প্রকাশনার ১৬ বছর

রেজি নং: চ/৫৭৫

১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৩রা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৭ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

মিয়ানমার পেলো, ভারত তুলছে: বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে গ্যাস পাচ্ছে না কেন

editor
প্রকাশিত জুন ৩০, ২০২৬, ০৯:১৮ পূর্বাহ্ণ
মিয়ানমার পেলো, ভারত তুলছে: বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে গ্যাস পাচ্ছে না কেন

Manual1 Ad Code

 

প্রজন্ম ডেস্ক:

মিয়ানমার সম্প্রতি ৯৫ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট)-এর একটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে। এশিয়ার এই অঞ্চলে এর আগে কখনও এত বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি। মিয়ানমারের এই আবিষ্কারে আবারও আশার আলো দেখতে পাচ্ছে বাংলাদেশ। ভারত এবং মিয়ানমারের কোল ঘেঁষে থাকা দেশীয় ব্লকে বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আশা করছেন ভূতাত্ত্বিকরা।

বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাসের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা ও সরকারি পরিকল্পনায় নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের রাখাইন বেসিনে বড় আকারের গ্যাস আবিষ্কার বাংলাদেশের অফশোর অঞ্চলেও একই ধরনের ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামো থাকার সম্ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে বাংলাদেশের অংশে এখন পর্যন্ত কোনও বড় বাণিজ্যিক গ্যাসক্ষেত্র নিশ্চিতভাবে আবিষ্কৃত হয়নি।

Manual7 Ad Code

মিয়ানমারের গ্যাস পরিস্থিতি

মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় অফশোর গ্যাসক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘শুয়ে গ্যাস ফিল্ড’ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমুদ্রসীমার খুব কাছাকাছি রাখাইন বেসিনে অবস্থিত। এই একই ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলে ‘শেউই’, শেউই ফু ও ‘মিআ’ গ্যাসক্ষেত্রও পাওয়া গেছে— এগুলো একই গ্যাস সিস্টেমের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Manual4 Ad Code

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ক্ষেত্র একটি বিস্তৃত ভূ-তাত্ত্বিক গ্যাস বলয়ের অংশ—যা বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলের কাছাকাছি বিস্তৃত।

অপরদিকে, মিয়ানমারের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত ‘ইয়েতাগুন’ এবং ‘ইয়াদানা’ গ্যাসক্ষেত্রগুলোও বঙ্গোপসাগরের বৃহত্তর গ্যাস ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত হলেও সেগুলো তুলনামূলক বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত।

একইসঙ্গে বঙ্গোপসাগরের অফশোর অংশে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস উৎপাদন এলাকা হলো কৃষ্ণা-গোদাবরী বেসিন—যা অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে অবস্থিত। এই বেসিনের গভীর সমুদ্র ব্লকগুলোতে একাধিক বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—কে জি-ডি৬ ব্লক, যেখানে ভারতের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ভেতরে থাকা অফশোর ব্লকগুলোতে সম্ভাব্য গ্যাস মজুতের সম্ভাবনা রয়েছে। এখনও পুরোপুরি প্রমাণিত নয়, তবে এগুলোকে সম্ভাব্য সম্পদ হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।

Manual8 Ad Code

দেশে সাগরে অনুসন্ধান কাজের অগ্রগতি

সরকার ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরের গভীর ও অগভীর সমুদ্র এলাকার মধ্যে গভীর সমুদ্রে ১৫টি ও অগভীর সমুদ্রে ১১টি ব্লকসহ মোট ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে।

Manual4 Ad Code

আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পর ৫টি বিদেশি কোম্পানি ডাটা প্যাকেজ কিনেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনও কোম্পানি দরপত্র নেয়নি বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।

জানা যায়, সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানি ক্রিসএনার্জি, যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক কোম্পানি বিরিংগিয়া এনার্জি গ্লোবালের লোকাল এজেন্ট বিরিংগিয়া পাওয়ার বাংলাদেশ লিমিটেড, পিয়াল এনার্জি অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন লিমিটেড, জাপানি কোম্পানি অনোডা ইনকরপোরেটেড এবং নরওয়েজিয়ান কোম্পানি রিস্টাড এনার্জি সমুদ্রের ডাটা প্যাকেজ কিনেছে। এর মধ্যে ক্রিসএনার্জি বাংলাদেশের ৯ নম্বর ব্লকে অবস্থিত কুমিল্লার বাঙুরা গ্যাসক্ষেত্রে কাজ করছে।

পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, এখনও দরপত্র জমা দেওয়ার অনেক সময়ে (৩০ নভেম্বর পর্যন্ত) রয়েছে। আমরা ভালো সাড়া পাবো বলে আশা করছি। অফশোর বিডিং রাউন্ডের (আন্তর্জাতিক দরপত্র) বিষয়ে অনেক কোম্পানি আগ্রহ দেখাচ্ছে।

অতীত ইতিহাস

এর আগে ২০২৪ সালে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তখন ৭টি বহুজাতিক কোম্পানি দরপত্র কিনলেও কেউই তা জমা দেয়নি। তখন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় ‘বিডিং রাউন্ড-২০২৪’।

পরবর্তীকালে এর কারণ অনুসন্ধানে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত কমিটির সুপারিশে পিএসসি-২০২৬-এ একাধিক সংশোধনী আনা হয়। এতে গ্যাসের দাম নির্ধারণে পাঁচ বছরের গড় বাজারদর বিবেচনা এবং তথ্য প্যাকেজের মূল্য ৫০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে এবারের দরপত্রে বেশি সাড়া পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, আন্তর্জাতিক আদালতে ২০১২ সালে মিয়ানমার ও ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সাগর সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির পর মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র অঞ্চলের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু ১২ বছরেও সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। এদিকে মিয়ানমার আর ভারত ঠিকই সেই সীমান্ত এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। এর আগে ২০০৮ সালে পিএসসি করা হলে মার্কিন কোম্পানি কনকো ফিলিপস দুটি ব্লকে কাজ শুরু করেছিল। কিন্তু তারা ২০১৪ সালের দিকে পিএসসির বাইরে গিয়ে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম এক ডলার বাড়িয়ে দেওয়ার সুপারিশ করে। আওয়ামী লীগ সরকার ওই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তারা কূপ খনন না করে ব্লক ফেলে রেখে চলে যায়। তবে ১৯৯৩ সালের পিএসসিতে কাজ পেয়ে বঙ্গোপসাগরের সাঙ্গুতে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়েছিল। সিলেট অঞ্চলে যে বড় গ্যাসক্ষেত্র থেকে এখন গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে সেটির চুক্তিও করা হয়েছিল ১৯৯৩ সালে।

দেশে গ্যাসের ঘাটতি

বাংলাদেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট দূর করতে বেশি দামে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) রকিকুল ইসলাম জানান, দেশে গ্যাসের চাহিদা গড়ে ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। এর বিপরীতে গ্যাস পাওয়া যায় প্রায় ২ হাজার ৭২০ মিলিয়ন ঘনফুট। তিনি বলেন, ‘‘ঘাটতি পূরণ করতে আমাদের স্থলভাগের গ্যাস ক্ষেত্রগুলোতে অনুসন্ধান কাজ অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছি। এখানে বাপেক্সের ভূমিকা অনেক বড়।’’

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ২৮ জুন সংসদ অধিবেশনে জানান, দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট কাটাতে স্থল ও সমুদ্রে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যেই আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আশা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, ‘‘ইতোমধ্যে পাঁচটি বিদেশি কোম্পানি ডাটা প্যাকেজ কিনেছে। আমরা এ বিষয়ে বেশি আশাবাদী। এর আগে যখন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল, তখন কেউই জমা দেয়নি। এবার আমরা সব ব্লক উন্মুক্ত করে দিয়েছি এবং নভেম্বর পর্যন্ত জমা দেওয়ার সময় দিয়েছি।’’

তিনি বলেন, ‘‘কোম্পানিগুলোকে আগ্রহী করতে আমরা পিএসসিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছি। আশা করছি এবার সাগরে অনুসন্ধান কাজ শেষ পর্যন্ত শুরু কর‍তে পারবো।’’

প্রকৌশলী মো. শোয়েব আরও বলেন, ‘‘মিয়ানমার ও ভারত ইতোমধ্যে সীমান্তের এই অংশ থেকেই গ্যাস উত্তোলন করছে। আমরাও আশাবাদী। তবে যতক্ষণ অনুসন্ধান ও উত্তোলন কাজ শুরু না করা হচ্ছে—ততক্ষণ এই বিষয়ে একেবারে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।’’

ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলেন, ‘‘মিয়ানমারের যে সীমান্ত এলাকায় গ্যাস পাওয়া গেছে। আমাদেরও একই সীমান্ত এলাকায় গ্যাস পাবার কথা। একই বেসিনে থাকার কারণে তার ভূতাত্ত্বিক গঠন একই রকম। ওই প্রান্তে গ্যাস পাওয়া গেলে এই প্রান্তেও পাওয়ার কথা। এবার যদি শেষ পর্যন্ত দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট ব্লকে কাজ দেওয়া যায়, তাহলে আমি আশাবাদী, গ্যাস আমরাও পাবো।’’

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১৩
১৫১৬১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
৩০  

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code