছু দাবি তোলা হয়। সেগুলো বেশ কিছু সমাধানও করা হয়। যার ফল এবারের স্বস্তির ঈদ।
আরও যেসব দাবি শ্রমিকদের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছিল সেগুলোও সমাধানের উদ্যোগ জরুরি বলে মনে করেন এই শ্রমিকনেতা।
Manual4 Ad Code
নারায়নগঞ্জের শ্রমিক সূত্রগুলো জানায়, অন্যান্য বছরগুলোতে সেখানকার কোনো না কোনো কারখানাতে সমস্যা হলেও এবার এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি। শ্রমিক-মালিক-সরকার ত্রিপক্ষীয় পর্যালোচনা বৈঠকে এলাকাগুলোর শ্রমিকদের বেতন না পাওয়ার মতো কোনো বড় খবর আসেনি।
Manual1 Ad Code
এ বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের জেলা সভাপতি এমএ শাহিন বলেন, ‘ঈদ এলেই শ্রমিকরা সহায়তা কেন্দ্রে এসে কোনো না কোনো কারখানার বেতন-ভাতা না দেওয়ার অভিযোগের কথা জানাতো। কোনো কোনো চাঁদরাতে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটতো। পরে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করতো। এবার তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। কোনো সমস্যা হলে আমরা নিজেরাই সমাধান করেছি।’
গাজীপুর, ভালুকা ও টাঙ্গাইল
গাজীপুরের বোর্ডবাজার, কোনাবাড়ি, শ্রীপুর, ময়মনসিংহের ভালুকা এবং টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে মালিকরা সঠিক সময়ে বেতন-ভাতা দিয়েছে। অন্যান্য বছরে গাজীপুরের বোর্ডবাজার, চন্দ্রা এলাকা ও মাওনায় সমস্যা হতো, এবার সেখানে এ ধরণের সমস্যা দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোটের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুজ্জামান জানান, এবার বন্ধ হওয়া পুরোনো কারখানাগুলোর শ্রমিকদের নিয়ে সমস্যা হওয়ার শঙ্কা ছিল। শেষ পর্যন্ত তারা সমস্যার কথা সংগঠনের অফিসে বললেও রাস্তায় বের হয়নি। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান হয়েছে। নতুন করে বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা না হওয়ায় মালিক, শ্রমিক সবাই স্বস্তিতে ঈদ করেছে।
সাভার, মিরপুর শান্ত ছিল। ঢাকার হটস্পট খ্যাত আশুলিয়াতেও এবার বেতন-ভাতা নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেনি। সকল কারখানা মালিকই সময় মতো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।