বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ হাম নতুন করে জনস্বাস্থ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় দ্রুত বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, এরই মধ্যে শিশু মৃত্যুর ঘটনাও সামনে আসায় পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি ও সচেতনতার অভাব এই অবস্থাকে জটিল করে তুলেছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে, বাড়তে পারে শিশুমৃত্যু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা থেকে খবরের কাগজকে জানানো হয়েছে, এই রোগের প্রতিকারে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। কারণ প্রতি চার থেকে পাঁচ বছর পর এই রোগের প্রকোপ বাড়ে। বর্তমান সময়টি ওই প্রকোপময় সিজনের মধ্যে পড়েছে। যাদের টিকা দেওয়া হয়নি বা যেসব শিশুর টিকা দেওয়ার সময় হয়নি–তারা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে। কারণ শূন্য থেকে ৯ মাস বয়সে এই রোগের টিকা দেওয়া হয়। এখন ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
তবে প্রকোপের এই সময়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, মার্চজুড়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং অন্তত ২৭টি মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রাজশাহীসহ কয়েকটি জেলায় সংক্রমণ বেশি ছড়িয়েছে। যেখানে কয়েক ডজন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং শতাধিক সন্দেহভাজন আক্রান্ত শিশু চিকিৎসাধীন। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরের হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বেড়েছে, ফলে অনেক ক্ষেত্রে শয্যাসংকট দেখা দিচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচ্চপর্যায়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অব্যবহৃত ফ্লোরগুলো সংস্কার করে আধুনিক নিবিড় পরিচর্যা শয্যা বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। টিকার জন্য বরাদ্দ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
চিকিৎসকদের মতে, হামের সংক্রমণ বাড়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নির্ধারিত সময়ে টিকা না নেওয়া, কিছু এলাকায় টিকার সরবরাহ ঘাটতি এবং টিকাদান কাভারেজ কমে যাওয়া। নিয়মিত টিকা না দেওয়ায় শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনসমষ্টিগত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন, কিন্তু অনেক অঞ্চলে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, বিশেষ করে যারা এখনো টিকা নেয়নি। হামের সাধারণ লক্ষণ হিসেবে জ্বর, শরীরে লাল ফুসকুড়ি, কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা মৃত্যুর কারণও হতে পারে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে বহু মানুষের মধ্যে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে।
Manual6 Ad Code
জেলা পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইতোমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে চলতি মাসেই মারা গেছে তিনজন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে গত ১০ দিনে অন্তত চারজন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচজন, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে তিনজন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, ভোলাসহ অন্তত ১০টি জেলায় সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। অন্য জেলাতেও আক্রান্ত শিশু হাসপাতালে আসছে বলে জানা গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে টিকা সরবরাহে ঘাটতি এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে তারা মনে করছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হিসেবে ড. হামিদুল রাশিদ বলেন, ৯ মাসের শিশুরা বেশি আক্রন্ত হচ্ছে। তাদের টিকা দেওয়ার সময়ও হয়নি। ৯ মাসের পরে টিকা দেওয়া যায়। চার থেকে পাঁচ বছর পরে এই রোগের প্রকোপ বাড়ে, এখন সেই সময়টা চলছে।
Manual6 Ad Code
তাহলে পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়া হল না কেন? এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পরিষ্কার করে কিছু বলেননি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগ টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। অভিভাবকদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুদের টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরীন বলেন, এই রোগ প্রতিকারে জনসচেতনতার পাশাপাশি টিকা দেওয়ার বিকল্প নেই।
এদিকে ‘হাম’ নিয়ন্ত্রণ কেন হয়নি এ জন্য নানা যুক্তি তুলে ধরছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক ওষুধ শিল্প মেলা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, গত আট বছর হামের টিকা দেয়নি বিগত সরকার। এ কারণে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। তবে এ সংকট সমাধানে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে নতুন করে টিকা ক্রয় করা হচ্ছে।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বেসরকারিভাবে পাঁচটি ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর চারটিই রাজশাহীতে পাঠানো হবে। একই সঙ্গে হামে আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশু হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল, ডিএনসিসি ডেডিকেটেড হাসপাতালে আইসিইউ প্রস্তুত করা হয়েছে।
Manual3 Ad Code
একই দিনে মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ৪০টি আইসিইউ বেড দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। প্রতিমন্ত্রী হাসপাতালে কয়েক বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা ফ্লোরগুলো পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি পরিত্যক্ত জায়গা সংস্কার করে গড়ে তোলা অত্যাধুনিক আইসিইউ শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যবেক্ষণ করেন। পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত জায়গাকে ব্যবহার উপযোগী করে সেখানে এই আইসিইউ ব্লক তৈরি ও হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ এবং চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধিতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।